Friday, January 2, 2009

গাজা ও কারবালার শাহাদতের সংস্কৃতি

বর্ষ-পরিক্রমায় আবারও ফিরে এসেছে বুকের বেদনায়-ঢাকা মহররম মাস ও রক্তের আখরে লেখা আশুরা-বিপ্লবের শিহরণ-জাগানো দিনগুলো। দিকে দিকে আবারও শ্রদ্ধাভরে উচ্চারিত ও ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে মুক্তিকামী মানুষের নেতা চিরউন্নত-শির হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ)'র চিরঅক্ষয় নাম। ইসলামের এই ত্রাণকর্তা ও মহান ইমাম অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও সত্যের জন্য চরম আত্মত্যাগের চির-উজ্জ্বল, চির-সুন্দর এবং প্রেমময় দৃষ্টান্ত। আত্মত্যাগের ইতিহাসে তিনি কালোত্তীর্ণ ও চিরসবুজ প্রতীক। মুক্তিকামী মানুষের নয়নমনি ও নিপীড়িত মানুষের ধ্যানের ছবি ইমাম হোসাইন (আঃ) ধর্ম, মানবিকতা, বিবেক, মনুষ্যত্ব, মর্যাদাবোধ এবং যুক্তি, সত্য, মহত্ত্ব ও সর্বপরি খোদা-প্রেমের সবগুলো মানদন্ডে মানবজাতি ও মানবইতিহাসের নজিরবিহীন মডেল। প্রায় ১৪০০ বছর আগে সত্যের পক্ষে মৃত্যুবরণ করে তিনি শুধু ইসলাম ধর্মেরই নয় একইসাথে মানবজাতির মর্যাদা রক্ষা করেছেন। তিনি শিখিয়ে গেছেন মুক্তির এই মহামন্ত্র যে, "যতদিন থাকবে ধরায় আত্মদান অত্যাচারীর খড়গ-কৃপানে মানবতা হারাবে না সম্মান জেগে ওঠে ইসলাম পুণরায় জগতের প্রতিটি কারবালায়।" সত্যের পক্ষে আত্মদান যে বৃথা যায় না, বরং তা যে সমাজের ওপর জগদ্দল পাথরের মত চেপে বসা তাগুতি শক্তিকে নির্মূল করার এবং সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জমে থাকা জুলুম, অত্যাচার, দুর্নীতি, অবিচার, ভীরুতা, আপোসকামীতাসহ সমস্ত পাপ-পংকিলতার মূলোৎপাটনের মহৌষধ তারই প্রমাণ আশুরার এই মহাবিপ্লব। শাহাদতে যে গোটা সমাজকে মুক্তিপাগল ও বিশুদ্ধ-আদর্শকামী করে তোলার মোক্ষমতম পন্থা মানুষের অন্তরের অন্তস্থলে অক্ষয় আসনের অধিকারী ইমাম হোসাইন সহ তাঁর প্রকৃত অনুসারীরা তা যুগে যুগে প্রমাণ করেছেন। তারা দেখিয়ে গেছেন শাহাদতেই রয়েছে প্রকৃত জীবন তথা মর্যাদার জীবন, আর অন্যায়ের সাথে আপোস করে বেঁচে থাকার মধ্যে রয়েছে বঞ্চনা ও অবমাননার দুঃসহ গ্লানি। শাহাদতের চির-অম্লান আইকন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন কবির এই অমর বাণীঃ জীবনের চেয়ে দৃপ্ত মৃত্যু তখনই জানি শহীদী রক্ত হেসে ওঠে যবে জিন্দেগানী।
ইসলামের মহান খেলাফত ও ইসলামের অস্তিত্ব যখন মুসলিম নামধারী জালেম এবং তাগুতি শক্তির হাতে পুরোপুরি বিলুপ্তির সম্মুখীন ইসলাম ও মানবতার সেই মহাদূর্দিনে নিজ আন্দোলনের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে আশুরা বিপ্লবের মহানায়ক হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ) বলেছিলেন, " তোমরা কি দেখছো না সত্যের বা ন্যায়ের পক্ষে কাজ করা হচ্ছে না এবং কেউই অন্যায়ের বিরোধিতা করছে না? এ অবস্থায় এমন লাঞ্ছনার জীবনের চেয়ে একজন বিশ্বাসী বা মুমিন ব্যক্তির জন্য আল্লাহর সাথে মিলন তথা শাহাদতই বেশী কাম্য। " ভারতবর্ষে ইসলাম ধর্ম প্রচারের অন্যতম প্রধান অগ্রদূত ও বিশিষ্ট ইরানী সূফী সাধক হযরত খাজা মইনুদ্দিন চিশতি (রঃ) হযরত ইমাম হোসাইন (রাঃ)'র কালজয়ী বিপ্লবের প্রশংসা করে বলেছেন, হোসাইনই ধর্ম এবং ধর্মের রক্ষাকর্তা, তিনিই লা-ইল্লাল্লাহর ভিত্তি বা বুনিয়াদ রক্ষাকারী, শির দিয়েছেন, তবুও ইয়াজিদের হাতে হাত দেন নি বা ইয়াজিদের আনুগত্য স্বীকার করেন নি। শাহাদত জীবনকে দেয় অপার মহিমা। এ কারণেই পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, যাঁরা আল্লাহর পথে শহীদ তাঁদের মৃত বলো না। শহীদ অধ্যাপক আয়াতুল্লাহ মূর্তাজা মোতাহহারী এ প্রসঙ্গে বলেছেন, শহীদের উপমা হচ্ছে এমন এক প্রদীপের মত যে নিজেকে পুড়িয়ে অন্যদেরকে আলো দেয় বা পথ দেখায়। কারবালায় উৎসর্গীকৃত ও নিবেদিতপ্রাণ সঙ্গীদের শাহাদতের দৃশ্য দেখে শাহাদত-প্রিয় ইমাম হোসাইন (রাঃ) বলেছিলেন, "হে আমার মাবুদ! হে আমার প্রভু! তোমার আনুগত্য ও ভালবাসার পথে সত্তুর হাজার বার নিহত ও জীবন্ত হতে আগ্রহী, বিশেষ করে যদি আমার প্রাণদান তোমার ধর্মকে সহায়তা করে এবং তোমার বিধান ও শরীয়তকে জীবিত করে। " হ্যাঁ, ইসলামের সংস্কৃতিতে এ ধরনের শাহাদত মহান আল্লাহর সান্নিধ্যের ও পরিপূর্ণতার চরম শিখর। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ বিশ্বাসী ও আস্থাশীল হযরত ইমাম হোসাইন (রা)'এর শাহাদতের মুহূর্ত যতই ঘনিয়ে আসছিল ততই তাঁর নূরানী চেহারা আনন্দে উজ্জ্বলতর হয়ে উঠছিল। ইমামের তরুণ পুত্র শহীদ আলী আকবর বলেছিলেন, আমরা যেহেতু সত্যের পথে আছি, শাহাদত আমার কাছে মধুর চেয়েও বেশী প্রিয়। আশুরা-বিপ্লব বা শাহাদতের সংস্কৃতিতে উজ্জ্বীবিত হয়েই বিংশ শতকে বিধ্বংসী মারণাস্ত্র ও পরাশক্তির রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ইরানের মুসলিম জাতি মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)'র নেতৃত্বে সংঘটিত করেছে ইসলামী বিপ্লব। শাহাদত-পাগল ইরানী জাতির কাছে দুই পরাশক্তির সমর্থনপুষ্ট সাদ্দামের সমাজতান্ত্রিক বাহিনী নাস্তানাবুদ হয়েছে। একই আদর্শে উজ্জ্বীবিত লেবাননের হিজবুল্লাহ ও গণপ্রতিরোধ বাহিনী দখলদার ইসরাইলের অপরাজেয় থাকার দর্প চূর্ণ করেছে। কারবালার ময়দান ছিল ঈমান ও ধর্মীয় চেতনা রক্ষার পাশাপাশি মানবতাবোধ, মানবাধিকার এবং বিবেক ও মনুষ্যত্ব রক্ষার এক বড় পরীক্ষা। এ পরীক্ষায় কুফার অধিকাংশ জনগণ ব্যর্থ হয়েছিল, ব্যর্থ হয়েছিল মুসলিম উম্মাহর এক বিশাল অংশ। মুসলিম নামধারী ইয়াজিদ ও ইবনে-জিয়াদ চক্র ফোরাতের পানি থেকে ইমাম পরিবার এবং তার সঙ্গী-সাথীদের বঞ্চিত করে পাশবিকতার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছিল। ইমাম হোসাইন (রা)পানির পিপাসায় কাতর মৃতপ্রায় ৬ মাসের নিষ্পাপ শিশু হযরত আলী আসগরের জন্য পানি প্রার্থনা করলে ইয়াজিদের অনুগত সেনারা এই শিশুর গলায় তীর নিক্ষেপ করে তাঁকে শাহাদতের অমিয় সুধা পান করতে বাধ্য করে। অথচ ইমাম হোসাইন (রা) তার বিরুদ্ধে লড়তে আসা শত্রু সেনারা যাতে পানির অভাবে কষ্ট না পায় সে জন্য কারবালায় আসার পর পরই তিনি পানি সঞ্চয়ের ব্যবস্থা করেছিলেন। ইয়াজিদী শাসকগোষ্ঠী ও তার অনুসারীদের ধর্মবোধ তো দূরের কথা মানবতাবোধ বা মনুষ্যত্ববোধও ছিল না। আজ আমরা একই ধরনের চিত্র দেখছি ফিলিস্তিনের গাজায়। প্রায় দুই বছর ধরে গাজার অধিবাসীরা ইসরাইলী অবরোধের ফলে জ্বালানী, খাদ্য ও ওষুধসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অভাবে ধুকে ধুকে মরছে। অথচ মানবাধিকারের ও কথিত গণতন্ত্রের সমর্থক পশ্চিমা সরকারগুলো এ ব্যাপারে নীরব থেকে দখলদার ইসরাইলকে উৎসাহ যুগিয়ে আসছে। শুধু অবরোধেই ক্ষান্ত হয়নি মানবতার শত্রু ইসরাইল ও তার দোসরারা। গণতান্ত্রিকভাবে নিরপেক্ষ ও অবাধ নির্বাচনে বিজয়ী ইসলামপন্থী হামাস সরকারকে সমর্থনের কারণে গাজা ও পশ্চিম তীরে হামাসের সমর্থক ফিলিস্তিনীদের ওপর সন্ত্রাসী হত্যা অভিযানও চালিয়ে আসছে বর্তমান যুগের এই ইয়াজিদী গোষ্ঠী। আর এসব হামলার জবাবে অসম শক্তির অধিকারী হামাস মাঝে মধ্যে দখলদার ইহুদিবাদীদের অবৈধ বসতিগুলোর ওপর সাধারণ মর্টার ও রকেট নিক্ষেপ করায় হামাসের আত্মরক্ষার এই শক্তিটুকুকেও নির্মূল করার জন্য আজ প্রায় এক সপ্তাহ ধরে সেখানে পাইকারীভাবে শক্তিশালী ও এমনকি ইউরেনিয়ামযুক্ত বোমা বর্ষণ করে নারী ও শিশুসহ শত শত বেসামরিক ফিলিস্তিনীকে শহীদ করেছ ইসরাইলী হায়েনার দল। দুঃখজনক ব্যাপার হলো সেইযুগের ইয়াজিদের সহযোগী ইবনে জিয়াদ, শিমার ও ওমর সাদের মত কোনো কোনো আরব সরকার ইসরাইলের এ গণহত্যায় গোপনে শরীক বা সহযোগী হয়েছে। গাজার মসজিদ, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিশুদের স্কুলগুলোও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহকৃত স্মার্ট বোমার ছোবল থেকে রেহাই পাচ্ছে না। কিন্তু যারা আশুরার শাহাদতের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে এমন জাতির জাগরণকে এটম বোমা মেরেও স্তব্ধ করতে পারবে না পশু শক্তি। আধুনিক সভ্যতার যুগেও বিবেক-বিসর্জিত যে শক্তি হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা মেরে দেশটিকে নতজানু করতে পেরেছে, সেই শক্তি আজ শাহাদতের চেতনায় উজ্জ্বীবীত ইরাকী ও আফগান জাতির কাছেও পরাজয়ের সম্মুখীন। কারবালার বীর শহীদানের মতো গাজার শহীদানরাও আজ আঁজলা ভরে প্রাণের সঞ্চার করছে মসলিম উম্মাহর শিরা-উপশিরা ও ধমনীতে। তাই ইমাম হোসাইন (রা)'র আদর্শের অনুসারীরা আজ শুধু কথায় নয় কাজের মাধ্যমে অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামরিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনসহ সবক্ষেত্রে কুফুরি শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এবং মুসলমানদের প্রথম কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাস দখলদারদের বিরুদ্ধে এ ধরনের লড়াইয়ে অংশ নিলেই বিশ্বনবী (সাঃ) ও ইমাম হোসাইন (আঃ)'র পবিত্র আত্মা প্রশান্তি পাবেন। মহান আল্লাহই পবিত্র কোরআনে বলেছেন, তোমরা হীনবল হয়োনা, ভীত হয়ো না, তোমরাই শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করবে, যদি তোমরা মুমিন হও। হ্যা, ইমাম হোসাইন (আঃ)'র রক্ত যেমন তরবারীর ওপর বিজয়ী হয়েছিল তেমনি আল্লাহর শক্তিতে পূর্ণ বিশ্বাসী গাজার বীর মুজাহিদ এবং অসহায় নারী ও শিশুদের রক্তও এ যুগের ইয়াজিদ, চেঙ্গিজ ও হালাকু খাঁর মত পশুশক্তির ওপর বিজয়ী হবে। এ বিজয় কেবলই সময়ের ব্যাপার। কারণ, গাজার তরুণ শিশুসহ সেখানকার সবার মুখে মুখে এখন এ শ্লোগান ধ্বনিত হচ্ছে - হাসবুন আল্লাহু ওয়ানেয়ামাল ওয়াক্বীল- আমাদের জন্য আল্লাহ এবং তাঁর অভিভাবকত্বই যথেষ্ট। বিবেক মানুষের ফিতরাত বা প্রকৃতির অংশ। বিবেকের দংশনে কারবালার নরঘাতকদের কেউ কেউ পাগল হয়ে গিয়েছিল, পাগল হয়েছিল হিরোসীমা ও নাগাসাকিতে পরমাণু বোমা নিক্ষেপের মাধ্যমে দুই লক্ষেরও বেশী মানুষ হত্যাকারী মার্কিন বৈমানিক। ইসরাইলের সহযোগী আরব ও পশ্চিমা বিশ্বের নেতারা কি তাহলে মানুষ নন? #

Wednesday, September 3, 2008

পাশ্চাত্যের চলচ্চিত্রে ত্রাণকর্তার ধারণা ও দৃশ্য

চিন্তাবিদ ও দার্শনিকরা প্রাচীন যুগ থেকেই আদর্শ সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছেন। যেমন, প্লেটো তার কল্পিত ইউটোপিয়ায়, ফারাবী তার সূর্যের নগরে, টমাস ম্যুর তার কল্পিত পৃথিবীর স্বর্গে আদর্শ সমাজ বা দেশ গড়ার স্বপ্ন তুলে ধরেছেন। খোদায়ী ধর্মগুলোও মানুষকে ধ্বংস, লাঞ্ছনা ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি দানকারী সর্বশেষ ত্রাণকর্তার আবির্ভাবের সুসংসবাদ সব সময়ই দিয়ে এসেছে। সর্বশেষ ত্রাণকর্তার শাসন ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, সবার মধ্যে উচ্চ শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেয়া, ন্যায় বিচার, নিরাপত্তা, শান্তি এবং সবার জন্য সুখ-সমৃদ্ধি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা। কিন্তু কথা হলো এই সর্বশেষ ত্রাণকর্তার আবির্ভাব কবে, কোথায় ও কিভাবে হবে এবং কবে এই ইউটোপিয়া বা কল্পনা বাস্তবায়িত হবে? সর্বশেষ ত্রাণকর্তার আবির্ভাবের যুগকে শেষ জামানা বা এপোক্যালিপসি বলা হয়। অবশ্য প্রত্যেক ধর্ম ও সম্প্রদায় ইতিহাসের শেষ অংশকে ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে চিত্রিত করে আসছে। এসব বর্ণনার অধিকাংশের মধ্যেই অক্ষ শক্তি বা অসত্যের পক্ষের শক্তিগুলোর সাথে সর্বশেষ ত্রাণকর্তার অনুগত বাহিনীর রক্তাক্ত ও ভয়াবহ যুদ্ধ ঘটার এবং এসব ত্রাণকর্তার অনুগত বাহিনীর বিজয়ী হবার কথা বলা হয়েছে।
সর্বশেষ ত্রাণকর্তার আবির্ভাবের সময়ে সত্য ও মিথ্যার পক্ষের শক্তিগুলোর লড়াইয়ে সত্যের শক্তির তথা সর্বশেষ ত্রাণকর্তার বিজয়ের বিষয়টি বিভিন্ন উপন্যাস, গল্প বা চলচ্চিত্র তৈরির মাধ্যমে পরিণত হয়েছে। এমনকি ত্রাণকর্তাকে আদর্শ বা নায়ক হিসেবে ধরে নিয়ে শিশুদের জন্যেও অনেক গল্প ও চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের ফিল্ম ইন্ড্রাস্ট্রি ও বিশেষ করে হলিউড অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। ভবিষ্যতের ব্যাপারে মানুষের জানার আগ্রহকে ব্যবহার করে চলচ্চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে ব্যাপক অর্থ উপার্জন এর অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। আর এ ধরনের চলচ্চিত্র নির্মাণের অন্য উদ্দেশ্য হলো শেষ জামানা ও ত্রাণকর্তা সম্পর্কে পাশ্চাত্যের এবং ইহুদিবাদী মহলের চিন্তাধারা প্রচার করা। চলচ্চিত্রের ইতিহাসের প্রথম দিকের কিছু ছায়াছবিসহ বিভিন্ন সময়ের এবং সাম্প্রতিক সময়েরও অনেক পশ্চিমা চলচ্চিত্র এ উদ্দেশ্যেই নির্মিত হয়েছে। ১৯১৫ সালে নির্মিত বার্থ অফ এ নেশন বা একটি জাতির জন্ম এমনই এক ছায়াছবি। ইহুদি ধর্মের বিকৃত হয়ে-যাওয়া চিন্তাধারা বা ইহুদিবাদী চিন্তা-ভাবনা এ ছায়াছবিতে ভরপুর। ছায়াছবিটির পরিচালক গ্রিফিথের বর্ণবাদী চিন্তাভাবনা এবং অ-ইহুদিদের প্রতি তার গভীর বিদ্বেষ এ ছায়াছবির গোটা পরিবেশকে কলুষিত করে রেখেছে।
এর পরের বছরগুলোতে ফিলিস্তিনে ইসরাইল নামের একটি অবৈধ ও দখলদার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি সমর্থন যোগানোর জন্য পাশ্চাত্যে অনেক ছায়াছবি নির্মিত হয়েছে। হযরত মূসা (আঃ)'র টেন কমান্ডম্যান্টস বা দশ নির্দেশমালা ও বেনহুর নামের ছায়াছবিগুলো এ জন্যই তৈরি ও বিশ্বব্যাপী প্রচার করা হয়। চলচ্চিত্রের বিশিষ্ট সমালোচক ও বিশেষজ্ঞ এরিক রড এ প্রসঙ্গে বলেছেন, এ ছায়াছবিগুলো পবিত্র ধর্মগ্রন্থ অনুসারে নির্মিত হয়েছে বলে বলা যায় না। ছবিগুলোর পরিচালক ঘটনার ক্ষেত্রে এতটাই হস্তক্ষেপ করেছেন যে, পরিচালক নিজেই খ্রিস্টানদের প্রতিক্রিয়াকে কাজে লাগানোর উদ্দেশ্যে এসব ছায়াছবি তৈরির কথা স্বীকার করেছেন। গত কয়েক দশকে টফলার, হাংটিনটন ও ফুকোইয়ামার মতো আধিপত্যকামী মার্কিন চিন্তাবিদ পৃথিবীর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে রাজনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও ধর্মীয় বিতর্কের কলেবরে অনেক সাম্রাজ্যবাদী ধারণা বা মতবাদ প্রচার করেছেন। আর এসব ধারণাও পাশ্চাত্যের অনেক ছায়াছবিতে সূক্ষ্ম কৌশলে প্রচার করা হচ্ছে। অবশ্য এ জন্য প্রধানতঃ ধর্মীয় আচ্ছাদন বা রং ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এসব আচ্ছাদনের ভেতর দিয়েও রাজনৈতিক বক্তব্য স্পষ্টভাবেই ধরা পড়ে। এ ধরনের একটি ছায়াছবির দৃষ্টান্ত হল, ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে বা স্বাধীনতা দিবস। ১৯৯৬ সালে নির্মিত এ ছায়াছবিতে দেখা যায় একটি মহাশুন্যযান পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে বলে বিভিন্ন কম্পিউটার থেকে খবর ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। একজন কম্পিউটার বিশেষজ্ঞ ঐ নভোযান থেকে আসা সিগনালগুলোর অর্থ বুঝতে পেরে নভোযানটিকে মোকাবেলা করার পদ্ধতি শিক্ষা দিতে থাকেন। ফলে নভোযানটি পৃথিবীতে হামলা করলে কম্পিউটারের মাধ্যমে প্রয়োগ করা কৌশলের মাধ্যমে তাকে পরাস্ত করা হয় এবং নভোযানটি পৃথিবী ছেড়ে পালিয়ে যায়। ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে বা স্বাধীনতা দিবস শীর্ষক এই ছায়াছবিতে মার্কিন ও ইহুদিবাদী নেতাদের অনেক মনোভাব তুলে ধরা হয়েছে এবং ত্রাণকর্তাকে ইহুদি হিসেবে দেখানো হয়েছে। এ ছায়াছবিতে পৃথিবীর শেষ সময় ঘনিয়ে আসার কথা স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে এবং ইহুদিরা যে এ জন্য খুশী তাও গোপন করা হয় নি। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে ম্যাট্রিক্স নামের তিনটি ছায়াছবি নির্মাণ করা হয়। এসব ছায়াছবিতেও ভবিষ্যৎ ত্রাণকর্তার কথা গুরুত্বের সাথে তুলে ধরা হয়েছে। এ ছবিগুলোর ঘটনাকে ২২০০ সালের বলে দেখানো হয়েছে। বলা হয়েছে, সে সময় যন্ত্রদানব মানুষের মগজের ওপর আধিপত্য করবে। এ অবস্থায় নিও নামের একজন নির্বাচিত ব্যক্তিত্ব বা নায়ক ঐসব যন্ত্রদানবকে পরাজিত করে মানবজাতিকে মুক্ত করেন। যায়ন নামের পাহাড়ে গিয়ে (neo) নিও এই মুক্তির ব্যবস্থা নেন। যায়ন বা সাহইয়ুন পাহাড়টি রয়েছে ফিলিস্তিনের বায়তুল মোকাদ্দস শহরে। এভাবে দেখানো হয়েছে যে নতুন বা নিও নামের ত্রাণকর্তা মানুষকে জায়ন পাহাড়ের দিকে পরিচালিত করছেন। ইহুদিবাদীদের কথিত প্রতিশ্রুত-ভূমি বা দখলদার ইসরাইলের প্রতি দর্শকদের মনে ভালো ধারণা সৃষ্টির জন্যই যে এ ধরনের গল্প সাজানো হয়েছে তা স্পষ্ট। পাশ্চাত্যের চলচ্চিত্রে ইহুদিবাদ বা বিকৃত ইহুদি চিন্তাধারা তুলে ধরার পাশাপাশি ইসলামী চিন্তাধারা ও মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাসের ওপরও আঘাত হানা হচ্ছে। ইসলাম সম্পর্কে খারাপ ধারণা সৃষ্টির জন্য ইসলামকে বিকৃতভাবে তুলে ধরার এ প্রচেষ্টার একটি নিদর্শন হলো দ্যা ম্যান হু স' টোমোরো বা যে লোকটি ভবিষ্যৎকে দেখেছেন শীর্ষক ছায়াছবি। ষোড়ষ শতকের গণক নস্ট্রাডমাসের ভবিষদ্বাণীর আলোকে নির্মিত হয়েছে এ ছায়াছবি। নস্ট্রাডমাসের ভবিষদ্বাণী শীর্ষক বইয়ের আলোকে মেট্রো গোল্ডেনমায়ার কোম্পানী এই ছায়াছবি নির্মাণ করে ইসলাম ধর্মে উল্লেখিত ভবিষ্যতের ত্রাণকর্তা বা হযরত ইমাম মাহদী (আঃ) সম্পর্কে খারাপ ধারণা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে। এ ছায়াছবিতে হযরত ইমাম মাহদী (আঃ)কে পুরোপুরি সত্যের বিপরীতভাবে তুলে ধরা হয়েছে এবং তাঁর সম্পর্কে মুসলমানদের বিশ্বাসকে উপহাস করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ইরানের অধ্যাপক হাসান বুলখারি বলেছেন, হলিউডের ছায়াছবি এখন বেশ জোরালোভাবে শেষ ত্রাণকর্তার ধারণা প্রচার করছে। তারা একদিকে ইসলামের হযরত ইমাম মাহদী (আঃ) সম্পর্কিত ধারণাকে আঘাত করছে বা বিকৃত করছে অন্যদিকে শেষ ত্রাণকর্তা সম্পর্কে নিজের আজগুবি কল্পনা ছড়িয়ে দিচ্ছে। রাজনৈতিক বা ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে আমি এ কথা বলছি না, বরং হলিউডের ছায়াছবি বিশ্লেষণ করেই আমার মধ্যে এ ধারণা জন্মেছে।
জনাব হাসান বুলখারি আরো বলেছেন, সংকটপীড়িত মানুষ এখন ঐশী বা খোদায়ী সাহায্যের আশা করছে বা ভবিষ্যতের ত্রাণকর্তার জন্য অপেক্ষা করছে। হযরত ইমাম মাহদী (আঃ) 'র দাওয়াতি কার্যক্রম তুলে ধরা মুসলমানসহ সবারই দায়িত্ব। আর এ জন্য গণমাধ্যম ব্যবহার করা জরুরী। আমি নিশ্চিত যে এ আহ্বান মানুষের মধ্যে সাড়া জাগাবে এবং এভাবে পাশ্চাত্যের প্রচার-যুদ্ধ মোকাবেলা করাও সম্ভব হবে। মানবজাতি যে শেষ ত্রাণকর্তা তথা হযরত ইমাম মাহদী (আঃ)'র আগমনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তার অন্যতম লক্ষণ হলো বিশ্বজয়ী বা অলৌকিক নায়কদের কাহিনীর ব্যাপক জনপ্রিয়তা। দর্শকদের কাছে স্পাইডারম্যান, ব্যাটম্যান ও সুপারম্যান জাতীয় নায়ক চরিত্রের ব্যাপক জনপ্রিয়তা এর প্রমাণ। দ্যা ডার্ক নাইট বা অন্ধকারের বিজয়ী বীর শীর্ষক ছায়াছবি এ ধারারই আরেকটি সংযোজন। রেকর্ড পরিমাণে এ ছায়াছবির কপি বিক্রির ঘটনায় বোঝা যায় মুক্তির জন্য অধীর মানব জাতি বর্তমান যুগের সংকট থেকে রক্ষা পেতে চায়। এটা স্পষ্ট হযরত ইমাম মাহদী (আঃ) যখন আবির্ভূত হবেন তখন সমস্ত মুক্তি-পাগল মানুষ তাঁকে সাদরে বরণ করে নেবে এবং আলোর অফুরাণ বন্যায় কেটে যাবে জুলুম ও অন্যায়-অবিচারের নিকষ আঁধার। তাই এই মহান ত্রাণকর্তার আবির্ভাবের পটভূমি তৈরির জন্য মুসলিম দেশগুলোর প্রচার মাধ্যমকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে এবং হযরত ইমাম মাহদী (আঃ)'র পরিচিতি তুলে ধরার জন্যও মুসলমানদেরকে আরো বেশী সক্রিয় হতে হবে।#

Monday, August 11, 2008

আরব বিশ্বের পানি সম্পদ জবর দখলের ইসরাইলী অপচেষ্টা

ইহুদীবাদী ইসরাইল প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকেই ইহুদীবাদী নেতারা আরব দেশগুলোর পানি সম্পদ দখল ও তা প্রত্যাহার করে ইসরাইলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা শুরু করে। এ কারণে আরব দেশগুলো বিশেষ করে ফিলিস্তিনী জনগণ ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ফিলিস্তিনের স্বশাসন কর্তৃপক্ষের পানি সম্পদ বিভাগের প্রধান ফজল কাউশ এ সম্পর্কে বলেছেন, ইসরাইলীরা জর্দান নদীর শতকরা ৪৫ ভাগ পানি চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। ফজল কাউশ আরো বলেছেন, জর্দান নদীর ৮৫ কোটি কিউসেক পানির মধ্যে ফিলিস্তিনীরা মাত্র ৮ কোটি ৫০ লাখ কিউসেক পানি ব্যবহার করতে পারছে। ইহুদীবাদী ইসরাইল ঐ নদীর বাকি পানি বাঁধ দিয়ে প্রত্যাহার করে নিয়ে যাচ্ছে। এর আগে গাজা উপত্যকার ওপর ইসরাইলী দখলদারিত্বের সময় তেলআবিব গাজা থেকেও বেশীর ভাগ পানি চুরি করে নিয়ে যেত। গাজার পানি সম্পদের পরিমাণ বছরে ২০ কোটি কিউসেক বলে ধরা হয়। তবে গাজা থেকে ইসরাইলী সেনা প্রত্যাহার করার পর ইহুদীবাদীরা ঐ উপত্যকার পানিসম্পদ আর চুরি করতে পারছে না। কিন্তু ইহুদীবাদী ইসরাইল কর্তৃক জর্দান নদীর পানি প্রত্যাহার অব্যাহত রয়েছে। সিরিয়া ও জর্দানের ভেতর দিয়ে বয়ে আসা নদী ইয়ারমুক থেকেও ইসরাইল বছরে ১০ কোটি কিউসেক পানি সরিয়ে নিচ্ছে। দক্ষিণ লেবানন যখন ইসরাইলের দখলে ছিল, তখন সেখানকার তিনটি নদীর পানি ইহুদীবাদীরা চুরি করতো এবং এর পরিমাণ ছিল ৭০ কোটি কিউসেক। কিন্তু হিযবুল্লাহর তীব্র প্রতিরোধ আন্দোলনের মুখে ২০০০ সালে ইহুদীবাদী সরকার দক্ষিণ লেবানন থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। কিন্তু তারপরও তারা লেবাননের পানি চুরি করা বন্ধ রাখে নি। তারা খাল খনন ও পাইপ লাইন স্থাপনের মাধ্যমে লেবাননের পানি ইসরাইলে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। গোলান মালভূমি দখল করে ইহুদীবাদীরা সিরিয়ার ৬০ কোটি কিউসেক পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। এদিকে ইসরাইলের বার্ষিক পানির চাহিদা ২০০০ সালে ছিল ২৩০ কোটি কিউসেক, যা ২০২০ সালে ৩১০ কোটি কিউসেকে গিয়ে দাঁড়াবে। কাজেই ইসরাইলের পানি চাহিদার এ হিসাব থেকে বোঝা যায়, অবৈধ ঐ রাষ্ট্রটি তার ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদা মেটানোর জন্য আগামী দিনগুলোতে আরব দেশগুলোর আরো বেশী পানির উৎস দখলের চেষ্টা করবে। তার তা করতে গেলে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়বে। বর্তমানে ইসরাইল তুরস্কের বিভিন্ন নদী এবং মিশরের নীল নদ থেকে পানি আনার পরিকল্পনা মাথায় রেখেছে। সার্বিকভাবে বলা যায়, ইহুদীবাদী ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যে তার আগ্রাসী নীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আরব দেশগুলোর পানিসম্পদ কূক্ষিগত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। সিরিয়া, লেবানন ও জর্দানের পানি সম্পদের ওপর তেলআবিবের লোলুপ দৃষ্টি সব সময়ই ছিল। কথিত শান্তি আলোচনার মাধ্যমে যদি এসব পানির উৎসের নাগাল পাওয়া যায় তো ভালো, তা না হলে যুদ্ধ ও আগ্রাসনের মাধ্যমে এগুলো দখল করা ছিল ইসরাইলের অন্যতম নীতি। নীল নদ থেকে ফোরাত পর্যন্ত ইসরাইলের সীমানা বিস্তৃত করার যে ধৃষ্ঠতাপূর্ণ ঘোষণা ইহুদীবাদী নেতারা দিয়েছিল, তার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল আরব দেশগুলোর পানি সম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। অর্থাৎ, শুধুমাত্র ভৌগোলিক সীমানা বৃদ্ধি করার জন্য নয়, সেই সাথে আরব দেশগুলোর পানি সম্পদের ওপরও জবর দখল প্রতিষ্ঠা করা ছিল নীল নদ থেকে ফোরাত পর্যন্ত ইসরাইলের সীমানা বৃদ্ধি করা সংক্রান্ত ঘোষণার অন্যতম উদ্দেশ্য। ওয়ার্ল্ড ওয়াটার রিসার্স সেন্টারের অন্যতম গবেষক রোস্টভা এ সম্পর্কে বলেছেন, ইসরাইল তার পতাকায় সাদা ভূমির ওপর যে নীল রংয়ের তারকা চিহ্ণ এঁকেছে, তার মধ্যেও আরবদের পানি সম্পদ কূক্ষিগত করার বাসনা লুকিয়ে আছে। ঐ নীল রংয়ের দাগগুলো হচ্ছে নীল ও ফোরাত নদীর কাল্পনিক প্রতীক। ইহুদীবাদী নেতাদের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যে ওয়ার্ল্ড ওয়াটার রিসার্স সেন্টারের ঐ গবেষকের কথার সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যায়। ইহুদীবাদী মতবাদের প্রতিষ্ঠাতা থিওডর হার্তযেল যখন মধ্যপ্রাচ্যের বুকে একটি বৃহৎ ইসরাইল রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল, তখন অন্য সব কিছুর আগে সে কল্পিত ঐ রাষ্ট্রের পানি চাহিদা কীভাবে মেটানো হবে, সে বিষয়টি মাথায় রেখেছিল। হার্তযেল ১৮৮৬ সালে নীল নদ থেকে ফোরাত পর্যন্ত বিস্তৃত ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেছিল, ভবিষ্যতে যারা ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করবে তাদের নেতৃত্বে থাকবে পানি বিষয়ক কিছু বিশেষজ্ঞ। ঐ ইহুদীবাদী নেতা ১৮৯৭ সালে সুইজারল্যান্ডের ব্যাল শহরের বিখ্যাত সম্মেলনে বলেছিল, ইসরাইলের সীমান্ত আগামী ৫০ বছর নাগাদ উত্তর লিথুনিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
ইসরাইলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বিন গোরিওন ১৯৫৫ সালে ইসরাইলের পানির উৎস সম্পর্কে বলেছিল, বর্তমানে ইসরাইল- পানি সম্পদের উৎস দখল করার জন্য আরবদের সাথে যুদ্ধ করছে। কাজেই এ যুদ্ধের ফলাফলের ওপর ইসরাইলের ভবিষ্যত অস্তিত্ব সরাসরি নির্ভরশীল। বিন গোরিওন আরো বলেছিল, আরবদের সাথে ঐ যুদ্ধে পরাজিত হলে ফিলিস্তিনী ভূখণ্ডে ইসরাইলের আর কোন অস্তিত্ব থাকবে না। ইসরাইলের একজন বিখ্যাত রাজনৈতিক বিশ্লেষক ওয়েবেন এ সম্পর্কে বলেছেন, ইহুদীবাদী ইসরাইলের দৃষ্টিতে মধ্যপ্রাচ্যে সেদিনই স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে, যেদিন আরব দেশগুলোর সকল পানি সম্পদের ওপর তেলআবিবের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হবে।