Tuesday, January 19, 2010

ইন্টারনেট প্রযুক্তিতে বাংলার ব্যবহার ও জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে 'বাংলা'র অন্তর্ভূক্তি দাবী

বর্তমান বিশ্বের সাড়ে ৬০০ কোটি মানুষ প্রায় ৬ হাজার ভাষায় কথা বলে। তবে ভাষাতত্ত্ববিদরা মনে করছেন, আগামী একশ বছরের মধ্যে প্রায় তিন হাজার ভাষা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কারণ অতীতেও অনেক ভাষা পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে। একসময় পাশ্চাত্যের একটি বিখ্যাত ভাষা ছিল ‘ল্যাটিন’ । কিন্তু এ ভাষায় এখন আর কেউ কথা বলে না। ভারতীয় উপমহাদেশের এমন একটি ভাষার নাম ‘সংস্কৃত’ । ধর্মীয় কাজের বাইরে এর কোন ব্যবহার নেই। মধ্যযুগে ব্রিটেনের একটি ভাষা ছিল ‘কর্নিশ’। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত একজন মহিলা জীবিত ছিলেন যিনি ঐ ভাষায় কথা বলতেন। তার মৃত্যুর পর ঐ ভাষাটিও বিলুপ্ত হয়ে যায় । ‘The languages of the world’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের জরিপ অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রায় ৬ হাজারের মতো ভাষা আছে। এগুলোর মধ্যে মাত্র ৪ শতাংশ অর্থাৎ শ'তিনেক ভাষায় পৃথিবীর ৯৬ ভাগ মানুষ কথা বলে। বাকী সাড়ে পাঁচ হাজার ভাষার মধ্যে যেসব ভাষায় কথা বলার লোক এক লাখের বেশী নেই, সেগুলোর মধ্যে বেশকিছু ভাষা এখন বিলুপ্তির পথে। এক হিসেবে দেখা গেছে, আজকের পৃথিবীতে প্রতি দুই সপ্তাহে একটি করে ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, পৃথিবীতে এমন ৫১টি ভাষা আছে যেগুলোর প্রতিটিতে মাত্র একজন করে ব্যবহারকারী রয়েছে! এ চিত্র থেকে একটা বিষয় পরিস্কার যে, বিশ্বের জীবন্ত ভাষাগুলো দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। এই বিলুপ্তির হার বন্যপ্রাণী কিংবা গাছপালা বিলুপ্তির হারের চেয়েও বেশী। কিন্তু বাংলাভাষার ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত দেখা যায়। বিশ্বে বাংলা ভাষার অবস্থান বর্তমান বিশ্বে প্রায় ২৬ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। ব্যবহারকারীর সংখ্যার দিক থেকে বাংলা ভাষার স্থান ষষ্ঠ। শুধু বাংলাদেশের মানুষই যে এ ভাষায় কথা বলে তা নয় বরং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মণিপুর, বিহার ও উড়িষ্যা এবং মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলের রোহিঙ্গারাও বাংলা ভাষায় কথা বলে। আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিয়নে বাংলাকে ২য় সরকারী ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে সেদেশের জনগণ বাংলাভাষা শিক্ষা করছে। বাংলা ভাষার আন্দোলন বিশ্বে বাংলাই সম্ভবতা একমাত্র ভাষা-যার মর্যাদা রক্ষার জন্য ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারী ঢাকায় পুলিশের গুলিতে আব্দুস, সালাম,রফিক, বরকত, জব্বার সহ আরো অনেকে প্রাণ দিয়েছেন। এই ঘটনার প্রতিবাদে সারা পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে ও তীব্র আকার ধারণ করে। অবশেষে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে উর্দুর সম-মর্যাদা দিতে বাধ্য হয়। এছাড়া ’৫২-এর চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে ১৯৬১ সালের মে মাসে বাংলা ভাষার ব্যবহার বন্ধ করার প্রতিবাদে ভারতের আসামের শিলচর শহরে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছেন ১১ জন। ১৯৬১ সালে আসাম প্রাদেশিক সরকার শুধু অহমীয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র সরকারী ভাষা ঘোষণা দিলে বাঙালীদের ভেতর ক্ষোভ দানা বাঁধে । ক্রমশঃ তা আন্দোলনে রূপ নেয় । ১৯ মে শিলচরে সকাল ৬টা-সন্ধ্যা ৬টা ধর্মঘট পালন করে। বেলা সাড়ে তিনটায় ভাষাবিপ্লবীরা যখন স্থানীয় রেলওয়ে ষ্টেশনে রেলপথ অবরোধ পালন করছিল তখন আসাম রাইফেলসের একটি ব্যাটালিয়ান তাদের বাধা দিলে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে আসাম রাইফেলস গুলবর্ষণ করলে ঘটনাস্থনে প্রাণ হারান ১১জন ভাষাবিপ্লবী। রাজ্য সরকার শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য হয়। এরপর আসামে বাংলাকে ২য় রাজ্যভাষা হিসাবে ঘোষণা করা হয়। বাংলা ভাষার প্রতি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করতে গিয়ে বাঙালীরা যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন তা ইউনেস্কোর নজরে আনার জন্য কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশীদের সংগঠন ‘মাদার ল্যাংগুয়েজ অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড’ প্রচেষ্টা শুরু করে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর তাদের প্রচেষ্টা সফল হয়। ওই দিন ইউনেস্কোর ৩০তম অধিবেশনে বাংলাদেশ ও সৌদি আরব ২১শে ফেব্রুয়ারীকে ‘আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে স্বীকৃতি জানানোর প্রস্তাব উত্থাপন করে এবং অপর ২৫টি দেশের সদস্যরা সেটিকে অনুমোদন করে। এরপর থেকে সারা বিশ্বে প্রতি বছর পালিত হয়ে আসছে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।' ইউনেস্কোর পর জাতিসংঘও একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০০৮ সালের গত ৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্র দফতর ‘শান্তির জন্য সংস্কৃতি’ শীর্ষক একটি রেজুলেশন জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে তুলে ধরে। ভারত, জাপান, সৌদি আরব, কাতারসহ বিশ্বের ১২৪টি দেশ এই রেজুলেশনটি সমর্থন করে। এই রেজুলেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে এবং শান্তির জন্য সংস্কৃতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংস্কৃতির সংলাপকে উৎসাহিত করতে মাতৃভাষাগুলোর অবদানের স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাকে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা করার দাবি ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে জাতিসংঘ ভাষা শহীদদের প্রতি নিঃসন্দেহে ব্যাপক সম্মান দেখিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এতেই কি সন্তুষ্ট ? মোটেই না। আর এ জন্যই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৪তম অধিবেশনে বাংলাভাষাকে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে গ্রহণ করার জন্য সদস্য দেশগুলোর সমর্থন চেয়েছেন । ভাষা আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলার জন্য বাংলাদেশের ভাষা শহীদরা জীবন দিয়েছিলেন। সেদিনের স্বীকৃতি স্বরূপ প্রতি বছর এই দিন ইউনেস্কো বিশ্বের সকল ভাষার প্রতি সম্মান দেখিয়ে দিবসটি পালন করে।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘সম্প্রতি আমাদের পার্লামেন্ট জাতিসংঘকে অনুরোধ করেছে বাংলাকে এর অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার জন্য। ভাষার শক্তির প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে বাংলাকে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে গ্রহণ করতে আমি সকল সম্মানিত সদস্যের সমর্থন কামনা করছি।’ বাংলাকে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দাবির সাথে একমত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। গত ২১শে ডিসেম্বর ২০০৯ জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিসংবলিত একটি সর্বদলীয় প্রস্তাব পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় গৃহীত হয়েছে। প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার স্পিকার হাসিম আবদুল হালিম। জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে এখন ছয়টি ভাষা স্বীকৃত। এসব ভাষা হলো- ইংরেজি, চাইনিজ, আরবি, ফরাসি, রাশিয়ান ও স্প্যানিস। এর মধ্যে রাশিয়ান ভাষায় কথা বলে বিশ্বের প্রায় ১৭ কোটি মানুষ এবং বিশ্বের প্রায় ২২ কোটি মানুষ আরবিতে কথা বলে । কিন্তু বাংলায় কথা বলে প্রায় ২৬ কোটি মানুষ। ফলে রুশ ও আরবি যদি জাতিসংঘের অফিশিয়াল ভাষা হওয়ার যোগ্যতা রাখে তাহলে বাংলা কেন পারবে না? সরকার যদি কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করে তাহলে একদিন না একদিন বাংলাভাষা অবশ্যই জাতিসংঘের অফিশিয়াল ভাষার স্বীকৃতি পাবে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বাংলা ভাষা বর্তমানে বিভিন্ন সংবাদ সংস্থা, রেডিও, টেলিভিশন, ও ইন্টারনেটে ব্যাপকভাবে বাংলা ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ,ভারত ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, জার্মানী, চীন, ইরান, সৌদি আরব, পাকিস্তান, ফিলিপাইন,জাপান প্রভৃতি দেশ থেকে প্রতিদিনই বাংলা ভাষায় রেডিও অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়ে থাকে। এছাড়া ব্রিটেন, কানাডার প্রবাসী বাংলাদেশীদের উদ্যোগে টিভি অনুষ্ঠানও প্রচার করা হচ্ছে। এসব রেডিও, টিভির অনুষ্ঠান থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালীদের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ভারতের বাংলাভাষীরা উপকৃত হচ্ছেন। ইন্টারনেট প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া বর্তমান যুগে কোন দেশই অগ্রসর হতে পারবে না। আর একারণেই ভাষাপ্রেমী প্রযুক্তিবিদরা তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে অনেকদিন ধরেই কাজ করে যাচ্ছেন। বাঙালী প্রযুক্তিবিদদের প্রচেষ্টায় বর্তমানে ফায়ারফক্স ব্রাউজার,ওপেন অফিস, জুমলা,গুগল, লিনাক্স, উবুন্টু এসব বাংলা ভাষায় রূপান্তর করা হয়েছে। ওয়েব ব্রাউজার মজিলা সম্প্রতি আটটি ভাষাতে বেটা সংস্করণ অবমুক্ত করেছে। এই আটটি ভাষার মধ্যে আমাদের মাতৃভাষা বাংলাও আছে। এর ফলে এখন থেকে আমরা বাংলা ভাষার ইন্টারফেসের ফায়ারফক্স ব্যবহার করতে পারবো। ফায়ারফক্সে এখন বাংলা অভিধানও যুক্ত আছে। সেটি সক্রিয় করে বাংলা লিখলে লেখার সময় বানানে ভুল হলে সতর্ক করা হয়। গুগলের দারুণ দারুণ সব সার্ভিস সম্পর্কে আমরা কে না জানি! গুগল সার্চ ইঞ্জিনে বাংলা অনেক আগে থেকে যুক্ত হলেও সার্চের সময় বাংলা অটো-কমপ্লীট যুক্ত হয়েছে কিছুদিন আগে। গুগলের আর একটি ভাল সার্ভিস হচ্ছে google transliteration, যে সব সাইটে বাংলা লেখার ব্যবস্থা নেই, সে সব ওয়েব ব্রাউজারে খুব সহজেই বাংলা লেখা সম্ভব। গুগল ট্রান্সলেটরে বাংলা ভাষা না থাকলেও গুগল অভিধানে সম্প্রতি বাংলা ভাষা যুক্ত হয়েছে। বহুল পরিচিত ও জনপ্রিয় সোসাল সাইট ফেসবুকেরও বাংলা রূপান্তর করা হয়েছে। ব্লগার ডট কম আংশিক বাংলা ভার্সন তৈরি হয়েছে প্রায় বছর খানেক আগেই। সম্প্রতি এ কার্যক্রম তাদের জনপ্রিয় মেইল সার্ভিসেও প্রয়োগ করেছে। বলতে গেলে পুরো বাংলাতেই এখন কম্পিউটারের অনেক কিছু ব্যবহার করা সম্ভব। উইকিপিডিয়া ও বাংলাপিডিয়ায় বাংলা ইন্টারনেটে বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় তথ্যভাণ্ডার হচ্ছে বাংলা উইকিপিডিয়া। ইন্টারনেটে মুক্ত বাংলা বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ার নিবন্ধের সংখ্যা ২০ হাজার অতিক্রম করেছে। প্রসঙ্গত ২০০৪ সালে বাংলা উইকিপিডিয়ার কাজ শুরু হলেও শুরুতে এর অগ্রগতি ছিল ধীরগতির। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের বাংলা উইকি দল গঠনের পর থেকে দ্রুত এটি বিস্তৃত হতে থাকে। এখানে বাংলা ভাষার ইতিহাস,বাংলা বর্ণের উৎপত্তির বর্ণনা পাওয়া যায়। এছাড়া ভাষা আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের দিনপঞ্জিও রয়েছে। এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত একটি বিশ্বকোষ হলো বাংলাপিডিয়া। ২০০৩ সালে ১০ খন্ডে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই এটি ছাপা হয়। এছাড়া এর ইলেকট্রনিক সংস্করণও প্রকাশিত হয়। এখানে প্রায় ১২০০ লেখকের লেখা স্থান পেয়েছে। ওয়েবসাইটেও এসব তথ্য বিদ্যমান। বাংলা ভাষা, ভাষা আন্দোলন, একুশে ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সম্পর্কে বাংলায় প্রচুর তথ্য রয়েছে। প্রয়োজন সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার অমর একুশকে জাতিসংঘের স্বীকৃতি, সিয়েরা লিয়নে বাংলাকে দ্বিতীয় ভাষার মর্যাদাদান এবং ইন্টারনেট প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার বহুল ব্যবহারের পরও বাংলা ভাষার ব্যবহার ও চর্চার ব্যাপক ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামের মানুষজন আঞ্চলিক বাংলায় কথা বললেও শহরাঞ্চল বিশেষকরে রাজধানী কোলকাতার অধিকাংশ বাঙালী ইংরেজি ও হিন্দির চর্চা করে। ফলে বাংলা ভাষা সেখানে আত্মাহুতি দেয়ার মুখে। এ দিকটি লক্ষ্যে করেই ভারতের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কয়েক বছর আগে বলেছিলেন, “আগামী পঞ্চাশ বছর পরে বাংলা ভাষার চর্চা হবে কেবলমাত্র ঢাকা কেন্দ্রিক।” সুনীল বাবুর বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা যথার্থ কিনা তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। কারণ খোদ বাংলাদেশের উচ্চ আদালতে ভাষার ব্যবহার এখনও চালু হয়নি । উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষা এখনও উপেক্ষিত। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও বাংলা ভাষার চর্চা নেই। অনার্স, মাস্টার্স কিংবা পিএইচডি কোর্স কোথাও বাংলা সাহিত্যের জায়গা নেই। অথচ মহান ভাষা আন্দোলনের মূল দাবি ছিলো- ‘অফিস আদালতে সর্বত্র বাংলাভাষা ব্যবহার করতে হবে । আমাদের সংবিধানের প্রথমেই শেখা আছে,‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। কিন্তু তারপরও সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালু এবং ‘শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলাভাষা’ চালু কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কোন উদ্যোগ এখনো নেই। নিজ দেশের সর্বত্র যদি আমরা বাংলা ভাষার ব্যবহার না করতে পারি তাহলে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে বাংলাকে অন্তর্ভূক্তির চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।

Wednesday, August 19, 2009

পাশ্চাত্যের মানুষ পুনরায় চারিত্রিক পবিত্রতার দিকে ঝুঁকছে

এক. মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই সততা ও চারিত্রিক পবিত্রতাকে পছন্দ করে। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, মানুষ যতই নৈতিক মূল্যবোধগুলোর প্রতি আগ্রহী হয়, ততই তাদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি পায়। পাশ্চাত্যে দীর্ঘকাল ধরে নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় সেখানকার নারী, পুরুষ, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। এ অবস্থায় সেখানকার নতুন প্রজন্মের কন্যা ও মেয়েরা পুনরায় চারিত্রিক পবিত্রতার দিকে ঝুঁকছে। তারা এখন অশ্লীলতা, ব্যাভিচার ও বিভিন্ন যৌন অনাচারের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবার জন্য আকুল হয়ে উঠেছে। পাশ্চাত্যের নতুন প্রজন্ম, বিশেষ নারী সমাজের একটা অংশসহ তরুণী ও যুবতীদের একটা বড় অংশ স্বাধীনতার নামে যৌন অনাচার ও অশ্লীলতা প্রসারের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির কঠোর বিরোধিতা করছে। যদিও পাশ্চাত্যের প্রচারমাধ্যমগুলো এ ধরনের তথ্য প্রচার করছে না, বরং বিপরীত তথ্যই প্রচার করছে। আই জি নামের নিউইয়র্ক-ভিত্তিক একটি জরীপ ও গবেষণা-প্রতিষ্ঠানের রিপোর্টে বলা হয়েছে, নিউইয়র্কের নতুন প্রজন্মের মেয়েরা তাদের আগের প্রজন্মগুলোর পছন্দের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন। অর্থাৎ সেখানকার এই প্রজন্মের মেয়েরা নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াতে এবং শরীরকে ফুটিয়ে তোলার জন্য ব্যবহৃত পোশাক-পরিচ্ছদ পরতে মোটেই আগ্রহী নয়। পাশ্চাত্যের নতুন প্রজন্ম, বিশেষ নারী সমাজের একটা অংশসহ তরুণী ও যুবতীদের একটা বড় অংশ স্বাধীনতার নামে যৌন অনাচার ও অশ্লীলতা প্রসারের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির কঠোর বিরোধিতা করছে। বরং তারা আধ্যাত্মিক ও আত্মিক চাহিদাগুলোর প্রতি বেশী গুরুত্ব দেয়ার দাবী জানাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে মার্কিন লেখিকা ওয়েন্ডি শালিত বলেছেন, আমরা সাংস্কৃতিক দিক থেকে এক স্পর্শকাতর সময়ের সম্মুখীন। পাশ্চাত্যে এখন ক্ষতিকারক সংগীত, বিভিন্ন ধরনের উস্কানীমূলক তৎপরতা, পরিবার ব্যবস্থায় ধ্বস, বিবাহ-বিচ্ছেদ, মাদকাসক্তি ও আদর্শিক অচলাবস্থা নারী ও কন্যাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। বর্তমান প্রজন্মের যুবতী ও কন্যারা অতীতের প্রজন্মের চেয়ে ভিন্ন ধরনের। তারা অবাধ বা লাগামহীন স্বাধীনতায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে, বরং তারা পুনরায় মানুষের প্রকৃতিগত সৎ-স্বভাব বা সতীত্বের মাধুর্য আস্বাদন করতে চাইছে। মার্কিন লেখিকা ওয়েন্ডি শালিত আরো বলেছেন, পাশ্চাত্যের বর্তমান প্রজন্মের যুবতী ও কন্যারা তাদের বাবা মায়েদের মত হাল্কা জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হতে চাইছে না। তারা তাদের পোশাকেও পরিবর্তন আনতে চাইছে। বরং তারা সংযম ও বিচক্ষণতা অবলম্বন করে সতীত্বকে যথাসম্ভব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। মিসেস রাচেল এ প্রসঙ্গে বলেছেন, প্রথম দিকে আমি সতীত্বের গুরুত্বের ব্যাপারে সন্দিহান ছিলাম। কিন্তু সতীত্ব সম্পর্কে মার্কিন লেখিকা ওয়েন্ডি শালিতের বই পড়ে এখন আমার চোখ খুলে গেছে। আমি এখন বুঝতে পেরেছি যে সঠিক পথ কোনটি। মহান প্রভুকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি যে আমি সময়মত এ বই পেয়েছি। আমি এখন সতীত্ব বজায় রাখার জন্য নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করছি এবং আমার মধ্যে জন্ম নিয়েছে আত্ম-বিশ্বাস। পাশ্চাত্যের অনেক মানুষ এখন যৌন অনাচার ও ব্যাভিচারের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৪ সালে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সেখানকার যুব প্রজন্মের যেসব সদস্য অবৈধ যৌন সম্পর্কে জড়িত হয়েছে তাদের দুই তৃতীয়াংশই এখন অনুতপ্ত। ২০০৫ সালে পরিচালিত অন্য এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিয়ের আগে যারা যৌন সম্পর্কে জড়িত হয়েছে এবং যারা মদ ও মাদক সেবনে অভ্যস্ত হয়েছে তারা যৌবনের এই সোনালী বয়সেই বিষন্নতা ও হতাশা বা নৈরাশ্যের শিকার। বিষন্নতার কারণে অনেক যুবতী শারীরীকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এ ধরনের যুবতী ও তরুনীরা এখন সতীত্ব বজায় রাখতে না পারার জন্য অনুশোচনা করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানাপলিস অঙ্গরাজ্যের ১৬ বছরের যুবতী লরেন অত্যন্ত কৃতী ছাত্রী হিসেবে পরিচিত। সে এখন নাইট-ক্লাবের বিভিন্ন পার্টির প্রতি বিতৃষ্ণ। তার মতে চিত্ত-বিনোদনের নামে সমবয়সী ছেলে বন্ধুদের সাথে রাত না কাটিয়ে মেয়েদের উচিত সমবয়সী মেয়েদের সাথেই অবসর-বিনোদনকে গুরুত্ব দেয়া । ২০০৬ সালে জগবি নামের খ্যাতনামা জরীপ সংস্থার এক জরীপে বলা হয়েছে, মার্কিন হাইস্কুলগুলোর দুই তৃতীয়াংশ ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের আচরণের ওপর বাবা-মায়ের নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারী রাখাকে জরুরী বলে মনে করছে। তারা চায় বাবা-মায়েরা তাদেরকে খারাপ স্থানে বা ক্ষতিকারক আড্ডায় যেতে নিরুৎসাহিত করুক। পাশ্চাত্যের কোনো কোনো স্থানের যুবক-যুবতীরা এখন ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে সংযমী হবার প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছে। এ ধরনের প্রশিক্ষণ ক্লাসে তারা তাদের সম্ভাব্য সমস্যা ও সেগুলোর সমাধান নিয়ে আলোচনা বা পরামর্শ করার সুযোগ পাচ্ছে। পাশ্চাত্যের অনেক যুবক-যুবতী এখন যৌন অনাচার ও ব্যাভিচারের বিস্তারের অন্যতম প্রভাবক বা চালিকা-শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত অশ্লীল ছায়াছবি, নাটক ও ম্যাগাজিনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। তাদের অনেকেই এখন লেখক লেখিকাদেরকে তাদের গল্প বা চিত্র-নাট্য থেকে যৌন-সম্পর্ক বিষয়ক বক্তব্য বা দৃশ্যগুলো বাদ দেয়ার অনুরোধ করছে। তাদের অনেকেই এখন এসব অশ্লীল বিষয়কে বস্তাপচা বিষয় বলে মনে করছে এবং তারা বলছে, আমরা নতুন অথচ ভালো কিছু চাই। আজকের এই আলোচনা শেষ করবো টেইলর ম্যুর নামের ১৮ বছর বয়স্ক এক মার্কিন যুবতীর বক্তব্য উদ্ধৃত কোরে। সংযম বিষয়ক প্রশিক্ষণ ক্লাসে অংশ গ্রহণকারী এই যুবতী তার সমবয়সী নতুন প্রজন্মের মেয়েদের উদ্দেশ্যে বলছেন, বন্ধুরা, সংযম খুবই ভালো কাজ। আমি অত্যন্ত গর্বের সাথে বলতে চাই যে আমি চারিত্রিক পবিত্রতা বা সতীত্ব বজায় রেখেছি। আসুন আমরা সবাই মূল্যবোধের প্রতি অবিচল থাকি। যৌন প্রবৃত্তিকে কেবল পরিবার গঠন ও মানুষের বংশ বিস্তার অব্যাহত রাখার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। সতীত্ব বা চারিত্রিক পবিত্রতা বজায় রাখা হলে মানুষের সত্তার সম্মান সব সময় বজায় থাকবে। দুই. মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই সততা ও চারিত্রিক পবিত্রতাকে পছন্দ করে। মানুষ যতই নৈতিক মূল্যবোধগুলোর মেনে চলে, ততই তাদের নিরাপত্তা বাড়ে। পাশ্চাত্যে দীর্ঘকাল ধরে নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় সেখানকার নারী, পুরুষ, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। এ অবস্থায় কন্যা ও মেয়েরাসহ সেখানকার নতুন প্রজন্মের অনেকেই পুনরায় চারিত্রিক পবিত্রতা এবং আধ্যাত্মিকতার দিকে ঝুঁকছে। পাশ্চাত্যের নতুন প্রজন্ম, বিশেষ নারী সমাজের একটা অংশসহ তরুণী ও যুবতীদের একটা বড় অংশ স্বাধীনতার নামে যৌন অনাচার ও অশ্লীলতা প্রসারের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির কঠোর বিরোধিতা করছে। যদিও পাশ্চাত্যের প্রচারমাধ্যমগুলো এ ধরনের তথ্য গোপন রেখে বিপরীত তথ্যই প্রচার করছে। আই জি নামের নিউইয়র্ক-ভিত্তিক একটি জরীপ ও গবেষণা-প্রতিষ্ঠানের রিপোর্টে বলা হয়েছে, নিউইয়র্কের নতুন প্রজন্মের মেয়েরা নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াতে এবং শরীরকে ফুটিয়ে তোলার জন্য ব্যবহৃত টাইট পোশাক-পরিচ্ছদ পরতে মোটেই আগ্রহী নয়। আই জি প্রতিষ্ঠানের গবেষক মিলিসা লাভিজেন তার প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান ভিত্তিক এই রিপোর্ট বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছেন, নিউইয়র্কের নতুন প্রজন্মের মেয়েরা নিজেদের শরীর আগের চেয়েও বিস্তৃতভাবে ঢেকে রাখতে বা পোশাকে আবৃত করতে পছন্দ করছে। লাভিজেন আরো বলেছেন, আমাদের বিশ্বাস নিউইয়র্কের নতুন প্রজন্মের মেয়েদের এই পরিবর্তিত আচরণের মূল কারণ হল, লাগামহীন জীবন-যাত্রার প্রতি স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি। উল্লেখ্য, "সব কিছুই অস্থায়ী"-এই শ্লোগানের ভিত্তিতে শুরু হয়েছিল লাগামহীন জীবন-যাত্রা। বর্তমানে এরই প্রতিক্রিয়া হিসেবে তরুণী ও যুবতীরা নিজেদের দেহ অতীত প্রজন্মের চেয়ে অনেক বেশী ঢেকে রাখছে বা পোশাকে আবৃত করছে। মিসেস লাভিজেনের মতে, পাশ্চাত্যে কয়েক দশক ধরে অশালীন বা অর্ধনগ্ন পোশাকের সংস্কৃতির আধিপত্যের পর এখন সেখানকার মানুষ আরো ভালো ও উন্নত পোশাক অনুসন্ধান করছেন। আই জি প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রজন্মের মেয়েরা অন্য যে কারনে তাদের আগের প্রজন্মগুলোর পছন্দের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন তা হল, বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানোর আকাঙ্ক্ষা এবং আরো বেশী নিরাপত্তার প্রত্যাশা। এই গবেষকরা বলছেন, ধর্মের প্রতি আগ্রহ, গীর্যায় যাওয়া, লাগামহীন জীবন-যাত্রার গণ-সংস্কৃতির মোকাবেলা- এসব থেকে বোঝা যায় যুব-প্রজন্ম বর্তমান পরিস্থিতি বা পরিবেশের ওপর আরো ভালো নিয়ন্ত্রণ রাখতে চান। পাশ্চাত্যের অনেক যুবতী বা তরুণীর মধ্যে এই শুভ বুদ্ধির উদয় হয়েছে যে, শালীন পোশাক ব্যক্তি ও সমাজের পবিত্রতা এবং সুস্থতার জন্য অপরিহার্য্য। যে পরিবেশে নারী ও কণ্যারা শালীনতার সীমা লংঘনে অভ্যস্ত নয়, সেখানে সহজেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক তৎপরতা চালানো যায় বলে তারা বুঝতে পেরেছে। প্যানসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কল্ওয়ি হার্লি ২০০৬ সালের শরৎকালে আনুষ্ঠানিক পোশাকের পরিবর্তে যেমন-খুশি-তেমন পোশাক পরে ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিত হবার প্রতিবাদ জানান। তিনি কর্মস্থলে ও ক্লাসে আনুষ্ঠানিক শালীন পোশাক পরার প্রথা পুনরায় চালু করার আহ্বান জানিয়ে এক খোলা চিঠিতে বলেন, "শিক্ষার্থীদের পোশাক কি এমন হওয়া উচিত নয় যে তা থেকে পড়াশুনার প্রতি তাদের আন্তরিকতা বা আগ্রহ ফুটে উঠবে? আমার মতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক পোশাক শিক্ষক, সহপাঠি এবং সর্বোপরি নিজের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নিদর্শন। শিক্ষার্থী যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক ও শালীন পোশাক পরে ক্লাসে উপস্থিত হয়, তখন তা এ অর্থ বহন করে যে সে এই শিক্ষা-বৈঠকের অন্য সদস্যদের সম্মান জানাচ্ছে এবং এ ধরনের বৈঠকে সে সবচেয়ে ভালো পন্থায় উপস্থিত থাকার অঙ্গীকার করছে।" পাশ্চাত্যের কোনো কোনো তরুণী ও যুবতী অশালীন পোশাকের ব্যাপারে পোশাক-ব্যবসায়ী বা পোশাক মার্কেটের কর্মকর্তা, গণমাধ্যম ও পত্র-পত্রিকায় প্রতিবাদ-লিপি পাঠাচ্ছেন। এই তরুণী ও যুবতীরা শরীর-প্রদর্শনীমূলক বা অশালীন পোশাক পরতে রাজী নন। এল্লা গান্ডারসন ওয়াশিংটনের সিয়াটল শহরের বাসিন্দা। ১৭ বছর বয়স্ক এই তরুণী সম্পতি আরো সংযত বা শালীন পোশাক সরবরাহ করতে নর্ডস্টর্ম নামের একটি পোশাক বিক্রয় কেন্দ্রে চিঠি লিখেছেন। তার ঐ চিঠি মার্কিন গণমাধ্যমগুলোতে গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়েছে এবং এর ফলে পোশাকের মডেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আবারও বিতর্ক জোরদার হয়ে উঠেছে। ঐ চিঠির একাংশে এল্লা গান্ডারসন বলেছেন, "নর্ডস্টর্মের সম্মানিত পরিচালক, আমি আপনার বিক্রয়-কেন্দ্রে এসেছিলাম পোশাক কিনতে। কিন্তু এখানে সব পোশাকই ছিল সংকীর্ণ ও শরীরকে দৃষ্টিকটুভাবে ফুটিয়ে তোলার পোশাক। আপনার বিক্রেতারা জানালেন, আমাদের কাছে কেবল এই এক ডিজাইনের পোশাক রয়েছে। যদি এ কথা সত্য হয়, তাহলে তো আমি বা অন্য যে কোনো মেয়েকে অর্ধনগ্ন পোশাক পরেই সড়গুলোতে চলা-ফেরা করতে হবে। আমার মতে, এ ধরনের প্রবণতা বা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। " কয়েকমাস পর নর্ডস্টর্মের একজন প্রতিনিধি এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে বলে এল্লাকে নিশ্চয়তা দেন। অশালীন পোশাকের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের নতুন প্রজন্মের প্রতিবাদের মুখে কোনো কোনো পশ্চিমা বিক্রেতা কাঙ্ক্ষিত শালীন পোশাকের প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন। এ ধরনের শালীন পোশাক প্রদর্শনীর ধারণা চালু হয় ১৯৯৯ সালে। সে সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একদল মা তাদের মেয়েদের দিয়ে এ ধরনের প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। এই মেয়েরা ছিল একটি ধর্মীয় গ্রুপের সদস্য। ২০০৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেয়েদের অংশগ্রহণে দেশটির ১৭ টি শহরে এ ধরনের শালীন পোশাকের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। সিয়াটলের ১৮ বছর বয়স্ক যুবতী রবিন মনে করেন, অশালীন পোশাক অন্যদেরকে এই পোশাকধারী সম্পর্কে বাস্তব ও মানবীয় মূল্যবোধের পরিবর্তে তার বাহ্যিক দিকের আলোকে বিচারের আহ্বান জানায়; আর এ বিষয়টি সমাজে নারীর মূল্যকে কমিয়ে দেয়। এভাবে দেখা যাচ্ছ পাশ্চাত্যের নারী সমাজের নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীর শালীন পোশাক সম্পর্কে পশ্চিমা সমাজে একটা শক্ত অবস্থানের ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। তাই দেখা যাচ্ছে ম্যাগীর মত ৩৩ বছর বয়স্ক মার্কিন মহিলা সতীত্বের বা চারিত্রিক পবিত্রতার শিল্প শীর্ষক বই লিখে নারীর সম্মান বৃদ্ধির জন্য তাদেরকে শালীন ও সম্মানজনক পোশাক পরার এবং পরপুরুষদের আকৃষ্ট করার জন্য সাজ-সজ্জা না করতে নারীদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন, যাতে পুরুষরা মানুষ হিসেবে নারীকে সম্মান জানায়। পাশ্চাত্যের অনেক যুবক-যুবতী এখন যৌন অনাচার ও ব্যাভিচারের বিস্তারের অন্যতম প্রভাবক বা চালিকা-শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত অশ্লীল ছায়াছবি, কুরুচিপূর্ণ সঙ্গীত, নাটক ও ম্যাগাজিনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। ২০০৫ সালের জুলাই মাসে লন্ডনে কয়েকজন তরুণী অশ্লীল ছবি প্রকাশের জন্য কয়েকটি ম্যাগাজিনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে ধর্মঘট পালন করে। পাশ্চাত্যের অনেক যুবক-যুবতী এখন নৈতিক সংযমের প্রশিক্ষণ-ক্লাসে অংশ নিচ্ছেন। এটা খুবই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি যে, যেসব সমাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ ও বাবা-মায়েরা নিজ সন্তানদেরকে চারিত্রিক পবিত্রতার পথ থেকে দূরে থাকতে উৎসাহ দিয়েছেন সেসব সমাজেরই যুব প্রজন্মের একাংশ উন্নত আদর্শের পথ খুঁজে নেয়ার চেষ্টা করছেন। সাহসী এই যুব প্রজন্ম অন্যদের গভীরভাবে প্রভাবিত করছেন। নৈতিক সংযমের প্রশিক্ষণ-ক্লাসে অংশগ্রহণকারী রশীদা জলি'র মত ২৯ বছর বয়স্ক মার্কিন যুবতীর ভাষায় এই নতুন ধারা থেকে বোঝা যায়, সাহসী যুব-প্রজন্ম ইচ্ছে করলে প্রচলিত বা প্রতিষ্ঠিত নেতিবাচক ধারার বিপরীত স্রোতে এগিয়ে যেতে পারে এবং এভাবে তারা এক ইতিবাচক উত্তরাধিকার রেখে যেতে পারে। এটা স্পষ্ট পাশ্চাত্যের অনেক মানুষ ও বিশেষ করে যুব প্রজন্মের একাংশ পুনরায় চারিত্রিক পবিত্রতার দিকে ঝুঁকছে, যদিও এ ধারার প্রতি সমর্থন এখনও ব্যাপক বা নিরংকুশ নয়, কিন্তু পশ্চিমা সমাজের নৈতিক সংকটসহ নানা সামাজিক সংকটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে সফল হয়েছেন। *

Wednesday, July 15, 2009

মারওয়া শেরবিনি হত্যাকান্ড : পাশ্চাত্যে ইসলাম আতঙ্কের ফসল

পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলমানদের প্রতি অন্যায়-অবিচার ও বৈষম্য নতুন কোন বিষয় নয়। যুগ যুগ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোতে বসবাসরত মুসলমানদের মৌলিক অধিকার পদদলিত হয়ে আসছে। তবে সম্প্রতি জার্মানীর একটি আদালতে বিচারের শুনানী চলার সময়ে যে লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে, তাকে পাশ্চাত্যে ইসলাম আতঙ্কের অন্যতম ফসল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ঐ আদালতে এক বর্ণবিদ্বেষী তরুণ হিজাব পরিহিতা মিশরীয় গর্ভবতী নারী মারওয়া শেরবিনিকে উপর্যপুরি ছুরিকাঘাতে হত্যা করে এবং তার স্বামী তাকে বাঁচাতে আসলে পুলিশ তার ওপর গুলি চালায়। মিশরীয় নাগরিক মারওয়া শেরবিনি ২০০৫ সালে উচ্চশিক্ষার্থে স্বামীসহ জার্মানীতে পা রাখেন। সেখানে গিয়েই তিনি মুসলমানদের প্রতি জার্মান সমাজের বর্ণবৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হন। ফার্মেসিতে উচ্চতর ডিগ্রিধারী শেরবিনি নিজ জীবদ্দশায় জার্মান সমাজে ইসলাম বিদ্বেষ ও বর্ণবাদ কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। সম্প্রতি জার্মানীর একটি পার্কে ঘুরতে গেলে তিনি বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার হন। একজন বর্ণবিদ্বেষী জার্মান তরুণ শেরবিনি'র হিজাবকে সন্ত্রাসের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করে এবং তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। শেরবিনি ঐ যুবকের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ করেন এবং সেখানে ঐ যুবকের অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। আপীল আদালতে মারওয়া শেরবিনি যখন বিচারকের সামনে তাকে অপমান করার ঘটনা বর্ণনা করছিলেন, তখন অভিযুক্ত যুবক তার ওপর হামলা চালায়। 'তোর বেঁচে থাকার অধিকার নেই'- একথা বলে গর্ভবতী শেরবিনির ওপর সে উপর্যপুরি ১৮ বার ছুরিকাঘাত করে তাকে হত্যা করে। এ সময় শেরবিনির স্বামী তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতে চাইলে জার্মান পুলিশ তার ওপর গুলি চালায়। এসময় শেরবিনির ৩ বছরের শিশু আদালতে উপস্থিত ছিলো এবং ঐ অবুঝ শিশুর চোখের সামনে তার মা শহীদ এবং বাবা মারাত্মকভাবে আহত হয়। সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, যে জার্মান পত্রপত্রিকা অতি তুচ্ছ কোন ঘটনাকেও বড় করে তুলে ধরে, সেই গণমাধ্যম শেরবিনির হত্যাকান্ডের ব্যাপারে কয়েকদিন ধরে রহস্যজনক নিরবতা পালন করে। নিরপেক্ষ ও স্বাধীন বলে দাবিকৃত এসব গণমাধ্যম কেবল তখনই শেরবিনির লোমহর্ষক হত্যাকান্ডের খবর প্রচার করে যখন অন্যান্য সূত্রের মাধ্যমে ঘটনাটি প্রকাশ হয়ে পড়ে। হিজাব পরিহিতা মুসলিম নারী শেরবিনির হত্যাকান্ডের খবর জার্মানীর গণমাধ্যমে প্রকাশ না হওয়ার ঘটনা মুসলমানদের প্রতি জার্মানীসহ পশ্চিমা সমাজের বর্ণবাদী আচরণের বিষয়টি আরো একবার বিশ্ববাসীর সামনে ফুটিয়ে তুলেছে। এমনকি যখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে হিজাব পরিহিতা মুসলিম নারীর হত্যাকান্ডের খবরটি প্রচারিত হয়েছে, তখনও জার্মান গণমাধ্যম এটিকে গুরুত্বহীন এবং একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। জার্মানীর এটর্নি জেনারেল মারওয়া শেরবিনির হত্যাকান্ড সংক্রান্ত যে কোন তথ্য প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, শেরবিনির জায়গায় যদি একজন অমুসলিম নিহত হতো, তবে পশ্চিমা গণমাধ্যম সে খবরকে ব্যাপক গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করতো এবং দীর্ঘদিন ধরে মাঠ গরম করে রাখতো। আলজেরিয়ার আশশুরুক পত্রিকার সম্পাদক যেমনটি বলেছেন,"মুসলিম নারীর পরিবর্তে জার্মানীতে যদি কোন ইহুদী এরকম নির্মম হত্যাকান্ডের স্বীকার হতো, তবে জার্মান পত্রিপত্রিকাগুলো এ ব্যাপারে হৈ চৈ ফেলে দিতো।" জার্মানীর আদালতের বিচারক ও পুলিশের চোখের সামনে নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার মুসলিম নারী মারওয়া শেরবিনির ভাই তারেক শেরবিনি এ সম্পর্কে আল আলম নিউজ চ্যানেলকে বলেছেন, "যদি ঐ হত্যাকান্ড কোন ইউরোপীয় বা পশ্চিমা নাগরিকের ওপর পরিচালিত হতো, তবে তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী এলাহী কান্ড ঘটে যেতো। কিন্তু আমার বোনের হত্যাকান্ডের ব্যাপারে তারা আশ্চর্যজনক নীরবতা পালন করেছে। এটি সকল আরব ও মুসলমানকে অবমাননার শামিল।" প্রকৃতপক্ষে ইসলাম ও মুসলমানদের ব্যাপারে পশ্চিমা দেশগুলোর সরকার যে নীতি গ্রহণ করেছে, দেশগুলোর গণমাধ্যম হুবহু সে নীতি অনুসরণ করছে। এসব সরকার মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করেছে এবং বহু পশ্চিমা রাষ্ট্রনায়ক তাদের কথাবার্তায় ইসলাম বিদ্বেষের বিষয়টি চেপে রাখতে পারেন নি। পাশ্চাত্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুসলিম ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতীক, বিশেষ করে হিজাবের বিরুদ্ধে এক ধরনের চরম বর্ণবাদী আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, এমনকি হিজাব পরার কারণে মিশরীয় মুসলিম নারী মারওয়া শেরবিনিকে হত্যা করেছে। বর্তমানে জার্মানীর বেশ কয়েকটি প্রদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারী অফিস আদালতে হিজাব পরিহিতা মুসলিম নারীর প্রবেশ নিষিদ্ধ রয়েছে। ফ্রান্সেও মুসলমানদের তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও স্কুল-কলেজ ইউনিভার্সিটিতে মুসলিম ছাত্রীদের হিজাব পরিধানের ওপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করে রাখা হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে ইসলাম বিদ্বেষ এমনভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, সেখানে বসবাসরত মুসলমানদের সারাক্ষণ আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিক অধিকার বিষয়ক সংস্থা এফ.আর.এ সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বলেছে, ইউরোপীয় দেশগুলোতে গত এক বছরে বণবদী আচরণের পরিমাণ শতকরা ৮০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব দেশের শীর্ষে রয়েছে বৃটেন। ২০০৭ সালে বৃটেনে ৬১টি বর্ণবাদী হামলা হয়েছিলো। এ দৃষ্টিকোন থেকে জার্মানীর আদালতে একজন মুসলিম নারীর হত্যাকান্ড অপ্রত্যাশিত কোন ঘটনা নয়। কারণ, জার্মানীসহ পশ্চিমা দেশগুলোর গণমাধ্যম সেসব দেশে মুসলিম বিদ্বেষী পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে। জার্মানীর একটি প্রাদেশিক পার্লামেন্টের সাবেক সদস্য জামাল কারযুলি এ সম্পর্কে বলেছেন, "জার্মানীর রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যমগুলো বহু বছর আগে থেকে দেশটিতে একটি ইসলাম বিদ্বেষী পরিবেশ তৈরির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জার্মানীর আদালতে প্রকাশ্য দিবালোকে একজন হিজাব পরিহিতা মুসলিম মহিলার হত্যাকান্ডের ঘটনায় দেশটির সরকার নিজেকে নির্দোশ ভাবতে পারে না। বিশেষ করে মারওয়া শেরবিনির হত্যাকান্ডের ব্যাপারে বহু প্রশ্ন এখন সামনে আসছে। প্রকাশ্য আদালতে এ ধরনের ঘটনা ব্যাপক সংশয়েরও জন্ম দিয়েছে। কারণ, জার্মানীর আইন অনুযায়ী আদালতে জননিরাপত্তাকে হুমকিগ্রস্ত করা যায় এমন কোন ধরনের অস্ত্র বা গোলাবারুদ নিয়ে প্রবেশ করা যায় না। আদালতে প্রবেশের সময় প্রতিটি ব্যক্তির দেহ তল্লাশি করে তার নিরস্ত্র হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হয় কর্তৃপক্ষ। এ অবস্থায় শেরবিনির ঘাতক কীভাবে ছোরা নিয়ে আদালতে প্রবেশ করলো- এটি হচ্ছে প্রথম প্রশ্ন। দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, পুলিশের চোখের সামনে এতবড় একটি হত্যাকান্ড ঘটার সময় পুলিশ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলো কেনো? পুলিশ শেরবিনিকে রক্ষা করতে এগিয়ে না এসে বরং তার স্বামীর গায়ে গুলি করে। তারা ঐ ঘাতক যুবককে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে পারতো। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, বর্ণবিদ্বেষী জার্মান সমাজে আর কোন মুসলিম নারী যাতে হিজাব পরার সাহস না দেখায় সেজন্য পূর্ব পরিকল্পিতভাবে শেরবিনি'র হত্যাকান্ডের নাটক আদালতে মঞ্চস্থ করা হয়েছে। বর্ণবাদী হামলার শিকার মারওয়া শেরবিনি আসলে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে হিজাব পরতেন। এ কারণে মিশরের ঐ নারীকে 'শহীদে হিজাব' বা হিজাবের শহীদ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হিজাব হচ্ছে এমন এক ঢাল যা নারীকে লম্পট পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি থেকে রক্ষা করে। হিজাব পরিধান করে একজন নারী নিরাপত্তা সহকারে সমাজের গঠনমূলক কাজে অংশ নিতে পারে। মারওয়া শেরবিনি ইসলামের এই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ পালন করতে গিয়ে শহীদ হওয়ার কারণে বিশ্বের মুসলমানরা তার প্রতি সহমর্মীতা প্রকাশ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি ধিক্কার জানিয়েছে। মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় শেরবিনির জন্মস্থানে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে অত্যন্ত আড়ম্বরের সাথে তার জানাযা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে। ইরানেও তার প্রতীকি দাফন সম্পন্ন হওয়ার পাশাপাশি জার্মানী এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান সভাপতি ইতালির রাষ্ট্রদূতকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে শেরবিনির নিজ দেশ মিশর সরকারের অদ্ভুত নীরবতা দেশটির জনগণকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। মিশরের অনেক আলেম ও রাজনৈতিক নেতা দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমাদ আবুল গেইতের পদত্যাগ দাবি করেছেন। সার্বিকভাবে বলা যায়, পশ্চিমা দেশগুলোতে ইসলাম বিদ্বেষী যে পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, তার ফলে মুসলমানরা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পশ্চিমা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও গণমাধ্যম এসব দেশে ইসলাম গ্রহণের ক্রমবর্ধমান হার রোধ করার লক্ষ্যে ইসলাম বিদ্বেষী প্রচারণা চালাচ্ছে। ইসলাম মানুষের প্রকৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান হওয়ার কারণে বহু মানুষ এ ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। হিজাব বা ইসলামী শালীন পোশাক হচ্ছে এ ধর্মের অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয়। কিন্তু সুস্থ সমাজের জন্য অপরিহার্য এই হিজাবকে পশ্চিমা দেশগুলো মেনে নিতে রাজী নয়। পশ্চিমা দেশগুলো মানবাধিকার রক্ষার দাবি করলেও বাক স্বাধীনতার অপব্যবহার করে নানাভাবে ইসলামের অবমাননা করছে। এসব দেশ তাদের মতাদর্শ বিরোধী কোন দেশের সামান্য ঘটনা নিয়ে বিশ্বব্যাপী হৈ চৈ ফেলে দিতে সিদ্ধহস্ত হলেও প্রকাশ্য আদালতে একজন মুসলিম নারীর হত্যাকান্ডে কোনরকম বিচলিত হয় নি। মানবাধিকারের পৃষ্ঠপোষক এসব দেশের দৃষ্টিতে সন্ত্রাসী হামলায় একজন গর্ভবতী নারীর করুণ মৃত্যুতে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় নি।#