Tuesday, April 21, 2009

পশ্চিমা সমাজে নৈতিক অধঃপতনের বিস্তার

পাশ্চাত্যে যৌন অনাচার ও নৈতিক অধঃপতনের বিস্তারে সমাজ-বিজ্ঞানী ও চিন্তাবিদরা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তালাকের হার বৃদ্ধি, পরিবার ব্যবস্থায় ধ্বস, লিভ টুগেদার বা অবৈধভাবে স্বামী-স্ত্রীর মত জীবন যাপন, ব্যাভিচার এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে অশ্লীলতার মত সংকটের বিস্তারে পাশ্চাত্যের সরকারী পরিকল্পনাবিদরাও শঙ্কিত। পাশ্চাত্যে নৈতিক অধঃপতন এতটা মাত্রাছাড়া হয়ে উঠেছে যে সেখানে অযাচার বা পরিবারের যেসব সদস্যের সাথে বিয়ে নিষিদ্ধ তাদের সাথেও ব্যাভিচারের ঘটনা বাড়ছে। কয়েক মাস আগে অস্ট্রিয়ায় এ ধরনের একটি ঘটনা ফাঁস হয়েছে। দেশটিতে জোসেফ ফ্রিটজেল নামের ৭২ বছর বয়স্ক এক ব্যক্তি নিজের কন্যাকে বিগত ২৪ বছর ধরে একটি ভূগর্ভস্থ স্যাতস্যাতে কক্ষে আটক করে রেখেছিল। শুধু তাই নয় এই নির্দয় পিতা নিজ কন্যার শ্লীলতাহানি করে সাতটি সন্তানের জনক হয়েছে। সম্প্রতি বৃটেন ও ইতালীতেও এ ধরনের ঘটনা ফাঁস হয়েছে। ইতালীতে এক পিতা তার কয়েক জন কন্যার সম্ভ্রমহানি করেছেন, এমনকি নিজের এক পুত্র সন্তানকেও এ ধরনের ঘৃণ্য কাজে অংশ নিতে উৎসাহ দিয়েছেন। কলম্বিয়াতেও এক নরপশু তার এক কন্যাকে নয় বছর বয়স থেকে দীর্ঘ ২১ বছর পর্যন্ত পাশবিকতার শিকারে পরিণত করে ১১ টি সন্তানের জন্ম দিয়েছে । এসব ঘটনা থেকে স্পষ্ট, পাশ্চাত্যের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রভাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জীবন-ব্যবস্থাও এখন হুমকির মুখে। পাশ্চাত্যে নৈতিকতার অবক্ষয় এবং আধ্যাত্মিকতা থেকে দূরে সরে যাবার প্রক্রিয়া প্রকাশ্যেই সূচিত হয় রেনেসাঁর যুগে। ঐ যুগে পাশ্চাত্যের চিন্তাবিদ ও রাজনীতিবিদরা গীর্যার কর্তৃত্ব খর্ব করার পাশাপাশি ধর্মকেও কোনঠাসা বা একঘরে করে। ফলে পাশ্চাত্যে ধীরে ধীরে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ এবং এ সংক্রান্ত সীমারেখাগুলো পদদলিত হতে থাকে। ১৯৬০'র দশকে পাশ্চাত্যে নগ্নতা, অশ্লীলতা ও যৌণ-অনাচার ব্যাপকতা লাভ করে। এর আগে নৈতিকতার সীমানাগুলো সমাজের নৈতিক ও মানসিক সুস্থতার রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করতো। কিন্তু পাশ্চাত্যের গণমাধ্যমগুলোর বিজ্ঞাপনে নগ্নতা ও অশ্লীলতার প্রচারের ফলে এইসব সীমারেখা ভেঙ্গে পড়ে। ফলে নারী ও পুরুষের মধ্যে অবৈধ সম্পর্কের প্রসারের পাশাপাশি বিস্তার ঘটে স্বামী ও স্ত্রীর পারস্পরিক বিশ্বাসঘাতকতা, তালাক, বিবাহ ছাড়াই স্বামী-স্ত্রীর মত একসাথে জীবন যাপন ও সমকামিতার মত জঘন্য পাপাচার। পাশ্চাত্যে নৈতিক অবক্ষয়ের ঐ জোয়ারের সময়ই অনেক চিন্তাবিদ যৌন অনাচার ও লাগামহীনতার মারাত্মক পরিণতি সম্পর্কে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেছিলেন। ষাটের দশকের মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডী নৈতিক অবক্ষয়ের এই সংকটের কথা স্বীকার করে বলেছিলেন," ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুব-প্রজন্ম আরামপ্রিয় ও ইন্দ্রিয়পরায়ণ। এরা যুদ্ধের ময়দানে দৃঢ়-চিত্ত নয়। এদের প্রতি সাত জনের মধ্যে ছয় জনই অতিরিক্ত ইন্দ্রিয়-বিলাসিতার কারণে শারীরীক শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। আমি আগামী প্রজন্মের মার্কিনীদের জন্য গভীরভাবে শঙ্কিত।" অবশ্য কেনেডীর ভবিষ্যদ্বাণীর চেয়েও মার্কিন সমাজের পরিস্থিতি আরো শোচনীয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বই-পুস্তক, সংবাদপত্র, ইলেকট্রনিক মাধ্যম ও ইন্টারনেটসহ সমস্ত গণমাধ্যম প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে লাগামহীন যৌণাচার বা ব্যাভিচারের প্রচার-প্রসারের কাজে নিয়োজিত। এইসব গণমাধ্যম পারিবারিক বন্ধন ও স্বামী-স্ত্রীর বৈধ ভালবাসার সম্পর্ককে ধ্বংসের কাজে এতটা সফল হয়েছে যে এসব মূল্যবোধ কেবল বদলে গেছে তা নয়, বরং পুরোপুরি উল্টে গেছে। এ প্রসঙ্গে বিশিষ্ট ফরাসী চিন্তাবিদ ডক্টর এ্যালেক্সিস কার্ল লিখেছেন, আমরা সমস্ত ঘরোয়া মূল্যবোধকে ধর্মীয় বিধানের মতই নির্মূল করেছি। আজকের নতুন প্রজন্ম অতীতের ঐসব মূল্যবোধ সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ। সংযম, চারিত্রিক পবিত্রতা বা সততা, বন্ধুত্ব, দায়িত্বশীলতা, আত্মশুদ্ধি বা আত্মিক পবিত্রতা, মানুষের প্রতি ভালবাসা, চারিত্রিক বা নৈতিক মহত্ত্ব -- এ সবই এখন অর্থহীন শব্দ মাত্র এবং আজকের যুব সমাজের কাছে পরিহাসের বিষয়। ইরানী লেখক মাহমুদ হাকিমী "অসুস্থ পশ্চিমা সমাজ " শীর্ষক বইয়ে একটি মার্কিন ম্যাগাজিনের উদ্বৃতি দিয়ে লিখেছেন, শয়তানের তিন ধরনের শক্তি ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাদের বিশ্বটাকে ঘেরাও করেছে। প্রথমতঃ অশ্লীল সাহিত্য এবং পর্দাহীনতা। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর পর্দাহীনতা অত্যন্ত বিস্ময়কর দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়ে এবং এর প্রচলন অব্যাহত থাকে। এই লজ্জাহীনতা বা বেহায়াপনা দিনকে দিন বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্বিতীয়তঃ চলচ্চিত্র বা ছায়াছবিগুলো মানুষের মধ্যে অশালীনতা ও ইন্দ্রিয়পরায়নতা বৃদ্ধি করেছে এবং এ ধরনের অনৈতিক আচরণের বাস্তব পথ বা পন্থাও শিখিয়ে দিচ্ছে। তৃতীয়তঃ সাধারণ মহিলাদের মধ্যে পোশাক পরার ক্ষেত্রে কুরূচি বা অশ্লীলতা ও এমনকি নগ্ন হওয়া এবং পুরুষদের সাথে অবাধ মেলা-মেশার প্রচলন। পাশ্চাত্যে মহিলাদের সম্ভ্রমহানির ঘটনা দিনকে দিন বাড়ছে। এর অন্যতম কারণ গণমাধ্যমের উস্কানী। যেমন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরুণরা শৈশব থেকে কৈশর পর্যন্ত কেবল টেলিভিশনের পর্দায় সম্ভ্রমহানির কয়েক হাজার দৃশ্য দেখে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে বহু মহিলা কর্মস্থলে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এবং পথে-ঘাটে সম্ভ্রমহানির শিকার হন। দেশটির শতকরা ২০ ভাগ মহিলা নিজ বন্ধুদের পাশবিক হামলার শিকার হন। এ ধরনের মার্কিন নারীদের মধ্যে শতকরা ৬১ জনের বয়স ১৮ বছরেরও কম এবং শতকরা ২৯ জনের বয়স ১১ বছরেরও কম। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৮ থেকে ১৯ বছর বয়স্ক ২১০ নারীর সম্ভ্রমহানির দায়ে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। এ ধরণের ভয়াবহ খবর মাঝে মধ্যেই প্রকাশিত হচ্ছে। ২০০৬ সাল থেকে ২০০৭ সালে বৃটেনের ১৫ বছর বয়সী ৫০ হাজার কিশোরী গর্ভপাত ঘটানোর জন্য চিকিৎসালয়ে ধর্ণা দিয়েছে। পাশ্চাত্যে ধর্ষণের শিকার অনেক মহিলাই পুলিশের কাছে সম্ভ্রমহানির কথা জানান না। অনেক নারী চিরজীবন এ দুঃখ মনের মধ্যেই গোপন রাখেন। ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠ দেশগুলোতেও নৈতিক অবক্ষয় বাড়ছে। বৃটেনে প্রতি ৫ জন মহিলা পুলিশের মধ্যে চার জন নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনের সময় যৌণ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। বিখ্যাত মার্কিন লেখক অধ্যাপক উইলিয়াম মার্কিসন লিখেছেন, স্বামী-স্ত্রীর সুশৃঙ্খল বা সুস্থ যৌন সম্পর্ক বাদ দিয়ে আমরা প্রাণঘাতি এইডস ও অন্যান্য মারাত্মক রোগের শিকার হয়েছি। আমরা বিয়ের সম্পর্ক ত্যাগ করে তালাককে উন্নত জীবন হিসেবে বেছে নিয়েছি। গর্ভপাতকে অপরাধ মনে না করে এ কাজকে এখন আমরা মানবাধিকার বলে মনে করছি এবং এ কাজকে ব্যক্তিত্ব ও স্বাধীনতার গৌরবময় লক্ষণ বলে ধরে নিয়েছি। এভাবে পশ্চিমা সমাজে নৈতিক অধঃপতন ক্রমেই গভীরতর হচ্ছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে পশ্চিমা সভ্যতার অগ্রগতি এবং সেখানকার আরাম-আয়েশের জীবন খুব ভালোভাবে তুলে ধরলেও সেখানকার নৈতিক অবক্ষয়ের কথা তৃতীয় বিশ্বের ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীরা প্রায়ই এড়িয়ে যান, বা সে বিষয়কে গুরুত্ব দেন না। বরং তারা নিজ দেশেও সবক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণের জন্য প্রচারণা চালিয়ে থাকেন। পাশ্চাত্যে নৈতিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি বর্তমানে অর্থনৈতিক সংকটও যুক্ত হওয়ায় পশ্চিমা সভ্যতার পতন আরো এগিয়ে এসেছে বলে মনে করা হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রিপাবলিকান দলীয় সাবেক কংগ্রেস সদস্য বিশ্বে নেতৃত্ব দেয়ার ব্যাপারে মার্কিন সরকারের দাবী থেকে দেশটির নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে গিয়ে বলেছেন, " হ্যাঁ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই বিশ্বের নেতৃত্ব দিতে হবে। কিন্তু যে দেশটিতে ১২ বছরের বালিকারা গর্ভ ধারণ করে, ১৫ বছর বয়স্করা একে-অপরকে হত্যা করে, ১৭ বছর বয়স্করা এইডস রোগে আক্রান্ত হয় এবং ১৮ বছর বয়স্করা ডিপ্লোমা লাভ করা সত্ত্বেও লিখতে ও পড়তে পারে না, তারা কারোরই নেতৃত্ব দিতে সক্ষম নয়। "

Tuesday, March 3, 2009

পাশ্চাত্যে পারিবারিক কাঠামো ধ্বংসের প্রচেষ্টা

পশ্চিমা চিন্তাবিদগণ বহুদিন যাবত আমেরিকা ও ইউরোপীয় দেশগুলোর কিছু সংকটের ব্যাপারে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে যাচ্ছিলেন যেগুলোর অধিকাংশই নৈতিকতাকে বিসর্জন দেয়ার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। পশ্চিমা সমাজের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হচ্ছে, সেখানে পারিবারিক কাঠামো ভেঙ্গে পড়েছে। লিবারেলিযম বা কথিত উদার নৈতিকতার নামে এমন সময় পারিবারিক কাঠামো ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে, যখন সমাজের অন্যতম ভিত্তিই হচ্ছে পরিবার। অবস্থা এমন উদ্বেগজনক অবস্থায় পৌঁছেছে যে, কোন কোন পশ্চিমা চিন্তাবিদ এর কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কে বই লিখে ফেলেছেন। The War Against The Family 'দ্যা ওয়ার এ্যাগেইনস্ট দ্যা ফ্যামিলি' বা 'পরিবারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' নামের বইটিতে পারিবারিক কাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণগুলো সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। কানাডার চিন্তাবিদ উইলিয়াম গার্ডনার (William Gairdner) এ বইয়ের লেখক। এ বইটি শুরু করা হয়েছে বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব ফিশার এইমসের (Fisher Ames) একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি দিয়ে। এতে বলা হয়েছে, "আমরা এখন গণতন্ত্র নামের এমন একটি চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছি যেখানে নাগরিকদের স্বাধীনতাকে হত্যা করার আগে তাদের চরিত্রকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।" ঊনবিংশ শতাব্দির মার্কিন লেখকের এই উদ্ধৃতিটি প্রমাণ করে, গণতন্ত্র- কথিত স্বাধীনতার নামে যে পশ্চিমা জনগণের স্বাধীনতাকে কেড়ে নিয়েছে তাই নয়, সেই সাথে তাদের চরিত্র নষ্ট করার পাশাপাশি পরিবারকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। উইলিয়াম গার্ডনার তার বইয়ের শুরুতে পরিবার সম্পর্কে বলেছেন, "পিতা, মাতা ও সন্তানের সমন্বয়ে যে পারিবারিক কাঠামো গঠিত হয়েছে তার রয়েছে প্রাচীন ঐতিহ্য। পারিবারিক কাঠামোকে কী পরিমাণ অবহেলা করা হচ্ছে তার উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, জাতিসংঘ এ পর্যন্ত মানবাধিকার, নারী অধিকার ও শিশু অধিকারসহ আরো বহু অধিকার আদায় করার জন্য আইন প্রণয়নসহ আরো বহু পদক্ষেপ নিয়েছে। কিন্তু পারিবারিক অধিকার রক্ষা বা পারিবারিক কাঠামো রক্ষার কথা কাউকে বলতে শোনা যায় নি। 'পরিবারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ' শীর্ষক বইয়ে পরিবার ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রের জন্য পশ্চিমা সরকারগুলোকে দায়ী করা হয়েছে। গার্ডনার মনে করেন, পশ্চিমা সরকারগুলো চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে ব্যক্তিগত বিষয়গুলোতে হস্তক্ষেপের দিক দিয়ে সাবেক কমিউনিস্ট শাসিত দেশগুলোর পর্যায়ে চলে গেছে। সুদূর অতীতকাল থেকে সমকামীতা একটি চরম জঘন্য ও ঘৃনিত বিষয় বলে বিবেচিত হয়ে আসলেও বর্তমানে পশ্চিমা দেশগুলোতে এ বিষয়টিকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। সমকামীদের কথিত অধিকার রক্ষার জন্য আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। অনেক পশ্চিমা দেশে সমকামীদের বিয়ে করার অনুমতি দেয়া হচ্ছে এবং গর্ভপাতকেও বৈধতা দেয়া হচ্ছে। গার্ডনার তার বইয়ে এক্ষেত্রে বৃটিশ লেখক এ্যালডাস হ্যাক্সলির (Aldus Haxly) একটি উদ্ধৃতি তুলে ধরেছেন। হ্যাক্সলি বলেছেন, "পশ্চিমা দেশগুলোতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা না থাকার কারণে যে শ্বাসরুদ্ধ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে জনগণকে মুক্তি দেয়ার জন্য অবাধ যৌন স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে।" অর্থাৎ পশ্চিমারা নিজেদেরকে স্বাধীনতার প্রবক্তা বলে দাবি করলেও তারা যে তাদের জনগণকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা দিতে পারে নি, সেকথা পশ্চিমা ঐ লেখকের কথায় ফুটে উঠেছে। গার্ডনার এ সম্পর্কে বলেছেন, যৌন স্বাধীনতা পশ্চিমা সরকারগুলোর জন্য এমন একটি অস্ত্রে পরিণত হয়েছে যা দিয়ে তারা নৈতিক মূল্যবোধ ও পারিবারিক কাঠামোকে ধ্বংস করছে। তিনি বলেন, কোন নিয়ম-নীতি যখন সরকারের পক্ষ থেকে সমাজের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়, তখন কিছুদিন এ ব্যাপারে গণমাধ্যমের সাহায্যে বিভিন্ন ধরনের প্রচারণার মাধ্যমে বিষয়টিকে দৃষ্টিনন্দন করে তুলে ধরা হয়। অনেক সময় এ ব্যাপারে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতাও চলে যেটা পশ্চিমা সমাজে বর্তমানে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার ক্ষেত্রে হয়েছে। কিন্তু চূড়ান্তভাবে সমাজ ধ্বংসের মাধ্যমে সরকারের চাপিয়ে দেয়া নীতির দৈন্যতা ফুটে উঠবেই। উইলিয়াম গার্ডনারের মতে, মূলত পশ্চিমা সরকারগুলো পারিবারিক কাঠামো ধ্বংসের জন্য দায়ী হলেও সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট আরো কিছু বিষয়ও এজন্য দায়ী। এক্ষেত্রে তিনি পশ্চিমা শিক্ষা ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন। স্কুলের কোমলমতি শিশুদেরকে পারিবারিক কাঠামোর মধ্যে বেড়ে ওঠার শিক্ষা দেয়া উচিত হলেও দুঃখজনকভাবে পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থায় এ ধরনের কোন পাঠ্য নেই। "পরিবারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ" শীর্ষক বইয়ে পাশ্চাত্যের স্কুলগুলোর ভয়াবহ চিত্রের কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানকার স্কুলে এলকোহল ও মাদক সেবন, আগ্নেয়াস্ত্র বহন এবং যৌন অনাচার উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে উল্লেখ করে গার্ডনার প্রশ্ন করেছেন, এমন অবস্থা সৃষ্টি হলো কেন? এরপর এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতাকে গুরুত্বহীন বিষয় হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে এবং কোমলমতি সন্তানদেরকে পিতামাতার সাথে বেয়াদবী করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। গার্ডনারের বইয়ে আরো বলা হয়েছে, পাশ্চাত্যের স্কুলগুলোতে যৌনশিক্ষা বলে যে পাঠ্য চালু করে দেয়া হয়েছে, তা কোমলমতি শিশুদের যৌনাচারে উস্কে দিচ্ছে। কথিত ঐ যৌনশিক্ষা বিয়ে, পরিবার ও সমাজ ধ্বংসের সবচেয়ে বড় হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। গার্ডনার আরো স্পষ্ট করে বলেছেন, যৌনশিক্ষার নামে স্কুলে যা শেখানো হচ্ছে, তাতে বাচ্চাদের আর পর্নোগ্রাফি দেখার প্রয়োজন নেই। বয়ো:সন্ধিকালে শিশুরা আগে যেখানে পিতামাতার সাথে বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলতো, যৌনশিক্ষার মাধ্যমে এখন আর তারা সে প্রয়োজন অনুভব করছে না, নিজেরাই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে পরিচালিত জনমত জরীপে দেখা গেছে, কথিত যৌনশিক্ষা চালু থাকার পরও অনাকাঙ্খিত গর্ভধারণ, গর্ভপাতসহ এ ধরনের অনৈতিক কাজের পরিমাণ কমে যাওয়ার পরিবর্তে উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। কানাডিও লেখক গার্ডনারের মতে, পারিবারিক কাঠামো ধ্বংসের আরেকটি কারণ হচ্ছে ফেমিনিযম বা কথিত নারীবাদী আন্দোলন। তিনি এক্ষেত্রে উগ্র নারীবাদীদের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন যারা স্বামীর কাছ থেকে ডিভোর্স গ্রহণ করে নারীদের সমকামী হতে উস্কে দিচ্ছে এবং তাদেরকে মা হতে নিষেধ করছে। তিনি নারীবাদীদের এ কাজের তীব্র বিরোধিতা করেন। গার্ডনার সমাজের বিভিন্ন অঙ্গনে নারীর অংশগ্রহণ অনস্বীকার্য হলেও সংসারে তাদের উপস্থিতি এবং সন্তান লালন পালনে তাদের ভূমিকাকে সবচেয়ে বেশী উপকারী বলে মনে করেন। তিনি বলেন, আমি অতি খারাপ মায়ের চেয়ে শিশুদের ডে কেয়ার সেন্টারে পাঠানোকে শ্রেয় মনে করবো। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, একজন সাধারণ মায়ের জায়গা কেউই পূরণ করতে পারে না, আর মা যদি ভালো হয়, তাহলেতো আর কথাই নেই। উইলিয়াম গার্ডনার স্বাভাবিক ও ঐতিহ্যগত পারিবারিক কাঠামোর জন্য সমকামিতা এবং সমকামীদের মাধ্যমে পরিবার গঠনকে মারাত্মক হুমকি বলে মনে করেন। সমকামী আন্দোলনকারীরা যে সব লোকভোলানো কথা বলে, বিভিন্ন যুক্তির মাধ্যমে তা খণ্ডন করে তিনি বলেন, এই অস্বাভাবিক ও অপ্রাকৃতিক যৌনাচার পরিবার, সমাজ- এমনকি সমকামীদের নিজেদের জন্যও বিপদজনক ও ক্ষতিকর। পরিবারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শীর্ষক বইয়ে পশ্চিমা সমাজের আরো যেসব অনাচারের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে তার মধ্যে গর্ভপাতের মাধ্যমে অঘোষিত জাতিগত শুদ্ধি অভিযান অন্যতম। গার্ডনার গর্ভপাতকে মানবতার বিরুদ্ধে ভয়াবহ অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যদিও পশ্চিমা দেশগুলোতে মনোরম প্রচারণার মাধ্যমে এ কাজে তরুণ-তরুণীদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, "একজন নারী ও একজন পুরুষ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সন্তান ধারণের মাধ্যমে সুস্থ ও স্বাভাবিক পরিবার গঠন করেন। কিন্তু সমকামীরা যে কথিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয় সেটা দুই পুরুষই হোক কিংবা দুই নারী- তাকে কোনভাবেই স্বাভাবিক পরিবার বলা চলে না। এছাড়া বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না হয়েই দুই নারী পুরুষের একত্রে থাকাকেও পরিবার বলা যায় না, কারণ, এখানে কারো কোন দায়বদ্ধতা নেই। গার্ডনার তার বইয়ের শেষাংশে বলেছেন, পারিবারিক কাঠামোর ওপর যত হামলাই চালানো হোক না কেন, এ কাঠামো টিকে থাকবে। কারণ, পাশ্চাত্যে লোকভোলানো যেসব শ্লোগান দিয়ে পরিবার ধ্বংসের চক্রান্ত করা হচ্ছে, তা বেশীদিন চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে তিনি সুস্থ মস্তিস্কসম্পন্ন বিবেকবান মানুষদের পারিবারিক কাঠামো রক্ষার কাজে এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছেন।#

Friday, January 2, 2009

গাজা ও কারবালার শাহাদতের সংস্কৃতি

বর্ষ-পরিক্রমায় আবারও ফিরে এসেছে বুকের বেদনায়-ঢাকা মহররম মাস ও রক্তের আখরে লেখা আশুরা-বিপ্লবের শিহরণ-জাগানো দিনগুলো। দিকে দিকে আবারও শ্রদ্ধাভরে উচ্চারিত ও ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে মুক্তিকামী মানুষের নেতা চিরউন্নত-শির হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ)'র চিরঅক্ষয় নাম। ইসলামের এই ত্রাণকর্তা ও মহান ইমাম অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও সত্যের জন্য চরম আত্মত্যাগের চির-উজ্জ্বল, চির-সুন্দর এবং প্রেমময় দৃষ্টান্ত। আত্মত্যাগের ইতিহাসে তিনি কালোত্তীর্ণ ও চিরসবুজ প্রতীক। মুক্তিকামী মানুষের নয়নমনি ও নিপীড়িত মানুষের ধ্যানের ছবি ইমাম হোসাইন (আঃ) ধর্ম, মানবিকতা, বিবেক, মনুষ্যত্ব, মর্যাদাবোধ এবং যুক্তি, সত্য, মহত্ত্ব ও সর্বপরি খোদা-প্রেমের সবগুলো মানদন্ডে মানবজাতি ও মানবইতিহাসের নজিরবিহীন মডেল। প্রায় ১৪০০ বছর আগে সত্যের পক্ষে মৃত্যুবরণ করে তিনি শুধু ইসলাম ধর্মেরই নয় একইসাথে মানবজাতির মর্যাদা রক্ষা করেছেন। তিনি শিখিয়ে গেছেন মুক্তির এই মহামন্ত্র যে, "যতদিন থাকবে ধরায় আত্মদান অত্যাচারীর খড়গ-কৃপানে মানবতা হারাবে না সম্মান জেগে ওঠে ইসলাম পুণরায় জগতের প্রতিটি কারবালায়।" সত্যের পক্ষে আত্মদান যে বৃথা যায় না, বরং তা যে সমাজের ওপর জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসা তাগুতি শক্তিকে নির্মূল করার এবং সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জমে থাকা জুলুম, অত্যাচার, দুর্নীতি, অবিচার, ভীরুতা, আপোসকামীতাসহ সমস্ত পাপ-পংকিলতার মূলোৎপাটনের মহৌষধ তারই প্রমাণ আশুরার এই মহাবিপ্লব। শাহাদতে যে গোটা সমাজকে মুক্তিপাগল ও বিশুদ্ধ-আদর্শকামী করে তোলার মোক্ষমতম পন্থা মানুষের অন্তরের অন্তস্থলে অক্ষয় আসনের অধিকারী ইমাম হোসাইন সহ তাঁর প্রকৃত অনুসারীরা তা যুগে যুগে প্রমাণ করেছেন। তারা দেখিয়ে গেছেন শাহাদতেই রয়েছে প্রকৃত জীবন তথা মর্যাদার জীবন, আর অন্যায়ের সাথে আপোস করে বেঁচে থাকার মধ্যে রয়েছে বঞ্চনা ও অবমাননার দুঃসহ গ্লানি। শাহাদতের চির-অম্লান আইকন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন কবির এই অমর বাণীঃ জীবনের চেয়ে দৃপ্ত মৃত্যু তখনই জানি শহীদী রক্ত হেসে ওঠে যবে জিন্দেগানী।
ইসলামের মহান খেলাফত ও ইসলামের অস্তিত্ব যখন মুসলিম নামধারী জালেম এবং তাগুতি শক্তির হাতে পুরোপুরি বিলুপ্তির সম্মুখীন ইসলাম ও মানবতার সেই মহাদূর্দিনে নিজ আন্দোলনের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে আশুরা বিপ্লবের মহানায়ক হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) বলেছিলেন, " তোমরা কি দেখছো না সত্যের বা ন্যায়ের পক্ষে কাজ করা হচ্ছে না এবং কেউই অন্যায়ের বিরোধিতা করছে না? এ অবস্থায় এমন লাঞ্ছনার জীবনের চেয়ে একজন বিশ্বাসী বা মুমিন ব্যক্তির জন্য আল্লাহর সাথে মিলন তথা শাহাদতই বেশী কাম্য। " ভারতবর্ষে ইসলাম ধর্ম প্রচারের অন্যতম প্রধান অগ্রদূত ও বিশিষ্ট ইরানী সূফী সাধক হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশতি (রঃ) হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ)'র কালজয়ী বিপ্লবের প্রশংসা করে বলেছেন, হোসাইনই ধর্ম এবং ধর্মের রক্ষাকর্তা, তিনিই লা-ইল্লাল্লাহর ভিত্তি বা বুনিয়াদ রক্ষাকারী, শির দিয়েছেন, তবুও ইয়াজিদের হাতে হাত দেন নি বা ইয়াজিদের আনুগত্য স্বীকার করেন নি। শাহাদত জীবনকে দেয় অপার মহিমা। এ কারণেই পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, যাঁরা আল্লাহর পথে শহীদ তাঁদের মৃত বলো না। শহীদ অধ্যাপক আয়াতুল্লাহ মূর্তাজা মোতাহহারী এ প্রসঙ্গে বলেছেন, শহীদের উপমা হচ্ছে এমন এক প্রদীপের মত যে নিজেকে পুড়িয়ে অন্যদেরকে আলো দেয় বা পথ দেখায়। কারবালায় উৎসর্গীকৃত ও নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গীদের শাহাদতের দৃশ্য দেখে শাহাদত-প্রিয় ইমাম হোসাইন (রাঃ) বলেছিলেন, "হে আমার মাবুদ! হে আমার প্রভু! তোমার আনুগত্য ও ভালবাসার পথে সত্তুর হাজার বার নিহত ও জীবন্ত হতে আগ্রহী, বিশেষ করে যদি আমার প্রাণদান তোমার ধর্মকে সহায়তা করে এবং তোমার বিধান ও শরীয়তকে জীবিত করে। " হ্যাঁ, ইসলামের সংস্কৃতিতে এ ধরনের শাহাদত মহান আল্লাহর সান্নিধ্যের ও পরিপূর্ণতার চরম শিখর। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ বিশ্বাসী ও আস্থাশীল হযরত ইমাম হোসাইন (রা)'এর শাহাদতের মুহূর্ত যতই ঘনিয়ে আসছিল ততই তাঁর নূরানী চেহারা আনন্দে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠছিল। ইমামের তরুণ পুত্র শহীদ আলী আকবর বলেছিলেন, আমরা যেহেতু সত্যের পথে আছি, শাহাদত আমার কাছে মধুর চেয়েও বেশী প্রিয়। আশুরা-বিপ্লব বা শাহাদতের সংস্কৃতিতে উজ্জ্বীবিত হয়েই বিংশ শতকে বিধ্বংসী মারণাস্ত্র ও পরাশক্তির রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ইরানের মুসলিম জাতি মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)'র নেতৃত্বে সংঘটিত করেছে ইসলামী বিপ্লব। শাহাদত-পাগল ইরানী জাতির কাছে দুই পরাশক্তির সমর্থনপুষ্ট সাদ্দামের সমাজতান্ত্রিক বাহিনী নাস্তানাবুদ হয়েছে। একই আদর্শে উজ্জ্বীবিত লেবাননের হিজবুল্লাহ ও গণপ্রতিরোধ বাহিনী দখলদার ইসরাইলের অপরাজেয় থাকার দর্প চূর্ণ করেছে। কারবালার ময়দান ছিল ঈমান ও ধর্মীয় চেতনা রক্ষার পাশাপাশি মানবতাবোধ, মানবাধিকার এবং বিবেক ও মনুষ্যত্ব রক্ষার এক বড় পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় কুফার অধিকাংশ জনগণ ব্যর্থ হয়েছিল, ব্যর্থ হয়েছিল মুসলিম উম্মাহর এক বিশাল অংশ। মুসলিম নামধারী ইয়াজিদ ও ইবনে-জিয়াদ চক্র ফোরাতের পানি থেকে ইমাম পরিবার এবং তার সঙ্গী-সাথীদের বঞ্চিত করে পাশবিকতার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছিল। ইমাম হোসাইন (রা)পানির পিপাসায় কাতর মৃতপ্রায় ৬ মাসের নিষ্পাপ শিশু হযরত আলী আসগরের জন্য পানি প্রার্থনা করলে ইয়াজিদের অনুগত সেনারা এই শিশুর গলায় তীর নিক্ষেপ করে তাঁকে শাহাদতের অমিয় সুধা পান করতে বাধ্য করে। অথচ ইমাম হোসাইন (রা) তার বিরুদ্ধে লড়তে আসা শত্রু সেনারা যাতে পানির অভাবে কষ্ট না পায় সে জন্য কারবালায় আসার পর পরই তিনি পানি সঞ্চয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। ইয়াজিদী শাসকগোষ্ঠী ও তার অনুসারীদের ধর্মবোধ তো দূরের কথা মানবতাবোধ বা মনুষ্যত্ববোধও ছিল না। আজ আমরা একই ধরনের চিত্র দেখছি ফিলিস্তিনের গাজায়। প্রায় দুই বছর ধরে গাজার অধিবাসীরা ইসরাইলী অবরোধের ফলে জ্বালানী, খাদ্য ও ওষুধসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অভাবে ধুকে ধুকে মরছে। অথচ মানবাধিকারের ও কথিত গণতন্ত্রের সমর্থক পশ্চিমা সরকারগুলো এ ব্যাপারে নীরব থেকে দখলদার ইসরাইলকে উৎসাহ যুগিয়ে আসছে। শুধু অবরোধেই ক্ষান্ত হয়নি মানবতার শত্রু ইসরাইল ও তার দোসরারা। গণতান্ত্রিকভাবে নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচনে বিজয়ী ইসলামপন্থী হামাস সরকারকে সমর্থনের কারণে গাজা ও পশ্চিম তীরে হামাসের সমর্থক ফিলিস্তিনীদের ওপর সন্ত্রাসী হত্যা অভিযানও চালিয়ে আসছে বর্তমান যুগের এই ইয়াজিদী গোষ্ঠী। আর এসব হামলার জবাবে অসম শক্তির অধিকারী হামাস মাঝে মধ্যে দখলদার ইহুদিবাদীদের অবৈধ বসতিগুলোর ওপর সাধারণ মর্টার ও রকেট নিক্ষেপ করায় হামাসের আত্মরক্ষার এই শক্তিটুকুকেও নির্মূল করার জন্য আজ প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সেখানে পাইকারীভাবে শক্তিশালী ও এমনকি ইউরেনিয়ামযুক্ত বোমা বর্ষণ করে নারী ও শিশুসহ শত শত বেসামরিক ফিলিস্তিনীকে শহীদ করেছ ইসরাইলী হায়েনার দল। দুঃখজনক ব্যাপার হলো সেইযুগের ইয়াজিদের সহযোগী ইবনে জিয়াদ, শিমার ও ওমর সাদের মত কোনো কোনো আরব সরকার ইসরাইলের এ গণহত্যায় গোপনে শরীক বা সহযোগী হয়েছে। গাজার মসজিদ, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিশুদের স্কুলগুলোও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকৃত স্মার্ট বোমার ছোবল থেকে রেহাই পাচ্ছে না। কিন্তু যারা আশুরার শাহাদতের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে এমন জাতির জাগরণকে এটম বোমা মেরেও স্তব্ধ করতে পারবে না পশু শক্তি। আধুনিক সভ্যতার যুগেও বিবেক-বিসর্জিত যে শক্তি হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা মেরে দেশটিকে নতজানু করতে পেরেছে, সেই শক্তি আজ শাহাদতের চেতনায় উজ্জ্বীবীত ইরাকী ও আফগান জাতির কাছেও পরাজয়ের সম্মুখীন। কারবালার বীর শহীদানের মতো গাজার শহীদানরাও আজ আঁজলা ভরে প্রাণের সঞ্চার করছে মসলিম উম্মাহর শিরা-উপশিরা ও ধমনীতে। তাই ইমাম হোসাইন (রা)'র আদর্শের অনুসারীরা আজ শুধু কথায় নয় কাজের মাধ্যমে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সবক্ষেত্রে কুফুরি শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এবং মুসলমানদের প্রথম কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাস দখলদারদের বিরুদ্ধে এ ধরনের লড়াইয়ে অংশ নিলেই বিশ্বনবী (সাঃ) ও ইমাম হোসাইন (আঃ)'র পবিত্র আত্মা প্রশান্তি পাবেন। মহান আল্লাহই পবিত্র কোরআনে বলেছেন, তোমরা হীনবল হয়োনা, ভীত হয়ো না, তোমরাই শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করবে, যদি তোমরা মুমিন হও। হ্যা, ইমাম হোসাইন (আঃ)'র রক্ত যেমন তরবারীর ওপর বিজয়ী হয়েছিল তেমনি আল্লাহর শক্তিতে পূর্ণ বিশ্বাসী গাজার বীর মুজাহিদ এবং অসহায় নারী ও শিশুদের রক্তও এ যুগের ইয়াজিদ, চেঙ্গিজ ও হালাকু খাঁর মত পশুশক্তির ওপর বিজয়ী হবে। এ বিজয় কেবলই সময়ের ব্যাপার। কারণ, গাজার তরুণ শিশুসহ সেখানকার সবার মুখে মুখে এখন এ শ্লোগান ধ্বনিত হচ্ছে - হাসবুন আল্লাহু ওয়ানেয়ামাল ওয়াক্বীল- আমাদের জন্য আল্লাহ এবং তাঁর অভিভাবকত্বই যথেষ্ট। বিবেক মানুষের ফিতরাত বা প্রকৃতির অংশ। বিবেকের দংশনে কারবালার নরঘাতকদের কেউ কেউ পাগল হয়ে গিয়েছিল, পাগল হয়েছিল হিরোসীমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা নিক্ষেপের মাধ্যমে দুই লক্ষেরও বেশী মানুষ হত্যাকারী মার্কিন বৈমানিক। ইসরাইলের সহযোগী আরব ও পশ্চিমা বিশ্বের নেতারা কি তাহলে মানুষ নন? #