Sunday, July 24, 2011
চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোযা
আত্মসংযম আর আত্মশুদ্ধির কষ্টিপাথরে নিজেকে যাচাই করার ও বিশুদ্ধ করার সুবর্ণ সব সুযোগে ভরা মাস রমজান ৷ বেহেশতি সৌরভ ও খোদা প্রেমের ফুলেল জলসার এই মাস মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্যে সবচেয়ে বড় রহমতের উৎসব ৷ মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী (রহঃ) যেমনটি বলেছেন,
সত্যের সুগন্ধি শীতল সমীর
এ সময় নিয়ে আসে ঐশী পাঠ
অপূর্ব এ উপহার থেকে সন্তর্পনে
যতো পারো করে যাও লুটপাট।
রহমতের সমীরণ এসে আবার চলে যায়
যাকে ইচ্ছে তাকে সে প্রাণবায়ু দিয়ে যায়
আবার এসেছে আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ
প্রস্তুতি নাও হে গোলাম,করো অবগাহন।
হিজরী পঞ্জিকার বারোটি মাসের মধ্যে নবম মাসের নাম রমযান। নবীজি বলেছেন,রজব মাস হচ্ছে আল্লাহর মাস, শাবান মাস হচ্ছে আমার মাস আর রমজান মাস হচ্ছে আমার উম্মতের মাস। এ মাসটিকে উম্মতের মাস হিসেবে ঘোষণা করলেও আল্লাহর কাছে এ মাসটির মর্যাদা অসামান্য । মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আস সাওমু লি, অ-আনা আজযি বিহী' অর্থাৎ ‘রোযা আমারই জন্য এবং আমি নিজেই তার প্রতিদান দেবো।' পরকালে তিনি কী পুরস্কার দেবেন তার কিছুটা ইঙ্গিত নবী করিম (সাঃ) আমাদের দিয়েছেন। রাসূলে খোদা বলেছেন, "রমযান এমন একটি মাস যে মাসে আল্লাহ তোমাদের জন্যে রোযা রাখাকে ফরজ করে দিয়েছে। অতএব যে ব্যক্তি ঈমান সহকারে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় রোযা রাখবে, তার জন্যে রোযার সেই দিনটি হবে এমন যেন সবেমাত্র সে মায়ের গর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছে, অর্থাৎ রোযাদার তার সকল গুণাহ থেকে মুক্তি পেয়ে নিষ্পাপ শিশুটির মতো হয়ে যাবে।"
রাসূল (সাঃ) আরও বলেছেন, "তুমি যদি চাও তোমার বুকের ভেতরের অশান্তি কমে যাক তাহলে রমযানের রোযা এবং প্রতিমাসে তিনটি করে রোযা রাখো।" অন্য এক হাদিসে আছে, রাসুলেখোদা বলেছেন, "রোযা রেখে অটুট স্বাস্থ্যের অধিকারী হও।" এর মানে হচ্ছে, রোযা রাখলে স্বাস্থ্য ভাল থাকে। কোন রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় না। ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রাঃ)ও বলেছেন, "প্রতিমাসে তিনটি রোযা এবং রমযান মাসের রোযা বুকের ভেতরকার জটিলতা এবং পেরেশানীগুলো দূর করে দেয়।"
রোযা থাকা অবস্থায় কমপক্ষে ১৫ ঘন্টা যাবতীয় খানাপিনা বন্ধ থাকে। এ সময় পাকস্থলী, অন্ত্রনালী, যকৃত, হৃদপিন্ডসহ অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিশ্রাম পায়। তখন এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিজেদের পুনর্গঠনে নিয়োজিত হতে পারে। অন্যদিকে দেহে যেসব চর্বি জমে শরীরের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় সেগুলো রোযার সময় দেহের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানোর জন্য ছুটে যায়। স্বাস্থ্যবিজ্ঞানী তার "সুপিরিয়র নিউট্রিশন" গ্রন্থে ডা. শেলটন বলেছেন, উপবাসকালে শরীরের মধ্যকার প্রোটিন, চর্বি, শর্করা জাতীয় পদার্থগুলো স্বয়ং পাচিত হয়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ কোষগুলোর পুষ্টি বিধান হয়।
সত্যি বলতে কী, দেহ এবং আত্মার ওপরে প্রভাব সৃষ্টিকারী এই রোযার উপকারীতা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বহু আগেই প্রমাণ করেছে। আল্লাহ যেহেতু আমাদের জন্যে এই বিধানটি দিয়েছেন, ফলে এতে যে অবশ্যই কল্যাণ নিহিত থাকবে-তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশই নেই। রোযা বা উপবাসের মধ্যে শারীরিক কী কী কল্যাণ রয়েছে সে সম্পর্কে আরও কয়েকজন চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতামত জানা যাক :
নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ঔষুধ ও শল্য চিকিৎসার প্রখ্যাত ডাঃ অ্যালেকসিস বলেছেন, উপবাসের মাধ্যমে লিভার রক্ত সঞ্চালন দ্রুত হয় ফলে ত্বকের নিচে সঞ্চিত চর্বি, পেশীর প্রোটিন, গ্রন্থিসমূহ এবং লিভারে কোষসমূহ আন্দোলিত হয়। আভ্যন্তরীণ দেহ যন্ত্রগুলোর সংরক্ষণ এবং হ্নদপিণ্ডের নিরাপত্তার জন্য অন্য দেহাংশগুলোর বিক্রিয়া বন্ধ রাখে। খাদ্যাভাব কিংবা আরাম-আয়েশের জন্য মানুষের শরীরের যে ক্ষতি হয়, রোজা তা পূরণ করে দেয়।" ডাঃ আইজাক জেনিংস বলেছেন, " যারা আলস্য ও গোড়ামীর কারণে এবং অতিভোজনের কারণে নিজেদের সংরক্ষিত জীবনী শক্তিকে ভারাক্রান্ত করে ধীরে ধীরে আত্মহত্যার দিকে এগিয়ে যায়, রোযা তাদেরকে এ বিপদ থেকে রক্ষা করে।" বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী নাষ্টবারনার বলেন, "ফুসফুসের কাশি, কঠিন কাশি, সর্দি এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা কয়েকদিনের রোযার কারণেই নিরাময় হয়।" ডাক্তার দেওয়ান এ,কে,এম, আব্দুর রহীম বলেছেন, "রোযাব্রত পালনের কারণে মস্তিস্ক এবং স্নায়ুতন্ত্র সর্বাধিক উজ্জীবিত হয়। স্বাস্থ্যবিজ্ঞানী ডা. আব্রাহাম জে হেনরি রোযা সম্পর্কে বলেছেন, "রোযা হলো পরমহিতৈষী ওষুধ বিশেষ। কারণ রোযা পালনের ফলে বাতরোগ, বহুমূত্র, অজীর্ণ, হৃদরোগ ও রক্তচাপজনিত ব্যাধিতে মানুষ কম আক্রান্ত হয়।" পাকিস্তানের প্রখ্যাত প্রবীণ চিকিৎসক ডা. মুহাম্মদ হোসেনও একই ধরনের কথা বলেছেন। তারমতে, "যারা নিয়মিত রোজা পালনে অভ্যস্ত সাধারণত তারা বাতরোগ, বহুমূত্র, অজীর্ণ, হৃদরোগ ও রক্তচাপজনিত ব্যাধিতে আক্রান্ত কম হন।" চিকিৎসা বিজ্ঞানী ডা. ক্লাইভ বলেন, "রোযার বিধান স্বাস্থ্যসম্মত ও বিজ্ঞানসম্মত । সেহেতু ভারত, জাপান, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ নাইজেরিয়াতে অন্যসব এলাকার তূলনায় মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় রোগ ব্যাধি অনেক কম দেখা যায়।"
এভাবে বিশ্বের অনেক চিকিৎসা বিজ্ঞানী রোযার উপকারিতা বর্ণনা করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, রোযাদার ব্যক্তি ধুমপান না করার কারণে ফুসফুস রোগমুক্ত থাকে। পেপটিক আলসারের রোগীরা রোযা রাখলে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও হাঁপানি রোগীদের জন্যও রোযা উপকারী। ডাক্তারদের মতে, রোযার ফলে মস্তিষ্কের সেরিবেলাম ও লিমরিক সিস্টেমের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ার কারণে মনের অশান্তি ও দুশ্চিন্তা দূর হয়-যা উচ্চ রক্তচাপের জন্য মঙ্গলজনক। বহুমূত্র রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে রোযা খুব উপকারী। ডাক্তারী পরীক্ষায় দেখা গেছে, একাধারে ১৫ দিন রোযা রাখলে বহুমূত্র রোগের অত্যন্ত উপকার হয়। রোযা চর্মরোগের জন্যও খুবই উপকারি। পুষ্টির সঙ্গে চর্মরোগের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। তাই চর্ম রোগের কিংবা ত্বকের উপর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় রোযা খুবই কার্যকর পদ্ধতি। কিডনী সমস্যায় আক্রান্ত রোগীরা রোযা রাখলে এ সমস্যা আরো বেড়ে যাবে ভেবে রোযা রাখতে চান না। অথচ আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, রোযা রাখলে কিডনীতে সঞ্চিত পাথর কণা ও চুন দূরীভূত হয়। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীদের মতে, সারা বছর অতিভোজ, অখাদ্য, কুখাদ্য, ভেজাল খাদ্য খাওয়ার ফলে আমাদের শরীরে যে জৈব বিষ জমা হয় তা দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এক মাস রোজা পালনের ফলে তা সহজেই দূরীভূত হয়ে যায়।
কোরআন, হাদিস এবং আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে বলা যায়, রোযা হচ্ছে মুসলমানদের জন্য এক বিরাট রহমত এবং স্বাস্থ্যের জন্য অনন্য নেয়ামত স্বরূপ। রোযার গুরুত্ব সম্পর্কে হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী (রহঃ) বলেছেন, "রোযা শ্রেষ্ঠ পুণ্যের কাজ। কেননা রোযা সুপ্রবৃত্তিকে সবল এবং কুপ্রবৃত্তিকে দুর্বল করে দেয়। আত্মার পরিচ্ছন্নতা এবং প্রবৃত্তিকে দমন করে রাখার জন্য রোযার ন্যায় কার্যকর অস্ত্র আর কিছুই নেই।"
পরিশেষে কবি ফজলে খোদার ভাষায় বলতে চাই-
হে রমজান,হে রমজান!
দাও স্বস্তি দাও শান্তি
ধরণীকে করো মনোরম,
তোমারে হেরিয়া বিশ্ব-বিবেক
সংযম হোক দুর্দম ৷
Sunday, September 5, 2010
বাংলা কবিতা ও গানে ঈদ উৎসব
মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে ঈদ। প্রতি বছর ঈদকে সামনে রেখে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় দেখা যায় নানা আয়োজন। প্রবন্ধ, গান, ছড়া-কবিতা, গল্প, উপন্যাস, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান কোন কিছুই বাদ যায় না। ঈদকে কেন্দ্র করে কবি- সাহিত্যিক, লেখক, শিল্পী, অভিনেতাদের ব্যস্ত সময় কাটে। সত্যি বলতে কী, এমন কোন মুসলিম কবি-সাহিত্যিক কিংবা লেখককে হয়তো পাওয়া যাবে না যিনি ঈদ নিয়ে কোন লেখা লিখেননি। এক্ষেত্রে বাংলা ভাষাভাষী কবি-সাহিত্যিকরাও পিছিয়ে নেই।
যতটুকু জানা যায়, বিশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলা কবিতায় ঈদ নিয়ে লেখালেখি শুরু হয়। সৈয়দ এমদাদ আলীর ‘ঈদ’ কবিতাটিই সম্ভবত বাংলাভাষায় রচিত প্রথম ঈদ-বিষয়ক কবিতা। ১৯০৩ সালে তাঁরই সম্পাদনায় প্রকাশিত মাসিক নবনূর পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় কবিতাটি ছাপা হয়। তিনি লিখেছেন-
“ ধর্ম ও কর্মরে জীবনের মাঝে প্রতিষ্ঠিত করি আজ জীবনের আবহে হও অগ্রসর, নাহি তাতে কোন লাজ। যে চেতনা থাকে একদিন জাগি, দীর্ঘ নিদ্রা তার পরে, সে তো আনে শুধু ঘন অবসাদ জীবনে ঢালে অনন্ত বিষাদ দেও তারে দূর করে। ”মানবজাতির তথা মুসলমানদের মহামিলনের উৎসব ঈদকে নিয়ে কবি কায়কোবাদ ‘ঈদ আবাহন’ নামে একটি কবিতা লিখেছেন। কবিতাটি এ রকম-
“ এই ঈদ বিধাতার কি যে শুভ উদ্দেশ্য মহান, হয় সিদ্ধ, বুঝে না তা স্বার্থপর মানব সন্তান। এ ত নহে শুধু ভবে আনন্দ উৎসব ধুলা খেলা। এ শুধু জাতীয় পুণ্যমিলনের এক মহামেলা। ”কবি কায়কোবাদ ঈদকে পুণ্যমিলনের মহামেলা হিসেবে অভিহিত করলেও ইসলামের নির্দেশনা সঠিকভাবে অনুসরণ না করার কারণে ঈদের দিনেও গরিব-দুঃখী ও অসহায়দের কষ্টের যেন শেষ থাকে না। এ দিকটি ফুটে ওঠেছে শাহাদাত হোসেনের ‘বাংলার ঈদ’ কবিতায়। কবি লিখেছেন,
“ বাংলার মুসলমান শুধু চেয়ে রয়- মৌন ম্লান ক্লিষ্ট মুখ নির্বাক নিশ্চল। ফিত্রার খুশী কোথা তার? কি দান সে দিবে ক্ষুধিতেরে? নিজেই কাঙাল রিক্ত- ভিক্ষা মাগি ফিরে দ্বারে দ্বারে।”এ কবিতায় কবি ফিতরা আদায়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ঠিকমত ফিতরা ও যাকাত দেয়া গেলে অসহায়, দরিদ্ররাও ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারবে। সমাজে নেমে আসবে শান্তি-সুখের ফল্গুধারা। এ দিকটির প্রতি ইঙ্গিত করেই সম্ভবত কবি গোলাম মোস্তফা ঈদকে মানবতার বিরাট প্লাটফর্ম হিসেবে কল্পনা করেছেন। ঈদ উৎসব কবিতায় তিনি লিখেছেন-
“ কণ্ঠে মিলনের ধ্বনিছে প্রেম-বাণী, বক্ষে ভরা তার শান্তি, চক্ষে করুণার স্নিগ্ধ জ্যোতি ভার, বিশ্ব-বিমোহন কান্তি প্রীতি ও মিলনের মধুর দৃশ্যে এসেছে নামিয়া যে নিখিল বিশ্বে দরশে সবাকার মুছেছে হাহাকার বিয়োগ-বেদনার শ্রান্তি।”ঈদ নিয়ে সবচেয়ে বেশি কবিতা ও গান লিখেছেন, কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তার লেখা -
‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ। তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানি তাকিদ।’-এ গানটি ছাড়া ঈদের আনন্দ যেন পূর্ণতা পায় না। এছাড়া, ‘ঈদ মোবারক’ ও ‘কৃষকের ঈদ’ ও ‘ঈদের চাঁদ’ কবি নজরুলের বহুল আলোচিত কবিতা। ‘ঈদ মোবারক’ কবিতায় কবি লিখেছেন,
“শত যোজনের কত মরুভূমি পারায়ে গো, কত বালুচরে কত আঁখি-ধারা ঝরায়ে গো, বরষের পরে আনিলে ঈদ! ”এ কবিতায় নজরুল দেখেছেন অসংখ্য মরুভূমি,বালুচর আর অনাবিল আঁখিজল পেরিয়ে এসেছে ঈদ। তিনি বলতে চেয়েছেন,মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে সুখ-দুঃখের সমভাগী হয়ে অধিকার ভোগ আর দায়িত্ব পালনের মধ্যে যে প্রকৃত আনন্দ,সে শিক্ষা যেন রয়েছে ঈদের মাহাত্ম্যে। ঈদের মহান শিক্ষাই হচ্ছে সব ভেদাভেদ-হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে এক আল্লাহর বান্দা হিসেবে ঈদের জামায়াতে দাঁড়িয়ে ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপন করা । কিন্তু ধর্মীয় অনুশাসন না মানার কারণে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ঈদ সচরাচর দেখা যায় না। এ দিনও দেখা যায় গ্রামের দরিদ্র কৃষকরা শীর্ণ গরুর পাল নিয়ে মাঠে যায় জমিতে লাঙল দিতে। এদিকে ইঙ্গিত করে তিনি রচনা করেছেন তার কৃষকের ঈদ কবিতাটি। কবির ভাষায়-
“জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসেনা নিদ মুমূর্ষু সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ? একটি বিন্দু দুধ নাহি পেয়ে যে খোকা মরিল তার উঠেছে ঈদের চাঁদ হয়ে কি সে শিশু-পুঁজরের হাড়?”কবি নজরুলের কবিতা ও গানে ঈদের তাৎপর্য্য, এ দিনের করণীয় ও সমাজে এর প্রভাব সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। অন্যদিকে মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ পুরো দুনিয়াকে ঈদগাহ্র সাথে তুলনা করেছেন । ‘ঈদগাহ হবে দুনিয়াটাই’ কবিতায় তিনি লিখেছেন-
আজকে এল খুশীর দিন দেখ না চেয়ে খুশীর চিন দেখ না চেয়ে আজ রঙিন খুশীর ঝলক ঈদগাহে। ................................ জামাত ছেড়ে থাকবে যে ঘরের কোণে রইবে সে রইবে হয়ে একপেশে একলা থাকায় দুঃখ তাই। সবাই মিলে একদলে এক আশাতে যাই চলে এক আশাতে যাই বলে ঈদগাহ হবে দুনিয়াটাই।শাওয়ালের রূপোলী চাঁদ পশ্চিমাকাশে মুচকি হেঁসে জানিয়ে দেয় যে, ঈদ এসেছে। দীর্ঘ প্রতিক্ষিত এ দিন নিয়ে কবি বেগম সুফিয়া কামাল তাঁর ‘ঈদের চাঁদ’ কবিতায় লিখেছেন-
“চাঁদ উঠিয়াছে, ঈদের চাঁদ কি উঠেছে? শুধায় সবে। লাখো জনতার আঁখি থির আজি সুদূর সুনীল নভে। এই ওঠে,ওই উদিল গগনে সুন্দর শিশু চাঁদ— আমিন। আমিন। রাব্বুল আলামিন করে সবে মোনাজাত।”আগেই বলেছি, ঈদের নতুন চাঁদ সবার জন্য আনন্দ বয়ে আনে না। এদিন গরীব-দুঃখী ও অসহায়দের মনের আকুতি প্রকাশিত হয়েছে কবি তালিম হোসেনের ‘ঈদের ফরিয়াদ’ কবিতায়। কবির ভাষায়-
‘ঈদ মোবারক, সালাম বন্ধু, আজি এই খোশরোজে দাওয়াত কবুল কর মানুষের বেদনার মহাভোজে। কহিব কি আর, চির-মানুষের ওগো বেদনার সাথী, ঈদের এ দিন শেষ হয়ে আসে, সমুখে ঘনায় রাতি।’কবি সিকান্দার আবু জাফর প্রায় একই বিষয়ে একটি কবিতা লিখেছেন। ঈদ উপলক্ষে দোয়া চেয়ে পিতার কাছে লেখা ‘ঈদের চিঠি’-তে তিনি লিখেছেন-
“ঈদের সালাম নিও,দোয়া করো আগামী বছর কাটিয়ে উঠতে পারি যেন এই তিক্ত বছরের সমস্ত ব্যর্থতা। অন্ততঃ ঈদের দিন সাদাসিধে লুঙ্গি একখানি, একটি পাঞ্জাবী আর সাদা গোলটুপি তোমাকে পাঠাতে যেন পারি; আর দিতে পারি পাঁচটি নগদ টাকা।”অন্যদিকে সৈয়দ আলী আহসান ঈদের চাঁদের হাসিতে দেখতে পেয়েছেন নতুন দিনের বারতা। লিখেছেন-
“এসেছে নূতন দিন আলো শতদল পাপড়ি মেলেছে, কুয়াশা হয়েছে ক্ষীণ। জরির জোব্বা, শেরোয়ানী আর আমামার সজ্জায় আতরের পানি, মেশেকর রেণু খোশবু বিলায়ে যায়— বাতাসে বাতাসে কলরোল আজি, ভেঙেছে তন্দ্রা ঘোর সাহেবজাদীর নেকাব টুটেছে, রাত্রি হয়েছে ভোর।” (এসেছে নূতন দিন)সমাজে ঈদের খুশীর প্রভাব সম্পর্কে কবি আ.ন.ম বজলুর রশিদ তার 'ঈদ আসে' কবিতায় লিখেছেন-
ঈদ আসে হাসি-খুশী তোমাদের আমাদের সকলের ঘরে অনেক আনন্দ নিয়ে কিছুক্ষণ ভুলে যাই দুঃখ জ্বালা যত আজ শুধু মেলামেশা অন্তরঙ্গ হয়ে থাকা অবিরত আল্লাহর প্রশংসায় গান, তাঁর দয়া দাক্ষিণ্যের অমৃত ঝরে।কবি তফাজ্জল হোসেন খান ঈদ নিয়ে চমৎকার একটি গান লিখেছেন । প্রতি বছর ঈদ এলেই শিশুরা সমবেত কণ্ঠে গেয়ে ওঠে এ গানটি।
“আজ আনন্দ প্রতি প্রাণে প্রাণে দুলছে খুশীর নদী প্লাবনে ঘরে ঘরে জনে জনে আজি মুখর হব মোরা গানে গানে ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক আজ বল ঈদ মোবারক আজ।”অধিকাংশ কবি-সাহিত্যিক ঈদের দিনকে খুশীর দিন হিসেবে চিত্রিত করলেও কবি মতিউর রহমান মল্লিক তার গানে লিখেছেন,
“ঈদের খুশী অপূর্ণ রয়ে যাবে ততদিন খোদার হুকুমাত হবে না কায়েম কায়েম হবে না যতদিন।”কবির এ গানের কথাগুলো যৌক্তিক। কারণ দুনিয়ায় খোদার হুকুমাত কায়েমের মাধ্যমেই ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করা সম্ভব। আর এ বৈষম্য দূর হলেই ঈদ হবে সত্যিকার আনন্দের দিন; তা সবার হৃদয়ে বুলিয়ে দেবে প্রেম প্রীতি আর শান্তির পরশ। এছাড়া ঈদ থেকে শিক্ষা নিয়ে সারাবছর নিজের জীবনকে পরিচালিত করতে পারলেই ঈদ উৎসব সার্থক হবে। ঈদের দিন যেভাবে ধনী-গরিব ভেদাভেদ ভুলে যায়,সারাবছর ধরে সেই বিভেদের দেয়ালকে তুলে ফেলতে হবে। কবি গোলাম মোস্তফার কথায়-
“আজি সকল ধরা মাঝে বিরাট মানবতা মূর্তি লভিয়াছে হর্ষে, আজিকে প্রাণে প্রাণে যে ভাব জাগিয়েছে রাখিতে হবে সারা বর্ষে, এই ঈদ হোক আজি সফল ধন্য নিখিল-মানবের মিলন জন্য, শুভ যা জেগে থাক,অশুভ দূরে যাক খোদার শুভাশীষ স্পর্শে।”
Wednesday, March 10, 2010
দুবাইয়ে হামাস কমাণ্ডার হত্যা : ইহুদিবাদী ইসরাইলের আরেকটি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস
‘টার্গেট করো এবং মেরে ফেলো’ এটা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ক্যান্সার হিসেবে পরিচিত ইহুদীবাদী ইসরাইলের গোয়েন্দা নীতি। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার সম্ভবত এ কারণেই একবার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন,‘ইসরাইলের প্রধান ভ্রান্তি হলো তার কোন বিদেশ নীতি নেই, আছে কেবল প্রতিরক্ষা নীতি।’ ইসরাইলের প্রতিরক্ষা নীতি মানেই শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে দমন করা ৷ প্রকাশ্য হত্যা, গুপ্ত হত্যা, লাশ গুম করা, অপহরণসহ এমন কোন মানবতা বিরোধী কর্মকাণ্ড নেই যা প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য তারা প্রয়োগ করে না। এ সব কাজের জন্য তেলআবিব সরকার মোসাদ, সিনবেথ ও আমানের মত কুখ্যাত গোয়েন্দা বাহিনী গড়ে তুলেছে। মোসাদ-এর কাজ হলো বিদেশে গোয়েন্দা তৎপরতা চালানো। গোয়েন্দা তৎপরতার আড়ালে এ সংস্থাটি হামাস, হিজবুল্লাহর মত ইসরাইল বিরোধী সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দকে হত্যা ও অপহরণের মত জঘন্য কাজ করে থাকে।
ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কিছু দৃষ্টান্ত
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফিলিস্তিনী ভূখণ্ড জবরদখল করার পর থেকেই ইসরাইল নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে দেশে-বিদেশে গুপ্তহত্যার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। হাজার হাজার ফিলিস্তিনী নাগরিককে হত্যার পাশাপাশি তারা ফিলিস্তিনী নেতৃবৃন্দকেও হত্যা করতে থাকে। ১৯৯৫ সালে ইসলামিক জিহাদ আন্দোলনের নেতা ফাতহে সাকাকীকে হত্যা করে ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা শিনবেথ৷ ২০০১ সালের ৩০ আগস্ট ক্ষেপনাস্ত্র হামলা চালিয়ে পশ্চিমতীরে নিজ অফিসে হত্যা করা হয় পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন-এর নেতা আবু আলী মুস্তাফা জাবরীকে ৷ ২০০৪ সালের ২২ মার্চ হামাসের আধ্যাত্মিক নেতা শেখ আহমদ ইয়াসিনকে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের মাত্র ২৫ দিন পর অর্থাৎ ১৭ এপ্রিল ইসরাইলী রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হন হামাসের প্রভাবশালী নেতা আব্দুল আজিজ রানতিসি। ১৯৯৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর হামাস নেতা খালেদ মাশআলকে আম্মানে বিষ-প্রয়োগে হত্যার তথ্য জনসম্মুখে ফাঁস হয়ে পড়ায় তাকে হত্যা করা সম্ভব হয়নি। ফিলিস্তিনে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইসমাইল হানিয়াকেও ইসরাইল হত্যার হুমকি দিয়েছে।
হামাসের পাশাপাশি ইসরাইলী বাহিনী লেবাননের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহ নেতৃবৃন্দকেও হত্যার মিশন শুরু করে। ১৯৯২ সালে বিমান থেকে হামলা চালিয়ে হত্যা করে হিজবুল্লাহ নেতা শেখ আব্বাস আল-মুশাওয়ীকে ৷ হিজবুল্লাহর অন্য দুই নেতা শেখ আবদুল করিম ওবেইদ ও মুস্তাফা আল দিরানীকে যথাক্রমে ১৯৮৯ ও ১৯৯৪ সালে অপহরণ করা হয় ৷ ২০০৮ সালে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে ইহুদীবাদী গুপ্ত ঘাতকরা সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে লেবাননের হিযবুল্লাহর সামরিক শাখার প্রধান ইমাদ মুগনিয়াকে তার গাড়িতে বোমা পেতে রেখে হত্যা করে। এভাবে ইহুদীবাদী ইসরাইল সুপরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। আর এ সন্ত্রাসের সর্ব-সাম্প্রতিক সংযোজন হচ্ছে, দুবাইয়ে ফিলিস্তিনের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের শীর্ষস্থানীয় কমাণ্ডার মাহমুদ আল মাবহুর হত্যাকাণ্ড।
সেদিন যা ঘটেছিল
গত ২০শে জানুয়ারি দুবাইয়ের একটি বিলাশবহুল হোটেলে হামাসের শীর্ষ সামরিক কমাণ্ডার মাহমুদ আল মাবহুকে ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের ঘাতকরা হত্যা করে। টাইমস অব লন্ডন জানিয়েছে, ইসরাইলের ঘাতক দল হামাস নেতার দেহে ইনজেকশন দেয়ার কারণে তার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। শ্বাসরোধ করে এবং ইলেকট্রিক শক দিয়ে হত্যা করা হয় হামাসের এরপর ঘাতক দল হামাস নেতার ব্রিফকেসে যে সব কাগজপত্র ছিলো তার ছবি তুলে এবং হোটেল কক্ষের বাইরে 'বিরক্ত করো না' এই নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়ে চুপিসারে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ঘাতক দল তার মৃতদেহ আবিষ্কার হওয়ার আগেই দুবাই ত্যাগ করতে সক্ষম হয় বলে অন্য এক খবরে বলা হয়েছে। মাবহু ছিলেন হামাসের সামরিক শাখা ইযাদ্দিন কাসসাম ব্রিগেডের প্রতিষ্ঠাতা। ৫০ বছর বয়সী মাবহু ১৯৮৯ সাল থেকেই সিরিয়ায় বসবাস করছিলেন। কিন্তু দুবাইয়ে আসার একদিন পরেই তাকে হত্যা করা হয়।
ঘাতকদের পরিচয়
হামাস নেতাকে হত্যার পর দুবাই পুলিশ সন্দেহভাজন ১১ জনের ছবি ও ফুটেজ প্রকাশ করে জানায়, ঘাতক ইসরাইলী গুপ্তচরদের মধ্যে ছয়জন ব্রিটিশ, তিনজন আইরিশ ও একজন করে জার্মান এবং ফরাসি পাসপোর্ট ব্যবহার করেছে। দুবাই পুলিশ প্রাথমিক তদন্তের পর ১১ জন সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে বলেছে, তাদের সবাই ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশের পাসপোর্টে দুবাই এসেছিলো। দুবাই পুলিশ প্রধান দাহি খালফান তামিম বলেছেন, যে ১১ ব্যক্তিকে তারা হত্যাকাণ্ডের দায়ে সন্দেহ করছেন তাদের পাসপোর্টের নামের সাথে তারা বিমানের টিকেট কেনার সময় যে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেছেন, তার হুবহু মিল রয়েছে। এরপর গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দুবাই পুলিশ হামাস নেতা হত্যাকাণ্ডে জড়িত নতুন ১৫ জন সন্দেহভাজনের নামের তালিকা ছবিসহ প্রকাশ করে। ঐ ১৫ জনের মধ্যে ৫ জন ব্রিটেনের,৩ জন করে ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার পাসপোর্ট ব্যবহার করেছিল। এ নিয়ে ঘাতক দলের মোট ২৬ জনের পরিচয় প্রকাশ করা হয়।
ই.ইউ. ও চার ইউরোপীয় দেশের প্রতিক্রিয়া
হামাসের শীর্ষ নেতা মাহমুদ আল-মাবহু হত্যা ইস্যুতে ইউরোপের চার দেশ ব্রিটেন, ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড এবং জার্মানির সাথে ইসরাইলের কূটনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ঘাতকরা ইউরোপীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ২২ ফেব্রুয়ারি ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক শেষে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "আমরা ইউরোপীয় নাগরিকদের পরিচয়পত্র চুরি করে তাদের নামে পাসপোর্ট ব্যবহারের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।"
এদিকে অস্ট্রেলিয়ার জাল পাসপোর্ট ব্যবহারের ব্যাপারে ব্যাখ্যা চাওয়ার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত ইসরাইলী রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হয়। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ইসরাইলের রাষ্ট্রদূতকে তলব করার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী কেভিন রুড বলেছেন, তার সরকার এ ব্যাপারে নীরব থাকবে না। তিনি আরো বলেছেন, দুবাই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহারের লক্ষ্যে অস্ট্রেলিয়ার পাসপোর্ট জাল করা হয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ডও তাদের দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে ইসরাইলী রাষ্ট্রদূতকে তলব করে । ব্রিটেন ঐ হত্যাকাণ্ডের জন্য ইসরাইলকে অভিযুক্ত না করলেও ঘাতকদের মাধ্যমে ছয় বৃটিশ নাগরিকের জাল পাসপোর্ট ব্যবহারের অভিযোগ সম্পর্কে ইসরাইলী রাষ্ট্রদূতের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। আয়ারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল মার্টিন ইসরাইলি দূতকে তলব করে জাল আইরিশ পাসপোর্ট ব্যবহারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
হত্যার নির্দেশদাতা খোদ ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী
ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দুবাইয়ে হামাস নেতা মাহমুদ আল মাবহু'কে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে খবর পাওয়া গেছে। টাইমস অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারি মাসের গোড়ার দিকে নেতানিয়াহু তেলআবিবে ইসরাইলী গুপ্তচর সংস্থা মোসাদের সদর দপ্তরে যান। সেখানে তিনি মোসাদ প্রধান মির দেগানের সাথে বৈঠক করেন এবং সে সময় মোসাদের ঘাতক বাহিনীর কয়েক সদস্য উপস্থিত ছিলো। মোসাদ সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বৈঠকে নেতানিয়াহু হামাস নেতাকে হত্যার প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেন। মাহমুদ আল মাবহু দুবাই সফরে আসবেন বলে খবর পাওয়ার পর মোসাদের মূল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। এর আগেই ঘাতক বাহিনী তেলআবিবের একটি হোটেলে হত্যাকাণ্ডের রিহার্সেল দেয়। এরপর ২০শে জানুয়ারি হামাস নেতা দুবাইয়ের একটি বিলাসবহুল হোটেলে গুপ্তহত্যার শিকার হন। হামাস নেতা খুন নিয়ে যখন দুবাই, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের মধ্যে টান টান উত্তেজনা চলছিল তখনই ওই হত্যাকাণ্ড নিয়ে মুখ খুলেছেন ইসরাইলের বিরোধী দলীয় নেত্রী, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিপি লিভনি। লিভনি হামাস নেতা হত্যার ঘটনার প্রশংসা করে বলছেন, সন্ত্রাসবাদ দমনের জন্যই এই হত্যাকান্ডকে সমর্থন করা উচিত৷
এর আগে হামাসের শীর্ষ নেতা শেখ ইয়াসিন ও আবদুল আজিজ রানতিসিকে হত্যার পর ইসরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারন সাংবাদিকদের ডেকে বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে ঔদ্ধত্যের সঙ্গে বলেছিলেন, 'আমি রাষ্ট্রীয়ভাবে এসব হামলা পরিচালনা করেছি৷ এধরনের হামলা অব্যাহত থাকবে ৷ আমাদের অভিযান বন্ধ হবে না।'
হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে ব্রিটেন অবহিত ছিল
হামাস নেতা মাহমুদ আল মাবহুকে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে ব্রিটেন অবহিত ছিল বলে বৃটিশ দৈনিক ডেইলি মেইল খবর দিয়েছে। দৈনিকটির ১৯ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় লেখা হয়েছে, ইসরাইলী গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ বৃটিশ পাসপোর্ট ব্যবহার করে দুবাইতে হত্যাকাণ্ড ঘটাবে এই তথ্য বৃটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এম আই-সিক্সকে আগেই অবহিত করা হয়েছিল। মোসাদের একজন এজেন্টের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি এ খবর প্রকাশ করেছে। তবে বৃটেনের একটি নিরাপত্তা সূত্র বলেছে, মোসাদ বৃটিশ পাসপোর্ট ব্যবহার করে তাদের অভিযান চালানোর কথা জানালেও কাকে হত্যা করা হবে,তা উল্লেখ করেনি। এর দুদিন আগে অর্থাৎ ১৭ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ সরকারের কয়েকটি সূত্রে বরাত দিয়ে টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, ইসরাইলী গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ দুবাইয়ে হামাস নেতা মাবহুকে হত্যা করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মোসাদ এজেন্টরা যেহেতু ব্রিটিশ পাসপোর্টও ব্যবহার করেছেন, তাই লন্ডন কর্তৃপক্ষ ইসরাইলী রাষ্ট্রদূতকে তলব করে ব্যাখ্যা চেয়েছে। অথচ সবাই জানে যে, ইসরাইলের প্রতিষ্ঠা ও তাদের সন্ত্রাসী তৎপরতার পেছনে ব্রিটেনের অবদান সবচেয়ে বেশী।
গ্রেফতার হতে পারেন নেতানিয়াহু
হামাস নেতা হত্যায় ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও মোসাদ প্রধান জড়িত থাকার বিষয়ে দুবাই পুলিশ নিশ্চিত হবার পর পুলিশ প্রধান দাহি খালফান তামিম তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করে বলেছেন, দুবাই পুলিশ হামাস নেতা হত্যাকাণ্ডের দায়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও গুপ্তচর সংস্থা মোসাদের প্রধানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির যে আবেদন জানিয়েছে, তেলআবিব সে ব্যাপারে নীরবতা পালন করছে। খালফান বলেছেন, মাবহুকে হত্যার পর তার দুই ঘাতক যুক্তরাষ্ট্রে এবং বাকিরা ইসরাইলে আশ্রয় নিয়েছে। যেসব ঘাতক ইসরাইলে আশ্রয় নিয়েছে তারা অন্য দেশে যাওয়া মাত্রই তাদের গ্রেফতার করা হবে বলে তিনি জানান। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল দুই দফায় ২৭ ঘাতকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির লক্ষ্যে বিশ্বের ১৮৮টি দেশে নোটিশ পাঠিয়েছে।
ইসরাইল ও তার মিত্রদের করণীয়
দুবাইয়ে হামাস নেতা হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী ঘাতকরা ইউরোপের কয়েকটি দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করায় ফ্রান্স, ব্রিটেন, আয়ারল্যাণ্ড ও জার্মানী ক্ষোভ প্রকাশ করলেও ইউরোপ ও আমেরিকার প্রভাবশালী দেশগুলোর সমর্থন, সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই ইসরাইল অব্যাহতভাবে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের কারণেই গাজায় নৃশংস হত্যাযজ্ঞের পরও ইসরাইলের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ কিছুই করতে পারছে না। ইউরোপের দেশগুলো যদি সত্যিই ইসরাইলের ওপর নাখোশ হয়ে থাকে তাহলে তাদের উচিত তেলআবিবকে সবধরনের সমর্থন ও সহযোগিতা দেয়া বন্ধ করা। যুদ্ধাপরাধ ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের দায়ে ইসরাইলী কর্মকর্তাদের বিচারের সম্মুখীন করার উদ্যোগ নেয়া উচিত। আর ইসরাইলী নেতাদেরও মনে রাখা উচিত, ফিলিস্তিনী নেতাদের হত্যা করে ইসরাইল বিরোধী গণ-আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না।
Subscribe to:
Posts (Atom)