Monday, August 11, 2008

আরব বিশ্বের পানি সম্পদ জবর দখলের ইসরাইলী অপচেষ্টা

ইহুদীবাদী ইসরাইল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই ইহুদীবাদী নেতারা আরব দেশগুলোর পানি সম্পদ দখল ও তা প্রত্যাহার করে ইসরাইলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করে। এ কারণে আরব দেশগুলো বিশেষ করে ফিলিস্তিনী জনগণ ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ফিলিস্তিনের স্বশাসন কর্তৃপক্ষের পানি সম্পদ বিভাগের প্রধান ফজল কাউশ এ সম্পর্কে বলেছেন, ইসরাইলীরা জর্দান নদীর শতকরা ৪৫ ভাগ পানি চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। ফজল কাউশ আরো বলেছেন, জর্দান নদীর ৮৫ কোটি কিউসেক পানির মধ্যে ফিলিস্তিনীরা মাত্র ৮ কোটি ৫০ লাখ কিউসেক পানি ব্যবহার করতে পারছে। ইহুদীবাদী ইসরাইল ঐ নদীর বাকি পানি বাঁধ দিয়ে প্রত্যাহার করে নিয়ে যাচ্ছে। এর আগে গাজা উপত্যকার ওপর ইসরাইলী দখলদারিত্বের সময় তেলআবিব গাজা থেকেও বেশীর ভাগ পানি চুরি করে নিয়ে যেত। গাজার পানি সম্পদের পরিমাণ বছরে ২০ কোটি কিউসেক বলে ধরা হয়। তবে গাজা থেকে ইসরাইলী সেনা প্রত্যাহার করার পর ইহুদীবাদীরা ঐ উপত্যকার পানিসম্পদ আর চুরি করতে পারছে না। কিন্তু ইহুদীবাদী ইসরাইল কর্তৃক জর্দান নদীর পানি প্রত্যাহার অব্যাহত রয়েছে। সিরিয়া ও জর্দানের ভেতর দিয়ে বয়ে আসা নদী ইয়ারমুক থেকেও ইসরাইল বছরে ১০ কোটি কিউসেক পানি সরিয়ে নিচ্ছে। দক্ষিণ লেবানন যখন ইসরাইলের দখলে ছিল, তখন সেখানকার তিনটি নদীর পানি ইহুদীবাদীরা চুরি করতো এবং এর পরিমাণ ছিল ৭০ কোটি কিউসেক। কিন্তু হিযবুল্লাহর তীব্র প্রতিরোধ আন্দোলনের মুখে ২০০০ সালে ইহুদীবাদী সরকার দক্ষিণ লেবানন থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। কিন্তু তারপরও তারা লেবাননের পানি চুরি করা বন্ধ রাখে নি। তারা খাল খনন ও পাইপ লাইন স্থাপনের মাধ্যমে লেবাননের পানি ইসরাইলে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। গোলান মালভূমি দখল করে ইহুদীবাদীরা সিরিয়ার ৬০ কোটি কিউসেক পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। এদিকে ইসরাইলের বার্ষিক পানির চাহিদা ২০০০ সালে ছিল ২৩০ কোটি কিউসেক, যা ২০২০ সালে ৩১০ কোটি কিউসেকে গিয়ে দাঁড়াবে। কাজেই ইসরাইলের পানি চাহিদার এ হিসাব থেকে বোঝা যায়, অবৈধ ঐ রাষ্ট্রটি তার ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদা মেটানোর জন্য আগামী দিনগুলোতে আরব দেশগুলোর আরো বেশী পানির উৎস দখলের চেষ্টা করবে। তার তা করতে গেলে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়বে। বর্তমানে ইসরাইল তুরস্কের বিভিন্ন নদী এবং মিশরের নীল নদ থেকে পানি আনার পরিকল্পনা মাথায় রেখেছে। সার্বিকভাবে বলা যায়, ইহুদীবাদী ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যে তার আগ্রাসী নীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আরব দেশগুলোর পানিসম্পদ কূক্ষিগত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। সিরিয়া, লেবানন ও জর্দানের পানি সম্পদের ওপর তেলআবিবের লোলুপ দৃষ্টি সব সময়ই ছিল। কথিত শান্তি আলোচনার মাধ্যমে যদি এসব পানির উৎসের নাগাল পাওয়া যায় তো ভালো, তা না হলে যুদ্ধ ও আগ্রাসনের মাধ্যমে এগুলো দখল করা ছিল ইসরাইলের অন্যতম নীতি। নীল নদ থেকে ফোরাত পর্যন্ত ইসরাইলের সীমানা বিস্তৃত করার যে ধৃষ্ঠতাপূর্ণ ঘোষণা ইহুদীবাদী নেতারা দিয়েছিল, তার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল আরব দেশগুলোর পানি সম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ, শুধুমাত্র ভৌগোলিক সীমানা বৃদ্ধি করার জন্য নয়, সেই সাথে আরব দেশগুলোর পানি সম্পদের ওপরও জবর দখল প্রতিষ্ঠা করা ছিল নীল নদ থেকে ফোরাত পর্যন্ত ইসরাইলের সীমানা বৃদ্ধি করা সংক্রান্ত ঘোষণার অন্যতম উদ্দেশ্য। ওয়ার্ল্ড ওয়াটার রিসার্স সেন্টারের অন্যতম গবেষক রোস্টভা এ সম্পর্কে বলেছেন, ইসরাইল তার পতাকায় সাদা ভূমির ওপর যে নীল রংয়ের তারকা চিহ্ণ এঁকেছে, তার মধ্যেও আরবদের পানি সম্পদ কূক্ষিগত করার বাসনা লুকিয়ে আছে। ঐ নীল রংয়ের দাগগুলো হচ্ছে নীল ও ফোরাত নদীর কাল্পনিক প্রতীক। ইহুদীবাদী নেতাদের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যে ওয়ার্ল্ড ওয়াটার রিসার্স সেন্টারের ঐ গবেষকের কথার সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়। ইহুদীবাদী মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা থিওডর হার্তযেল যখন মধ্যপ্রাচ্যের বুকে একটি বৃহৎ ইসরাইল রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল, তখন অন্য সব কিছুর আগে সে কল্পিত ঐ রাষ্ট্রের পানি চাহিদা কীভাবে মেটানো হবে, সে বিষয়টি মাথায় রেখেছিল। হার্তযেল ১৮৮৬ সালে নীল নদ থেকে ফোরাত পর্যন্ত বিস্তৃত ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছিল, ভবিষ্যতে যারা ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করবে তাদের নেতৃত্বে থাকবে পানি বিষয়ক কিছু বিশেষজ্ঞ। ঐ ইহুদীবাদী নেতা ১৮৯৭ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাল শহরের বিখ্যাত সম্মেলনে বলেছিল, ইসরাইলের সীমান্ত আগামী ৫০ বছর নাগাদ উত্তর লিথুনিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বিন গোরিওন ১৯৫৫ সালে ইসরাইলের পানির উৎস সম্পর্কে বলেছিল, বর্তমানে ইসরাইল- পানি সম্পদের উৎস দখল করার জন্য আরবদের সাথে যুদ্ধ করছে। কাজেই এ যুদ্ধের ফলাফলের ওপর ইসরাইলের ভবিষ্যত অস্তিত্ব সরাসরি নির্ভরশীল। বিন গোরিওন আরো বলেছিল, আরবদের সাথে ঐ যুদ্ধে পরাজিত হলে ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডে ইসরাইলের আর কোন অস্তিত্ব থাকবে না। ইসরাইলের একজন বিখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক ওয়েবেন এ সম্পর্কে বলেছেন, ইহুদীবাদী ইসরাইলের দৃষ্টিতে মধ্যপ্রাচ্যে সেদিনই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে, যেদিন আরব দেশগুলোর সকল পানি সম্পদের ওপর তেলআবিবের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে।

Wednesday, July 30, 2008

হিজবুল্লাহর বিজয়ের নেপথ্যে-২

গত ১৬ জুলাই ছিল লেবাননের জনগণ ও সেদেশের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলনের ইতিহাসে আরেকটি ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় দিন। সেদিন ইসরাইল লেবাননী শহীদ ও বন্দীদেরকে ফেরত দিয়েছিল। পক্ষান্তরে লেবানন ইসরাইলের ২ মৃত সেনার লাশ ইসরাইলকে ফেরত দিয়েছে। বন্দী বিনিময়ের এই ঘটনাকে লেবাননের হিযবুল্লাহর ঐতিহাসিক বিজয় বলে মন্তব্য করেছে স্বয়ং অধিকৃত ফিলিস্তিনের দৈনিক ইয়াদিউত অহরুনুত।
সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর নেতৃত্বে ইসরাইলের বিরুদ্ধে লেবাননের ইসলামী প্রতিরোধের সাম্প্রতিক বিজয়ের বিভিন্ন দিক রয়েছে।ইসরাইল সবসময়ই নিজেদের গোয়েন্দা বিভাগের পটুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে কথা বলে এবং ফিলিস্তিনের বিভিন্ন ব্যক্তিত্বকে হত্যা করার ক্ষেত্রে তাদেরকে কাজে লাগায়। কিন্তু বন্দী বিনিময় এবং লেবাননী শহীদদের লাশ ফেরত দেওয়ার ঘটনায় ইসরাইলী এই গোয়েন্দা বিভাগ মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। কেননা লেবাননের হিযবুল্লাহর কাছে ইসরাইলীদের যে দুই সেনা ছিল,তারা যে যুদ্ধ চলাকালে আহত হবার পর মারা গিয়েছিল সেই তথ্য তাদের জানা ছিল না। তারা ভেবেছিল তাদের ঐ ২ সেনা জীবিত আছে।
অপরদিকে ইসরাইল বাধ্য হয়েছে তাদের ২ সেনাকে ফেরত দেওয়ার পরিবর্তে ৫ জন বন্দী এবং লেবাননী-অলেবাননী ২০০টি লাশ হিযবুল্লাহর হাতে বুঝিয়ে দিতে। এ কারণে তেলাবিবের অনেক কর্মকর্তা বন্দী বিনিময়ের দিনটিকে ইসরাইলের ইতিহাসে একটি কালো দিবস বলে উল্লেখ করেছে। ইসরাইলের যোগাযোগমন্ত্রী বলেছেন-'বন্দী বিনিময় ইসরাইলের দুর্বলতাকে সুস্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে।' তিনি তাই ইসরাইলী গণমাধ্যমগুলোকে বলেছেন বন্দী বিনিময়ের খবরটিকে যেন ফলাও করে না ছাপে। এ সম্পর্কে ব্রিটিশ দৈনিক ইন্ডিপেন্ডেন্টও লিখেছে ইসরাইলের এই পরাজয়ের ঘটনা বিশ্বব্যাপী এবং ইসরাইলের অভ্যন্তরেও তাদের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুন্ন করেছে। বিশ্বের আরো বহু দৈনিকও ইসরাইলের বিরুদ্ধে লেবাননের হিযবুল্লাহর ঐতিহাসিক বিজয়কে ফলাও করে তুলে ধরেছে। কোনো কোনো পত্রিকা এটাকে লেবানননের জাতীয় বিজয় বলেও মন্তব্য করেছে।
জাতিসংঘের মহাসচিব বান-কি মুন এবং বিশ্বের বহু দেশ ইসরাইলের বিরুদ্ধে লেবাননের এই বিজয়ে সেদেশের জনগণ ও প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দিত করেছে। এই বিজয়ের ফলে আরো যে বিশাল সাফল্য অর্জিত হয়েছে তাহলো,লেবাননের অভ্যন্তরে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সৃষ্টি হয়েছে।হিযবুল্লাহর উপমহাসচিব শায়েখ নাঈম কাসেম দৈনিক আল-আরাবকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন-'বন্দী বিনিময়ের ঘটনা একদিকে যেমন লেবাননের জনগণের মাঝে ঐক্য ও সংহতির বিষয়টি ফুটিয়ে তোলে,তেমনি এর ফলে বন্দীদেরকে মুক্ত করার ব্যাপারে লেবাননী জনগণ ও সরকার যে আন্তরিক তা-ও প্রমাণিত হয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনাটি লেবাননের অভ্যন্তরে একটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।'
বন্দী বিনিময়ের ফলে আরো যে বিষয়টি হিযবুল্লাহর জন্যে ইতিবাচক ফল বয়ে এনেছে তাহলো,এর ফলে প্রমাণিত হলো যে হিযবুল্লাহ তাদের সেনাদের ব্যাপারে এমনকি শহীদদের লাশের ব্যাপারেও ভীষণ আন্তরিক ও দায়িত্বশীল।তারা যে মানবিক বিষয়গুলোর কথা ভুলে যায় না-এরফলে তাও প্রমাণিত হলো। শহীদদের লাশ ফিরে পেয়ে শহীদ পরিবারের লোকজন ভীষণ খুশি হয়েছে। তারচেয়েও বেশি খুশি হয়েছে সেইসব পরিবার যারা বছরের পর বছর ধরে অপেক্ষা করার পর বন্দীদেরকে তাদের মাঝে জীবিতাবস্থায় পুনরায় ফিরে পেয়েছে। যারা শহীদ হয়েছে কিংবা বন্দী ছিল,তাদের মাঝে হিযবুল্লাহর বাইরেও অন্যান্য দলের সদস্য ছিল।
এ থেকে বোঝা যায় যে হিযবুল্লাহ কেবল স্বার্থপরের মতো নিজেদের শহীদদের ব্যাপারেই তৎপরতা চালায় নি বরং তারা দল-মত নির্বিশেষে পরিপূর্ণ ইসলামী মানবিক আচরণ করে সকল বন্দীর জন্যেই সমানভাবে চেষ্টা চালিয়েছে। সামির কান্তারের মুক্তিই তার প্রমাণ। কেননা সামির কান্তার ৩০ বছর আগে অর্থাৎ হিযবুল্লাহ নামক সংগঠনটি গঠিত হবারও আগে ইসরাইলীদের হাতে বন্দী হয়েছিল। তাকে মুক্ত করার জন্যে হিযবুল্লাহ যে প্রচেষ্টা চালিয়েছে,সেই প্রচেষ্টার ফলে সামির কান্তার এতো বেশি প্রভাবিত হয়েছে যে,সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহকে তিনি তাঁর নেতা এবং শিক্ষক বলে মন্তব্য করতেও কুণ্ঠিত হন নি। তিনি বলেছেন-তাঁর ভাষায়-'গতকাল পর্যন্ত শত্রুদের হাতে বন্দী ছিলাম,কিন্তু আজ থেকে আরো বেশি উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়ে যাবো।'
মজার ব্যাপার হলো,হিযবুল্লাহ অন্যান্য দেশের বন্দীদের মুক্তির জন্যেও বিশেষ করে ফিলিস্তিনী বন্দীদের মুক্তির ব্যাপারেও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করে হিযবুল্লাহ নেতা জনাব হাসান নাসরুল্লাহ বলেছেন, 'বন্দী বিনিময়ের ক্ষেত্রে ইসরাইলীদের হাতে বন্দী ফিলিস্তিনীদের মুক্তির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার জন্যেও আমরা জোর প্রচেষ্টা চালিয়েছিলাম। জাতিসংঘকে লেখা আমাদের চিঠিপত্রগুলোতে তার সুস্পষ্ট প্রমাণ বিধৃত আছে।' লেবাননের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হিযবুল্লাহ,আরব লীগকেও অনুরোধ করেছে,তারা যেন ইসরাইলীদের কারাগারে বন্দী আরব ও ফিলিস্তিনীদের মুক্তি দেওয়ার জন্যে ইসরাইলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে বিশ্ববাসীর প্রতি আহ্বান জানায়।
ইসরাইলী কারাগার থেকে মুক্ত বন্দীদের অভ্যর্থনা জানানোর অনুষ্ঠানে হিযবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরুল্লাহ বলেছেন-'সকল প্রতিরোধ আন্দোলন এবং এ অঞ্চলকে জুলুম নির্যাতন থেকে মুক্ত করার জন্যে যারাই চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে,তাদের পরিচয়, তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য আসলে এক এবং অভিন্ন,তাহলো-দখলদার শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা'।লেবাননের জনগণ অত্যন্ত সচেতনতা এবং বিচক্ষণতার সাথে এই প্রতিরোধ সংগ্রাম চালিয়ে এসেছে। এই সংগ্রামের মাধ্যমেই হিযবুল্লাহ ইসরাইলকে পতনের অতল গহ্বরে নিক্ষেপ করেছে। জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে দৃঢ়তার সাথে দাঁড়িয়ে অত্যাচারীদেরকে আত্মসমর্পনে বাধ্য করা এবং নিজেদের অধিকার ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে লেবাননের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন ইরাক কিংবা ফিলিস্তিনের মতো দখলদারদের যাঁতাকলে পিষ্ট দেশগুলোর জন্যে সফলতার এক অনন্য আদর্শ ও নিদর্শন। #

Thursday, July 24, 2008

হিযবুল্লাহর বিজয়ের নেপথ্যে-১

গত ১৬ জুলাই ছিল লেবাননের জনগণ ও সেদেশের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলনের ইতিহাসে আরেকটি ঐতিহাসিক ও অবিস্মরণীয় দিন। লেবাননের হিযবুল্লাহ জার্মান সরকারের মধ্যস্থতায় ইসরাইলের সাথে পরোক্ষভাবে দীর্ঘ আলোচনার পর তাঁদের ৫ জন বন্দী এবং অন্তত ২০০ শহীদের লাশ দেশে ফেরত আনতে সক্ষম হয়েছে। পক্ষান্তরে হিযবুল্লাহ ইসরাইলী ২ সেনার লাশ অধিকৃত ফিলিস্তিনে ফেরত পাঠিয়েছে। ইসরাইল ভেবেছিলো তাদের ঐ সেনা জীবিত আছে।এর মধ্য দিয়ে বিগত ৮ বছরে ইসরাইলের মোকাবেলায় হিযবুল্লাহর তৃতীয় বিজয় অর্জিত হলো। এরফলে ইসলামী গণআন্দোলন হিযবুল্লাহ ইসরাইলের সামনে তাদের শক্তিমত্তাই প্রমাণ করলো। হিযবুল্লাহ তাদের এই অভিযানকে ক'মাস আগে সিরিয়ায় ইসরাইলী গোয়েন্দাদের হাতে শহীদ ইমাদ মুগনিয়ার নামে নামকরণ করেছে। মুগনিয়া হাজ্জ্ব রেজোয়ান নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। সেজন্যে এই অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছে রেজোয়ান অভিযান। যাই হোক হিযবুল্লাহর এই মহান অর্জনকে নিয়ে আমরা আরো কিছু কথা বলার চেষ্টা করবো। ইসরাইলের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লেবাননের সাথে বন্দী বিনিময়ের দিনটিকে তাদের দেশের জন্যে শোক দিবস বলে মন্তব্য করেছেন।ইসরাইলী দৈনিক ইয়াদিউত অহরুনুত এ সম্পর্কে লিখেছে, 'ইসরাইলীরা বেদনার অশ্রু ঝরাচ্ছে আর লেবাননীরা ঝরাচ্ছে গর্ব ও আনন্দের অশ্রু।' ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলনের কর্মীরা বছরের পর বছর ধরে সংগ্রাম চালাবার পর ২০০০ সালের মে মাসে প্রথমবারের মতো ইসরাইলী সেনাদেরকে দক্ষিণ লেবানন থেকে তাড়াতে সক্ষম হয়। ২০০৬ সালের জুলাই মাসে ইসরাইলী সেনারা হিযবুল্লাহকে নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতায় লেবাননের ওপর হামলা চালায়। কিন্তু ৩৩ দিন যুদ্ধ করার পর লেবাননের জনগণ এবং হিযবুল্লাহর পর্বত কঠিন প্রতিরোধের মুখে ইসরাইল মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত হয় এবং তাদের নৃশংস হামলা বন্ধ করতে বাধ্য হয়। ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে লেবাননের হিযবুল্লাহর তৃতীয় বিজয় অর্জিত হয় ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হিযবুল্লাহর শহীদদের লাশ এবং বন্দীদের ফেরত আনার মাধ্যমে। বিগত কয়েক মাস ইসরাইলের সাথে আলোচনাকালে তারা লেবাননী বন্দী ও শহীদদের লাশ ফেরত দিতে অস্বীকার করে আসছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হিযবুল্লাহর চাপের মুখে তারা কেবল লেবাননী শহীদদের লাশ এবং বন্দীদেরকেই ফেরত দিতে বাধ্য হয় নি বরং বন্দী বিনিময়ের পূর্ব মহূর্ত পর্যন্ত তারা জানতেও পারে নি যে তাদের ঐ দুই সৈন্য যুদ্ধে নিহত হয়েছে। হিযবুল্লাহর বিজয় সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রশ্নটি সামনে আসে তাহলো অন্যান্য আরব দেশ সুসজ্জিত সেনাবাহিনী থাকা সত্ত্বেও এবং উন্নত অস্ত্রশস্ত্রের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও কেন ইসরাইলের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত এ ধরণের বিজয় অর্জন করতে পারলো না! ইসরাইলের বিরুদ্ধে হিযবুল্লাহর বিজয়ের অনেকগুলো কারণ রয়েছে। তবে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি হলো,হিযবুল্লাহর মুমিন সংগ্রামীদের আল্লাহর প্রতি অগাধ বিশ্বাস ও নির্ভরতা এবং তাদের মুজাহিদদের প্রতি আল্লাহর সাহায্য। এ কারণেই হিযবুল্লাহর পতাকায় কোরআনের একটি শ্লোগান নজরে পড়বে। শ্লোগানটি হলো ‌'জেনে রাখো, নিঃসন্দেহে হিযবুল্লাহ বিজয়ী।' এছাড়াও হিযবুল্লাহ তার প্রতিষ্ঠার ২৬ বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখিয়ে দিয়েছে যে,তারা নিজেদের দলীয় স্বার্থে নয় বরং লেবাননের জনগণকে ইসরাইলী আধিপত্য ও নির্যাতন থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্যেই সংগ্রাম করে। এই সংগঠনটি জনকল্যাণমূলক কাজে কীভাবে আত্মনিবেদিত তা লেবাননবাসী খুব ভালো করেই জানে। হিযবুল্লাহ নিরীহ-বঞ্চিতদের সাহায্যে তাদের হাত সবসময় বাড়িয়ে দিয়েছে। এ কারণেই হিযবুল্লাহর প্রতিরোধ আন্দোলন কেবল শিয়াদের কাছেই নয় বরং লেবাননের আহলে সুন্নাত,খ্রিষ্টান এবং দ্রুযদের কাছেও সমানভাবে জনপ্রিয়। হিযবুল্লাহর প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতি জনগণের সমর্থনও ইসরাইলের বিরুদ্ধে হিযবুল্লাহর বিজয়ের আরেকটি প্রধান কারণ। দক্ষিণ লেবানন দখলের বছরগুলোতে এবং ২০০৬ সালে ৩৩ দিনের যুদ্ধের সময় লেবাননের জনগণ ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে হিযবুল্লাহকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন দিয়েছে। প্রতিরোধ যোদ্ধাদের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার ক্ষেত্রে তারা মোটেও পিছপা হয় নি। লেবাননের জনগণ তাদের প্রতিরোধ যোদ্ধাদেরকে নিজেদের সন্তান বলে মনে করে।কেননা; তারা তাদের জীবনোৎসর্গ করে তাদের ধর্ম,দেশ ও জাতিকে রক্ষা করার জন্যে সংগ্রাম করে। এসবের বাইরেও হিযবুল্লাহর বিজয়ের পেছনে সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর মতো সচেতন, সৎ, বিচক্ষণ ও দেশপ্রেমিক নেতারও যথেষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে । অধিকৃত ফিলিস্তিন থেকে প্রকাশিত দৈনিক মাআরিভ হিযবুল্লাহ এবং ইসরাইলের মধ্যে বন্দী বিনিময় সম্পর্কে লিখেছে-'ইসরাইল পরাজিত হয়েছে এবং হিযবুল্লাহর মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহর ভাবমূর্তি ব্যাপক শক্তিশালী হয়েছে। ইসরাইলের সাথে যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী নেতা সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ আরব বিশ্বের এক নম্বর নেতার শিরোপা অর্জন করেছেন। এই মহান স্বীকৃতি ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা হয়ে গেছে। #