Saturday, June 20, 2015

আমি ভার্জিন ছিলাম না: রেইহানা জাব্বারি

খুনের দায়ে ইরানে গত ২৫ অক্টোবর ফাঁসি হওয়া নারী রেইহানা জাব্বারিকে নিয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যম মেতে উঠেছিল। সেই সঙ্গে বাংলাদেশেরও বেশ কিছু টেলিভিশন এবং পত্রপত্রিকা রেইহানার ফাঁসির বিরুদ্ধে খবর প্রচার ও প্রকাশ করেছে। এসব গণমাধ্যমের খবর প্রকাশের ঢং দেখে পরিষ্কার মনে হয়েছে- সত্য প্রকাশ নয়; তারা যেন ইরান সরকারকেই দায়ী করে খবর ছাপতে প্রস্তুত। তাদের বক্তব্য থেকে মনে হতেই পারে ‘ইরানে যেন নারীর অধিকার বলতে কিছু নেই, যেন ইরান সরকার রেইহানাকে ফাঁসি দিয়ে মুক্তি পেতে চেয়েছিল। মনে হতে পারে ইরানে নারী হলে বুঝি ফাঁসি দেয়াটা কোনো ব্যাপার নয়। আরো মনে হতে পারে রেইহানা নারী বলেই ফাঁসি হলো; পুরুষ হলে ফাঁসি হতো না।’ কিন্তু আসলে কি তাই? কেন এমন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে খবর তুলে ধরা? কেন নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে অপপ্রচার এবং আসল সত্য গোপনের চেষ্টা করা হচ্ছে? অথচ অপপ্রচার না চালালে এবং নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে সত্যকে সামনে রেখে এগিয়ে গেলে হয়ত রেইহানা বেঁচে যেত পারতেন। তাহলে কেন এমন অপপ্রচার হয়েছে রেইহানাকে নিয়ে? এসব প্রশ্নের জবাব পাওয়ার আগে একটু দেখা যাক বিচার চলার সময় আদালতে রেইহানা কি স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। এছাড়া, মামলার বিচারক একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি কি বলেছেন তাও একটু জানা দরকার। রেইহানার কুমারিত্ব ও বিচারকের সাক্ষাৎকার: খুনের ঘটনায় জড়িত থাকার অপরাধে ২০০৭ সালে গ্রেফতার হওয়ার পর দীর্ঘ সাত বছর ধরে বিচার চলেছে ইরানের আদালতে। এ সময় রেইহানা আদালতে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন যে, তিনি নিজে ভার্জিন ছিলেন বা কুমারি ছিলেন না। রেইহানা আরো জানিয়েছেন, তিনি নিজে একটি অফিসে চাকরি করতেন এবং সেই অফিসের ম্যানেজারের সঙ্গেও তার অবৈধ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ সম্পর্কের জের ধরে তিনি বেশ কয়েকবার ইরানের উত্তরাঞ্চলের চলুস মহাসড়কে অবস্থিত ম্যানেজারের ভিলায় গেছেন। ম্যানেজারের সঙ্গে সম্পর্কের এক পর্যায়ে রেইহানা গর্ভবর্তীও হয়ে পড়েছিলেন। তার এ স্বীকারোক্তি আদালতের নথিতে সংযুক্ত রয়েছে। রেইহানার এই স্বীকারোক্তির কথা জানিয়েছেন ফাঁসির রায় দেয়া বিচারক হাসান থারদাস্ত। তিনি জানান, ম্যানেজারের সঙ্গে রেইহানার এসএমএস এবং কথাবার্তার প্রিন্ট ও তথ্য-প্রমাণাদি তার মামলার ফাইলে সংযুক্ত রয়েছে। নিহতের সঙ্গে রেইহানার কি সম্পর্ক: ফারারু ডট কমের পক্ষ থেকে বিচারক থারদাস্তের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল- নিহত মোর্তেজা সারবান্দির সঙ্গে রেইহানার কোনো কাজের সম্পর্ক ছিল কিনা। এর জবাবে বিচারক জানিয়েছেন, রেইহানা আদালতে কমপক্ষে তিনবার বলেছিল- “আমি সারবান্দিকে ‘সার্ভিস’ দিতাম যাতে সেও আমাকে সেবা দেয়।” কোনো ধরনের কাজের সম্পর্ক ছিল না। লাগামহীন চলাফেরা করা ছেলেমেয়েরা সাধারণত ‘সার্ভিস’ দেয়াকে বিশেষ পরিভাষা হিসেবে ব্যবহার করে যার অর্থ হলো নিজেদের মাঝে অবৈধ যৌন সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা (অর্থাৎ অর্থের বিনিময়ে যৌন সুবিধা দেয়া)। আদালতে দেয়া রেইহানার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী তার অফিসের ম্যানেজারের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের কারণে রেইহানার বাগদত্তার সঙ্গেও তার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। তদন্তে সেই বাগদত্তার একটি এসএমএস উদ্ধার করা হয়েছে যাতে তিনি রেইহানাকে বলেছেন, “তুমি আমাকে বিদায় বলেছ যখন তুমি তার শয্যাসঙ্গীনি হয়েছ…..নোংরা….এটা তোমাকে আমার সর্বশেষ এসএমএস।” কেন বয়সের এত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সারবান্দির সঙ্গে সম্পর্ক?: রেইহানা জানিয়েছেন এবং মামলার নথিতে রয়েছে তাতে দেখা যায়- রেইহানা বলেছেন, “আমি তাকে কিছু নিয়ন্ত্রিত সার্ভিস (যৌন সেবা) দিতে চেয়েছিলাম বিনিময়ে কিছু আর্থিক সুবিধা পেতে চেয়েছিলাম। আমি প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম যে, পরিবারের সহায়তা ছাড়াই আমি স্বাবলম্বী হতে পারি।” হত্যার ঘটনা ও আলামত: হত্যাকাণ্ডের দু দিন আগে রেইহানা বাজার থেকে ছুরি কিনেছিলেন। তদন্তে এবং রেইহানার স্বীকারোক্তি থেকে তা বের হয়েছে। এছাড়া, হত্যার ঘটনা সম্পর্কে রেইহানা নিজেই যে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন তা হচ্ছে- ঘর সাজানোর কোনো কাজ ছিল না বরং তার সঙ্গে অবৈধ সম্পর্কের কারণেই সেখানে যাওয়া। আদালতে রেইহানার আইনজীবী বলেছিলেন, সারবান্দির ঘাড়ে ছুরি দিয়ে আঘাত করেছিলেন রেইহানা। কিন্তু ময়নাতদন্তে দেখা গেছে- ছুরি ঢুকেছে সারবান্দির ফুসফুসে এবং ছুরি ছিল ১০ ইঞ্চি লম্বা। দরজায় ছুরির একাধিক দাগ থাকারও কোনো চিহ্ন পাওয়া যায় নি। বরং দরজাতে একটি ভারী কিছু ছুঁড়ে মারার চিহ্ন পাওয়া গেছে। পরে তদন্তে জানা যায়- সারবান্দি সেদিন নামাজ শেষ করে রেইহানার সঙ্গে যৌনকর্মে লিপ্ত হওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। কিন্তু রেইহানার ছিল খুনের পরিকল্পনা। সারবান্দি নামাজ পড়তে শুরু করলে রেইহানা ছুরি দিয়ে মাত্র একটি আঘাত করেন। ছুরি মারার পর রেইহানা দ্রুত পালিয়ে যান। তখন সারাবান্দি চেয়ার ছুঁড়ে মারেন এবং তা গিয়ে লাগে দরজায়। রেইহানা নিজেও জানিয়েছেন, সে সময় দরজা বন্ধ ছিল না। তিনি ছুরি মেরে দ্রুত লিফটে করে নীচেই নামেন এবং লুকিয়ে থাকেন। আর সারবান্দি সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকেন। তবে মাত্র দুই তলা নামার পর সিঁড়িতেই মারা যান। পরে পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্স এলে রেইহানা ওই এলাকা থেকে একটি ট্যাক্সি নিয়ে বাড়িতে চলে যান। ওই রাতে তাকে পুলিশ আটক করে। পাঁচ তলা ভবনের লোকজনকে তদন্তের সময় জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তাদের কেউ কেউ বলেছেন যে, কোনো চীৎকার শোনেন নি বরং একটি শব্দ শুনেছেন। ধর্ষণের চেষ্টা হলে অনেক বেশি চেচামেচি হতো এবং প্রতিবেশিদের জানতে বাকি থাকত না। রায়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন নি কোনো বিচারপতি: এন্তেখাব নামে একটি পত্রিকা বিচারক হাসান থারদাস্তের সাক্ষাৎকার নেয়। গত ২৩ এপ্রিল থারদাস্তের এ সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়। পরে খবরঅনলাইন ডট কম ও ফারারু ডট কম নামে ইরানের দুটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল এ সাক্ষাৎকার প্রকাশ করে। অবশ্য তিনি তখন দায়িত্ব থেকে অবসরে গেছেন। সাক্ষাৎকারে বিচারক থারদাস্ত যথেষ্ট আস্থার সঙ্গেই জানান, ইরানের ইসলামি আইন মোতাবেক রেইহানার মামলায় যে রায় দেয়া হয়েছে তা নিয়ে আইনগত কোনো সংশয়ের কারণে নেই। রায়ের বিভিন্ন প্রসঙ্গে আলোচনার আগে তিনি জানান, তার নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ রেইহানার ফাঁসির রায় ঘোষণা করে। ২৪ পৃষ্ঠার এ রায় পরে সর্বোচ্চ আদালতের ১৩ জন বিচারপতি পুঙ্খানপুঙ্খ যাচাই বাছাই করেছেন। এরপর তারা সবাই রায়কে সঠিক বলে অনুমোদন করেন। লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো- একজন বিচারকও ওই রায়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেন নি। রায় প্রসঙ্গে থারদাস্ত আরো যা বলেন: রায় প্রসঙ্গে বিচারক থারদাস্ত বলেন, “এমন ভাবার অবকাশ নেই যে, সবাই ভুল করেছেন। তিনি এও বলেন, একজন সাধারণ মানুষ অনেক সময় আবেগতাড়িত হতে পারেন কিন্তু একজন বিচারক এ ধরনের আবেগতাড়িত হয়ে বা কোনোকিছু দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রায় দিতে পারেন না বা দেয়া উচিতও নয়।” তিনি আরো বলেন, রেইহানা আদালতে প্রমাণ করতে পারেন নি যে, তিনি খুন করেন নি। বরং খুনের ঘটনা নির্জলাভাবে প্রমাণিত হওয়ার পর ভিক্টিম পরিবার মাফ না করায় রেইহানাকে ফাঁসি থেকে বাঁচানো যায় নি। রায় হয়েছে ইসলামি আইন অনুসারে যাতে বলা হয়েছে- হত্যার বদলে হত্যা। এটা আপত দৃষ্টিতে কঠিন আইন মনে হলেও এর একটা কোমল দিক রয়েছে সেটা হচ্ছে ভিক্টিম পরিবার ইচ্ছে করলে মাফ করে দিতে পারে; তখন আদালত ইচ্ছে করলেও ফাঁসি দিতে পারে না। এছাড়া, রেইহানার ফাঁসির রায় নিয়ে যেহেতু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নানা বাদ-প্রতিবাদ হচ্ছিল সে কারণে তাকে বাঁচানো যায় কিনা সেই চেষ্টায় তার ফাঁসির তারিখ অন্তত দুইবার পেছানো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ভিক্টিম পরিবার মাফ না করায় তা ঠেকানো যায় নি। সত্য স্বীকার করলে কি মাফ পেতেন রেইহানা?: সাক্ষাৎকার নেয়ার সময় বিচারক থারদাস্তকে সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন- সত্য স্বীকার করলে কি রেইহানা নিহত সারবান্দির পরিবারের পক্ষ থেকে মাফ পেতেন? এর জবাবে বিচারক থারদাস্ত জানান, রাজনীতিমনস্ক উকিলদের শিখিয়ে দেয়া কথার পরিবর্তে যদি রেইহানা সততা দেখাতেন এবং যদি বলতেন-আমি মারাত্মক মানসিক চাপে পড়ে ভুল করে ফেলেছি এবং আমি এ জন্য অনুতপ্ত; আমি ক্ষমাপ্রার্থী তাহলে রেইহানা ভিক্টিম পরিবারের কাছ থেকে ক্ষমা পেতে পারতেন। বিচারক থারদাস্ত জানান, এমনি করে সত্য স্বীকার করে বহু মামলার আসামী বহু পরিবার থেকে ক্ষমা পেয়েছেন। আলাপ প্রসঙ্গে রেইহানার মানসিক দৃঢ়তা নিয়েও কথা বলেন বিচারক থারদাস্ত। সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, রেইহানা এতটাই শক্ত মনের অধিকারী ছিলেন যে, নিজ বাবাকেও হত্যার কথা ভাবাটা তার জন্য অস্বাভাবিক ছিল না। তার প্রমাণ হলো- আরো এক যুবকের সঙ্গে রেইহানার অবৈধ সম্পর্ক ছিল যার নাম মামলার নথিভুক্ত রয়েছে- তার সঙ্গে এসএমএস এ বাবা সম্পর্কে খুবই নোংরা ও অবমাননাকর কথাবার্তা বলেছেন। ওই যুবককে এক এসএমএস-এ রেইহানা বলেছিলেন, আমার বাবা সবসময় মাতলামি করে এবং আমাকে মারে। বাবাকেও হত্যা করার কথা বলেছে এসএমএস-এ। মাকে লেখা চিঠিতে রেইহানা বলেছেন, “মা তুমি তো জান যে, আমি কখনো একটা তেলাপোকাও মারি নি বরং তেলাপোকার শুঁড় ধরে জানালা দিয়ে ফেলে দিয়েছি।” বিচারক বলেন, রেইহানার চিঠি থেকে বরং এক ধরনের পুরুষালি ভাব ফুটে উঠেছে। তেলাপোকা মারার চেয়ে তার শুঁড় ধরে ফেলে দেয়াটা শক্ত কাজই বটে! এছাড়া, তাকে মনোবিজ্ঞানী দিয়ে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার পর ওই মিনোবিজ্ঞানী রিপোর্ট দিয়েছেন যে, রেইহানার মধ্যে কোনো উন্মাদনা ছিল না বরং খুবই ঠাণ্ডা মাথার মানুষ। খুন করার পর বেশ স্বাভাবিকভাবে ওই স্থান থেকে চলে গেছে। এছাড়া, খুনের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের সময় প্রথম দফায় কিছু বলেন নি। আর কথা বলার সময় খুব সহজ ও রিল্যাক্স মুডে কথা বলতেন। রেইহানাকে বাঁচাতে বিচারকের প্রচেষ্টা: অনলাইন পত্রিকাকে দেয়া সাক্ষাৎকারে বিচারক থারদাস্ত নিজেই বলেছেন, রেইহানার ফাঁসির রায় ঘোষণার পর তিনি নিজেও ভিক্টিম পরিবারকে বুঝিয়ে রেইহানাকে মাফ করে দেয়ার জন্য রাজি করাতে চেষ্টা করেছেন। থারদাস্ত নিহতের ছেলেকে বলেছিলেন যে, যেহেতু তোমার বাবা এই মেয়ের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে পাপ করেছেন সে কারণে এই গরিব মেয়েকে মাফ করে দাও। কিন্তু তারা বলেছে, ‘প্রথমত এই নারী আদৌ কৃতজ্ঞ নন; দ্বিতীয়ত তিনি সত্যের পরিবর্তে বলেছেন আমার বাবা ধর্ষক।’ বিচারক থারদাস্ত জানান, রেইহানার ফাঁসি এবং বিচারের রায় নিয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যম ও তাদের প্রভাবিত মিডিয়া প্রচারণা চালিয়েছে এবং তাতে নিহত সারবান্দিকে ধর্ষক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চলেছে। এতে ওই পরিবারের মান-সম্মানের প্রশ্ন এসেছে এবং এক পর্যায়ে তারা সত্য প্রকাশের বিষয়ে শক্ত অবস্থানে চলে যায়। ফলে তারা অর্থ নিয়ে আর রেইহানাকে মাফ করতে চান নি। বিচারক থারদাস্ত বলেন, গণমাধ্যমের প্রচারণা ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিষয়টি তিক্ত করার জন্য ভিক্টিম পরিবারের সহানভূতি পাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়। এ সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় বিচারক থারদাস্ত জানিয়েছিলেন, তিনি নিজে অবসর নিলেও ভিক্টিম পরিবারকে বুঝিয়ে রাজি করানোর চেষ্টা চালাতে প্রস্তুত রয়েছেন। তাহলে কেন এই প্রচারণা: রেইহানার ফাঁসির ঘটনা নিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে কেন এই প্রচারণা- এ প্রশ্নের জবাব সহজেই মিলে যাবে কিছু ঘটনার দিকে নজর দিলে। প্রথমেই দেখা যাক কারা এই প্রতিবাদে শামিল হয়েছে? তারা আর কেউ নয়; নিতান্তই ইরান-বিরোধী একটি গোষ্ঠী। রেইহানার ফাঁসির বিরুদ্ধে জার্মানিতে ইরান দূতাবাসের সামনে একদল নারী পরণের বস্ত্র খুলে নোংরাভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছে। রেইহানার পাশে দাঁড়িয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর, বিবিসি, সিএনএন, ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকা এবং অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের ইহুদি লবি ও পশ্চিমা প্রভাবিত গণমাধ্যম। আর এদের এই রায়কে কেন্দ্র করে এত প্রচারণা চালানোর মূল কারণ হলো ইরান-বিরোধিতা। ইরানে ইসলামি বিপ্লব হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য ও সারাবিশ্বে আমেরিকা এবং তার মিত্রদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিকসহ নানা ধরনের সুবিধা বিনষ্ট হয়েছে। নানাভাবে এবং বার বার চেষ্টা ষড়যন্ত্র করার পরও ইরানকে কব্জা করা যায় নি; ইরানের ইসলামি বিপ্লব নস্যাৎ করা য়ায় নি। শুধু তাই নয়, ইরানে মার্কিন দূতাবাস দখল করে নেয়া এবং ইসরাইলের দূতাবাস পুড়িয়ে ছাই করে দেয়ার ঘটনা পর্যন্ত ঘটেছে যা দুনিয়ায় অনেকটা নজিরবিহীন। আমেরিকা ও তার মিত্ররা এসব অপমান আজও ভুলতে পারে নি। অন্যদিকে ইরানের নানা ক্ষেত্রে বিরাট সাফল্য এবং এগিয়ে যাওয়া তাদের চক্ষুশূল হয়েছে। এসব কারণে চুন থেকে পান খসলেই তারা ইরানকে বেকায়দায় ফেলতে চায়। এ ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ হচ্ছে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। তবে মজার বিষয়, পুরুষের মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্নে এতটা শোরগোল শোনা যাবে না যতটা শোনা যাবে নারীর ক্ষেত্রে। অথচ নারী অপেক্ষা পুরুষের মৃত্যুদণ্ডের মাত্রা শতকরা ৯৮ ভাগ বেশি। লেখক: সিরাজুল ইসলাম, রেডিও তেহরান, বাংলা বিভাগ

Monday, May 28, 2012

পারস্য উপসাগরের নাম পরিবর্তনের চেষ্টা : মধ্যপ্রাচ্যে বিভেদ সৃষ্টির ষড়যন্ত্র

দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়ায় অবস্থিত পারস্য উপসাগর হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীনতম সভ্যতাগুলোর একটির লালনক্ষেত্র। মানবজাতির লিখিত ইতিহাসের প্রথম থেকেই বিশ্বের চারটি সনাক্তকৃত সাগরের মধ্যে পারস্য উপসাগর ছিল অন্যতম। কিন্তু বর্তমানে কয়েকটি পশ্চিমা দেশের ইন্ধনে আরব দেশগুলোর বই-পুস্তক এবং সংবাদ ও প্রতিবেদন থেকে পারস্য উপসাগরের নাম মুছে ফেলা হয়েছে। পাশ্চাত্যের গণমাধ্যমেও পারস্য উপসাগরের পরিবর্তে ‘আরব উপসাগর’ নামটি চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে সম্প্রতি এক প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, "এ উপসাগরের নাম থেকে 'পারস্য' শব্দটি উঠিয়ে দেয়ার অর্থ হচ্ছে ইরানি জনগণের আবেগ-অনুভূতি নিয়ে খেলা করা। এ ছাড়া, এর ফলে একটি ঐতিহাসিক বাস্তবতাকেও অস্বীকার করা হচ্ছে।" এ নিবন্ধে আমরা পারস্য উপসাগরে নিয়ে ইরান ও কয়েকটি আরব দেশের দ্বন্দ্ব এবং এর প্রভাব নিয়ে আলোচনার প্রয়াস পাবো। পারস্য উপসাগরের অবস্থান পারস্য উপসাগর দক্ষিণ পশ্চিম এশিয়ায় অবস্থিত। এ উপসাগরটির সুবিস্তৃত উত্তরাঞ্চলীয় উপকূল ইরানের অংশ। এর পশ্চিমে রয়েছে ইরাক ও কুয়েত, দক্ষিণে রয়েছে সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। পারস্য উপসাগরের মোট আয়তন দুই লাখ ৪০ হাজার বর্গকিলোমিটার। এ উপসাগর লম্বায় ৯০০ কিলোমিটার এবং চওড়ায় প্রায় ২৪০ কিলোমিটার। ইরান সংলগ্ন পারস্য উপসাগরীয় উপকূলের দৈর্ঘ্য ৮০০ কিলোমিটার। পারস্য উপসাগরের গভীরতা কম এবং সাধারণত: তা ৫০ মিটার, আর সর্বোচ্চ গভীরতা প্রায় ১০০ মিটার। পারস্য উপসাগর হরমুজ-প্রণালীর মাধ্যমে ওমান সাগর ও মুক্ত মহাসাগরের সাথে যুক্ত হয়েছে। ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব পারস্য উপসাগরের প্রাকৃতিক প্রতিবেশ অত্যন্ত সমৃদ্ধশালী। বর্তমানে বিশ্ব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও পারস্য উপসাগর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর কারণ হচ্ছে- পারস্য উপসাগর বিশ্বের অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ জলপথ। এ উপসাগর কৌশলগত দিক থেকেও বিশ্বের অত্যন্ত স্পর্শকাতর অঞ্চলে অবস্থিত হওয়ায় পরাশক্তিগুলো সব সময়ই এ জলপথে তাদের উপস্থিতি জোরদারের প্রচেষ্টা চালিয়ে এসেছে। খার্গ, আবু মুসা, বড় তুন্ব, ছোট তুন্ব, কিশ, কেশম ও লাভান পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ। পারস্য উপসাগরের গুরুত্বের কারণেই এখানকার হরমুজ-প্রণালী বিশ্বের অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ প্রণালী হিসেবে বিবেচিত হয়। এ প্রণালী লম্বায় ১৫৮ কিলোমিটার এবং চওড়ায় ৫৬ থেকে ১৮০ কিলোমিটার। আন্তর্জাতিক নৌ-পরিবহনের সংখ্যার দিক থেকে হরমুজ প্রণালীর স্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। প্রতিদিন প্রায় এক কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল বয়ে নিয়ে যাওয়া হয় এ প্রণালী দিয়ে। বিশ্বের অপরিশোধিত জ্বালানি তেলবাহী তেল ট্যাংকারগুলোর শতকরা ৪০ ভাগ যাতায়াত করে এ সাগর দিয়ে এবং এ জলপথ দিয়েই রপ্তানি করা হয় বিশ্ববাজারের শতকরা প্রায় ২৫ ভাগ জ্বালানি তেল। পারস্য উপসাগরের ব্যাপক গুরুত্ব তুলে ধরার জন্য এটাই জানা যথেষ্ট যে, বিশ্বে এ পর্যন্ত আবিস্কৃত জ্বালানি তেল ও গ্যাসের শতকরা প্রায় ৬৮ ভাগই রয়েছে এ উপসাগরের নিচে ও আশপাশের দেশগুলোতে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বের বহু দেশের বা অঞ্চলের গুরুত্ব কমে গেলেও পারস্য উপসাগরের গুরুত্ব আগের চেয়েও বেড়েছে। বিশ্ব-অর্থনীতির মূল প্রাণ-প্রবাহ হল এই উপসাগর। নাম পরিবর্তনের নীলনকশা
পারস্য উপসাগরের নাম পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রের সূচনা হয়েছে ব্রিটিশদের মাধ্যমে। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের ব্রিটিশ রাজনৈতিক প্রতিনিধি রুড্রিক ওয়েন সর্ব প্রথম তার ‘পারস্য উপসাগরে স্বর্ণালী বুদবুদ' নামক বইয়ে পারস্য উপসাগরকে ‘আরব উপসাগর’ হিসেবে অভিহিত করার প্রস্তাব করেছিলেন। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে তিন দশক ধরে ব্রিটিশ কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর তিনি স্বদেশে ফিরে ১৯৬৬ সালে পারস্য উপসাগরীয় দক্ষিণ উপকূল সম্পর্কে একটি বই লেখেন। তিনি এ বইয়ে ভুয়া ও মিথ্যা নাম ‘আরব উপসাগর’ শব্দটি ব্যবহার করেন। বেলগ্রেভ পারস্য উপসাগরীয় দক্ষিণ উপকূলকে ‘চোরদের উপকূল’ বলে উল্লেখ করেন এবং দাবি করেন যে, আরবরা পারস্য উপসাগরকে ‘আরব উপসাগর’ বলতে আগ্রহী। আর এ বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই আরব পত্র-পত্রিকায় পারস্য উপসাগরকে ‘আরব উপসাগর’ লেখা শুরু হয়। এর কয়েক বছর পর মধ্যপ্রাচ্যে অপর ব্রিটিশ প্রতিনিধি চার্লস বেলগ্রেভ তার বইয়ে একই বিষয়ের অবতারণা করেন। আর এভাবেই পারস্য উপসাগরের নাম পরিবর্তনের অপচেষ্টা শুরু হয়। আরও কিছুদিন পর পারস্য উপসাগরের দক্ষিণাঞ্চলের আরব দেশগুলোর সরকারি লেখালেখিতেও ‘আরব উপসাগর’ লেখা হতে থাকে। ২০০৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সাময়িকী ন্যাশনাল জিওগ্রাফি সবাইকে বিস্মিত করে পারস্য উপসাগরকে ‘আরব উপসাগর’ হিসেবে উল্লেখ করে। এটা সবার কাছেই স্পষ্ট ছিল যে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এই কাজটি করা হয়েছে। এরপর হাজার হাজার ইরানী ন্যাশনাল জিওগ্রাফি পত্রিকার এই পদক্ষেপের তীব্র প্রতিবাদ জানায়। প্রতিবাদের মুখে পত্রিকাটি ‘আরব উপসাগর’ নামটি বাদ দেয় এবং ‘পারস্য উপসাগর’ নামটিকে ব্যবহার করে। এখানে উল্লেখ্য যে, জাতিসংঘ গত বছর পুণরায় ‘পারস্য উপসাগর’ নামটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। পারস্য উপসাগরের পক্ষে ঐতিহাসিক দলিল-প্রমাণ মানবজাতির লিখিত ইতিহাসের প্রথম থেকেই বিশ্বের চারটি সনাক্তকৃত সাগরের মধ্যে পারস্য উপসাগর ছিল অন্যতম। গ্রীকরা মনে করত এ চারটি সাগরই উৎসারিত হয়েছে একটি মহাসাগর থেকে যে মহাসাগর বিশ্বের সব জলভাগের সমমাত্রায় বিস্তৃত। তাই এটা স্পষ্ট যে ইরানের প্রাচীন হাখামানেশীয় সম্রাট দারিুয়ুশের শিলালিপিতে "পার্স বা পারস্য সাগর" হিসেবে উল্লেখিত হওয়ার বহু বছর আগেই অ-ইরানি জনগোষ্ঠীও এই বিস্তৃত জলভাগকে পার্স নামেই চিনত। এ উপসাগরের নাম এত প্রাচীন যে অনেকে মনে করেন, পারস্য উপসাগরই মানব সভ্যতার উৎস বা লালনভূমি। এ অঞ্চলের প্রাচীন বাসিন্দারাই প্রথম জাহাজ তৈরি করেছিল। এসব জাহাজে চড়ে তারা অন্যান্য দেশে যেত। খ্রিস্টের জন্মের ৫০০ বছর আগে সম্রাট প্রথম দারিউশের শাসনামলে ইরানি নাবিকরা তাদের নৌ-অভিযান শুরু করেছিল। জেনোফেন, Ktzyas, স্ট্রাবন ও হেরোডটাসের মত খ্রিস্টপূর্ব যুগের গ্রিক ভূগোলবিদ ও ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী গ্রিকরাই প্রথম এই সাগরকে পার্স সাগর ও ইরানকে পার্স, পার্সি, পার্সিপলিস নাম দিয়েছিল। গ্রিক ভাষায় পার্সিপলিস শব্দটির অর্থ হল পারসিকদের দেশ বা বাসস্থান। দিগ্বিজয়ী সম্রাট আলেক্সান্ডারের জেনারেল Nyarkhus খ্রিস্টপূর্ব ৩২৬ সালে তার সম্রাটের নির্দেশে সিন্ধু নদ পার হয়ে মুকরান সাগর বা ওমান সাগর ও পারস্য উপসাগর জাহাজ বা নৌকাযোগে পার হয়েছিলেন। তিনি এর মোহনা পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিলেন। ভূগোল শাস্ত্রের জনক নামে পরিচিত প্রাচীন গ্রিক ভূগোলবিদ Hecataeus খ্রিস্টপূর্ব ৪৭৫ সালে পারস্য সাগর শব্দটি ব্যবহার করেছেন। জেনোফেন ও হেরোডটাসের মতে প্রাচীন মানচিত্রগুলোতে এই সাগরকে পারস্য সাগরই বলা হত। খ্রিস্টিয় দ্বিতীয় শতকের ভূগোল ও গণিতবিদ টলেমি "বিশ্বের ভূগোল" শীর্ষক ল্যাটিন ভাষার বইয়ে অঙ্কিত মানচিত্রে পারস্য উপসাগরকে "পার্সিকুস সিনুস" বলে উল্লেখ করেছেন। খ্রিস্টিয় প্রথম শতকের রোমান ইতিহাসবিদ Kevin Tus Kurvsyus Rufus এই সাগরকে পারস্য সাগর বা পারস্য জলাধার বলে উল্লেখ করেছেন। ল্যাটিন ভাষায় লিখিত ভূগোলের প্রাচীন বইগুলোতে দক্ষিণ ইরানের জলরাশি তথা মাকরান সাগর ও পারস্য উপসাগরকে "মারেহ পার্সিকুম" বা পারস্য সাগর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইংরেজি, জার্মান, মার্কিন, ফরাসি ও তুর্কি ভাষাসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় লিখিত অভিধানগুলোতেও পারস্য উপসাগর শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। আরবী ভাষায় সবচেয়ে বিখ্যাত বিশ্বকোষ নামে খ্যাত " আলমুঞ্জেদ"ও এই সাগরকে পারস্য উপসাগর বলে উল্লেখ করেছে। ইবনে বতুতা, আবু রেইহান বিরুনি, হামাদুল্লাহ মাস্তুফি, ইয়াকুত হেমাভি ও নাসের খসরু কাবাদিয়ানিসহ প্রমুখ ঐতিহাসিক ও চিন্তাবিদও তাদের লেখায় এই উপসাগরকে পারস্য উপসাগর হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পশ্চিমা উপনিবেশবাদীরা পারস্য উপসাগর ও ভারত উপমহাদেশে আসার পরও মানচিত্র, চিঠিপত্র ও বইয়ে এই জলপথকে পারস্য উপসাগর অথবা পারস্য সাগর হিসেবে উল্লেখ করেছে। পর্তুগাল, স্পেন, ফ্রান্স ও বৃটেনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ তাদের রাষ্ট্রীয় চুক্তিনামা ও চিঠিপত্রে সব সময় পারস্য উপসাগর নামটিই উল্লেখ করতো। ১৯৬১ সালে স্বাক্ষরিত কুয়েতের স্বাধীনতা সনদেও স্পষ্টাক্ষরে পারস্য উপসাগর নামটি স্থান পেয়েছে। বর্তমানে ইরানে পারস্য উপসাগর ও এর নাম নিয়ে ৫০টিরও বেশি বই প্রকাশিত হয়েছে। ‘ঐতিহাসিক মানচিত্রগুলোতে পারস্য উপসাগর' শীর্ষক বইতে বিশ্বের সর্বজন গ্রহণযোগ্য ও বিখ্যাত ১৬০টি মানচিত্রকে প্রামাণ্য দলিল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে স্পষ্টাক্ষরে এই উপসাগরের নাম পারস্য উপসাগর বা পার্সিয়ান গালফ লেখা রয়েছে। এতসব দলিল প্রমাণ সত্ত্বেও পারস্য উপসাগরের নাম পরিবর্তনের প্রচেষ্টাকে বিদ্বেষপ্রসূত এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন একটি পদক্ষেপ বলেই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। পারস্য উপসাগরের পক্ষে ইরানের প্রচারণা পারস্য উপসাগরের নাম পরিবর্তন নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হওয়ার পর থেকেই ইরানের সরকার ও জনগণ সোচ্চার হয়ে উঠে। ইরানিদের অব্যাহত প্রতিবাদের মুখে ১৯৯৪ সালের ১৮ আগস্ট জাতিসংঘ সচিবালয় ‘উপসাগর’ লেখার পরিবর্তে ‘পারস্য উপসাগর’ লেখার জন্য সংস্থার সংশ্লিষ্ট কর্মীদের উপদেশ দেন। কিন্তু এরপরও পারস্য উপসাগরের নাম পরিবর্তনের অপচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। এ অবস্থায় ইরান সরকার ফার্সি দশই উর্দি বেহেশত মোতাবেক ৩০শে এপ্রিলকে জাতীয় পারস্য উপসাগর দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত বছর এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পারস্য উপসাগরকে ইরানের জাতীয় নিদর্শন হিসেবে নিবন্ধন করা হয়েছে। পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানি দ্বীপ কিশে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে উপসাগরটিকে জাতীয় নিদর্শন হিসেবে নিবন্ধিত করা হয়। ইরানের প্রেসিডেন্ট ড: মাহমুদ আহমাদিনেজাদ ঐ অনুষ্ঠানে পারস্য উপসাগরকে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের অঙ্গন হিসেবে অভিহিত করেছেন। পারস্য উপসাগরের ৮ খন্ড বিশিষ্ট সনদ সঙ্কলনের কাজও শুরু করা হয়েছে। গুগলের বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি পারস্য উপসাগরের নাম পরিবর্তন করে ভিন্ন শব্দ ব্যবহার অব্যাহত রাখলে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারনেট সার্চ ইঞ্জিন গুগলের বিরুদ্ধে মামলা করা হবে বলে হুমকি দিয়েছে ইরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রমিন মেহমানপারাস্ত গত ১৭ মে তেহরানে সাংবাদিকদের বলেছেন, "ইরানের শত্রুরা তেহরানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করছে এবং এ কাজে গুগলকে খেলার সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।" তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, "পারস্য উপসাগরের প্রকৃত নামের পরিবর্তে অন্য কোন নাম ব্যবহার করলে গুগল মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে।" গুগলের অনলাইন মানচিত্রে এতদিন ইরান ও আরব উপদ্বীপের মধ্যবর্তী জলরাশিকে 'পারস্য উপসাগর' হিসেবে চিহ্নিত করা ছিল। কিন্তু সম্প্রতি এ নাম থেকে ‘পারস্য' শব্দটি বাদ দেয়া হয়েছে। পারস্য উপসাগর না আরব উপসাগর? পারস্য উপসাগরের নাম পরিবর্তন নিয়ে ইরান ও আরব দেশগুলোর মধ্যে যখন দ্বন্দ্ব চলছে ঠিক তখন ইন্টারনেটে চলছে ভোটাভুটি। http://www.persianorarabiangulf.com নামের ওয়েবসাইটে এ পর্যন্ত ৫১ লাখ ৩৯ হাজার ৪১৩টি ভোট পড়েছে। ভোটের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে পারস্য উপসাগরের পক্ষে পড়েছে ৬১.১ শতাংশ ভোট আর আরব উপসাগরের পক্ষে পড়েছে ৩৮.৮ ভাগ ভোট। অর্থাৎ এখানেও পারস্য উপসাগর নাম রাখার পক্ষেই বেশ ভোট পড়ে। ‘বিভেদ সৃষ্টিই মূল লক্ষ্য’ পারস্য উপসাগরের নাম পরিবর্তনের ষড়যন্ত্রের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের প্রেসিডেন্ট ড. মাহমুদ আহমাদিনেজাদ বলেছেন, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অধিকাংশ দেশ যেসব সমস্যার মোকাবেলা করছে, তার পেছনে রয়েছে বিজাতীয়দের হস্তক্ষেপ,যারা গোটা অঞ্চলে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বহু দূর থেকে এখানে এসেছে। ইরানি প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের সূত্র ধরে বলতে হয়, পারস্য উপসাগরের নাম পরিবর্তনের অপচেষ্টাও বিজাতীয়দের এ ধরনেরই একটি হস্তক্ষেপ এবং এর উদ্দেশ্য হলো, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে বিবাদ সৃষ্টি এবং ঐক্যের সুযোগকে সংকীর্ণ করা। #

Monday, April 23, 2012

পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ইরান-পাশ্চাত্য দ্বন্দ্ব ও তেহরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পর থেকে পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে তেহরানের সঙ্গে পাশ্চাত্যের দ্বন্দ্ব শুরু হয়। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, বিপ্লবের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পাশ্চাত্যের কয়েকটি দেশ ইরানে পরমাণু চুল্লি নির্মাণে সহযোগিতা করেছিল। ১৯৫৬ সালে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি পরমাণু গবেষণাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ গবেষণা কেন্দ্রের কাজ এগিয়ে নেয়ার জন্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র সে বছরই একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর ১১ বছর পর যুক্তরাষ্ট্র তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ে ৫ মেগাওয়াট শক্তি সম্পন্ন একটি ছোটখাট পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণ করে। ১৯৭১ সালে ইরানের শাহ সরকার পাশ্চাত্যের কয়েকটি দেশের সঙ্গে পরমাণু বিষয়ে বেশ ক’টি চুক্তি স্বাক্ষর করে। ইরানের বুশেহরে পারমাণবিক চুল্লি নির্মাণের জন্য জার্মানির সঙ্গে চুক্তি, দারখুইনে আরেকটি পরমাণু চুল্লি নির্মাণের জন্য ফ্রান্সের সঙ্গে চুক্তি, পারমাণবিক চুল্লিগুলোর জন্যে জ্বালানি সরবরাহ করতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি এবং অর্ডিফ কোম্পানির শেয়ার কেনার ঘটনা ছিল এগুলোর মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু, ১৯৭৯ সালে ইরানে শাহ সরকারের পতনের পর পশ্চিমা সরকার ও পশ্চিমা কোম্পানিগুলো পরমাণু বিষয়ে ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়। শুধু তাই নয়, ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য গত তেত্রিশ বছরে মার্কিন সরকার ইরানের ওপর ৩৩ বার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ওপর প্রভাব খাটিয়ে মার্কিন সরকার তাদের কোনো কোনো একতরফা নিষেধাজ্ঞাকে আন্তর্জাতিক রূপ দিতেও সক্ষম হয়েছে। সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা: পাশ্চাত্যের হুমকি, চাপ ও অবরোধ সত্ত্বেও ইরান তার শান্তিপূর্ণ বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচি অব্যাহত রাখায় মার্কিন সরকার এবং তার ইউরোপীয় মিত্ররা সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কঠোর করেছে। শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচি বন্ধে ইরানকে বাধ্য করার জন্যই তারা এ পদক্ষেপ নেয়। পাশ্চাত্য ও মার্কিন সরকার দাবি করছে যে, ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে। অথচ, ইরান পরমাণু অস্ত্র অর্জনকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে নিষিদ্ধ বলে মনে করে এবং রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকেও পরমাণু অস্ত্রকে ক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো উপায় বলে মনে করে না। ইরানের পরমাণু তৎপরতা যে শান্তিপূর্ণ তা স্পষ্ট করার জন্য দেশটির সরকার তার সমস্ত পরমাণু স্থাপনায় নজরদারি করার সুযোগ দিয়েছে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা বা আইএইএ-কে। তাছাড়া, ইরান পরমাণু অস্ত্র-বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটি-তে স্বাক্ষরকারী অন্যতম দেশ। তেহরান এ পর্যন্ত কখনও ওই চুক্তির কোনো ধারা লঙ্ঘন করেনি। কিন্তু, তা সত্ত্বেও মার্কিন সরকার জাতিসংঘের পরমাণু তদারকি সংস্থা বা আইএইএ’র মধ্যে নিজের প্রভাব খাটিয়ে এবং কিছু বানোয়াট দলিল-প্রমাণ দেখিয়ে ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে সামরিক বলে দাবি করে। আর এ ধরনের প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে মার্কিন সরকার ও তার মিত্ররা ইরানের পরমাণু প্রসঙ্গটিকে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে পাঠাতে সক্ষম হয়। ব্রিটেন, ফ্রান্স ও মার্কিন সরকার এ পরিষদে ইরানের বিরুদ্ধে কয়েকটি প্রস্তাব পাস করে এবং তেহরানের ওপর চাপিয়ে দেয় বেশ কিছু অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা। জ্বালানি তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা : পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানের পরমাণু তৎপরতাকে বন্ধ তো করতে পারেইনি বরং দেশটি আরও দৃঢ়তার সঙ্গে পরমাণু কর্মসূচি জোরদার করে। এ অবস্থায় পশ্চিমা কয়েকটি দেশ জাতিসংঘের মাধ্যমে ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা করলেও নিরাপত্তা পরিষদের অন্য সদস্য দেশগুলোর সাড়া পেতে ব্যর্থ হয়। জাতিসংঘকে দিয়ে নতুন ও আরো কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে ব্যর্থ হওয়ার পর মার্কিন সরকার এবং ইউরোপীয় জোট তেহরানের ওপর একতরফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পাশ্চাত্য এটা জানে যে, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রে ইরানের সবচেয়ে বড় উৎসটি হলো জ্বালানি তেল এবং দেশটির বাণিজ্য লেনদেনে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ফলে, ইরানের জ্বালানি তেল ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা ঘোষণা করে মার্কিন নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্য। তারা ভেবেছিল এবারের এই নিষেধাজ্ঞার প্রবল চাপে ইরান কাহিল হয়ে পড়বে এবং পাশ্চাত্যের অন্যায় আব্দার মেনে নিয়ে তেহরান শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করবে। কিন্তু, বাস্তবে ঘটেছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত ঘটনা। নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়া : ইরানের জ্বালানি তেলের ওপর ইউরোপের নিষেধাজ্ঞা আরোপের আশঙ্কা ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই বিশ্ব বাজারে তেলের দর বাড়তে থাকে; বিশেষ করে ইউরোপের কয়েকটি দেশে জ্বালানি তেলের দাম নজিরবিহীন মাত্রায় বেড়ে যায়। এ অবস্থায় ইউরোপের আটটি দেশের ৬৯ শতাংশ মানুষ ইরানের তেল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিরোধিতা করেছে। জার্মানির মার্শাল ফান্ড পরিচালিত জনমত জরিপে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, অস্ট্রিয়া, স্পেন, পোল্যান্ড ও সুইডেনের তিন হাজারের বেশি মানুষের ওপর ওই জরিপ পরিচালিত হয়। ২৪ মার্চ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলা হয়- ইরানের ওপর অবরোধ আরোপের ফলে বিশ্বমন্দা দেখা দিতে পারে। ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে- ইরানের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা অবরোধ আরোপের ফলে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার যে প্রবণতা দেখা দিয়েছে তাতে বিশ্বমন্দার ঝুঁকি বাড়ছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে- অবরোধের কারণে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করা সম্ভব হবে না এবং এতে শুধুমাত্র তেলের দামই বাড়বে। এ প্রতিবেদনের সমর্থনে মার্কিন অর্থমন্ত্রী টিমথি গেইথনারের একটি মন্তব্য এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। গত ৫ এপ্রিল তিনি মার্কিন সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে অব্যাহত উত্তেজনা এবং জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি মার্কিন অর্থনীতির জন্য ‘বড় হুমকি’ হয়ে উঠেছে। তার এ মন্তব্যের পাঁচ দিন পর ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট দিলমা রউসেফ হোয়াইট হাউজে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে সাক্ষাতের সময় বলেছেন, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য হুমকি হয় উঠতে পারে। তিনি বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা এবং জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি পেতে পারে; এর ফলে বিশ্ব অর্থনীতির মন্দা কাটিয়ে ওঠার যে চেষ্টা চলছে তা হুমকির মুখে পড়বে। পাশ্চাত্যের পিছু হটা : ইউরোপ নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা ঘোষণা করলেও তা জুলাই মাসে কার্যকর করবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু, নিষেধাজ্ঞার কারণে তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি ইউরোপের দুর্দশাগ্রস্ত অর্থনীতির সংকট আরো মারাত্মক হয়ে ওঠে এবং ইউরোপীয় জনগণের মধ্যে সরকারবিরোধী ক্ষোভ আরো চাঙ্গা হয়। এ অবস্থায় মার্কিন সরকার ইউরোপের ১০টি দেশের জন্য ইরানের তেল বয়কট করা বাধ্যতামূলক নয় বলে ঘোষণা দেয়। কিন্তু, ইরান পাশ্চাত্যকে শিক্ষা দেয়ার জন্য আগে-ভাগেই ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে তেল রফতানি বন্ধ করে দেয়। ইউরোপে ইরানের তেলের ক্রমবর্ধমান চাহিদা থাকা সত্ত্বেও তেল সরবরাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং অন্য কোনো দেশ ইরানের জ্বালানি তেলের বিকল্প হতে ব্যর্থ হওয়ায় ইউরোপ নিজের সৃষ্ট সংকটের শাস্তি নিজেই ভোগ করতে বাধ্য হয়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য গত ২০ এপ্রিল ইউরোপীয় জোটের একজন সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন, এই জোট ইরানের জ্বালানি তেল শিল্পের ওপর নিষেধাজ্ঞা আগামী দু’মাসের মধ্যে তুলে নিতে পারে। ইরানের তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করা যে সম্ভব হবে না, এ ঘোষণার মাধ্যমে বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস সত্যি বলে প্রমাণিত হয়েছে। অবরোধ যখন আশীর্বাদ : পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ আরোপের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী (রহ.) ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে ঘোষণা দিয়েছিলেন- "ওরা যদি আমাদের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তাহলে আমরা আরো সক্রিয় হব, এটা আমাদের জন্যই লাভজনক। ওরা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করুক, আপনারা এতে মোটেও ভয় পাবেন না।" তিনি আরো বলেছিলেন, "আমরা এখন থেকে বিজাতীয়দের আমাদের দেশে আসার ও মোড়লীপনা করার সুযোগ দেব না। এ দেশে তো আমরা নিজেরাই রয়েছি। তাদের যত ইচ্ছে আমাদের ওপর চাপ দিয়ে যাক এবং অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপের জন্য ষড়যন্ত্র করুক। আমরা এসবের পরোয়া করি না।" মরহুম ইমাম প্রখ্যাত মিশরীয় সাংবাদিক হাসনাইন হাইকালকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ওইসব মন্তব্য করেছিলেন। ইরানের ইসলামী সরকার ইমামের ওই দিক-নির্দেশনা মেনে নিয়ে পাশ্চাত্যের সব ধরনের চাপ মোকাবেলার পথ বেছে নেয় এবং এর ফলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পরনির্ভরতার পরিবর্তে স্বাধীনতা ও স্বনির্ভরতার পথ খুলে যায়। পশ্চিমা সরকারগুলো আশা করেছিল- নিষেধাজ্ঞার কারণে হতাশ হয়ে ইরানের জনগণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘ন্যায়কামিতার প্রতি সমর্থন ও জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম’ বন্ধ করে দেবে। কিন্তু, পশ্চিমাদের সে আশা বার বারই ভঙ্গ হয়েছে এমনকি নিষেধাজ্ঞা তাদের জন্যে বুমেরাং হয়েছে। ওবামার গোপন চিঠি : ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা পাশ্চাত্যের জন্য বুমেরাং হয়ে দেখা দেয়ায় এখন পাশ্চাত্য তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে শুরু করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার উদ্ধৃতি দিয়ে দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্ট খবর দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচি মেনে নেবে, তবে ইরানকে এটা প্রমাণ করতে হবে যে,তারা পরমাণু অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করছে না। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর কাছে পাঠানো এক বার্তায় ওবামা এসব কথা বলেছেন। খবরে আরো বলা হয়, সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গে তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী রজব তাইয়্যেব এরদোগানের সাক্ষাত হয়। সেখানে তারা ইরানরে পরমাণু কর্মসূচি ও সিরিয়ার চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। সিউল থেকে ফিরে এরদোগান তেহরান সফরে যান। তেহরানে আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীকে বারাক ওবামার ওই গোপন বার্তা পৌঁছে দেন এরদোগান। বার্তাটি অনেকটা এ রকম-কেবলমাত্র বেসামরিক প্রয়োজনে পরিচালিত হলেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইরানের পরমাণু কর্মসূচি মেনে নেবেন। সম্প্রতি, আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ী বলেছেন, ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে যাবে না। পারমাণবিক অস্ত্রকে ধ্বংসাত্মক ও বিপজ্জনক আখ্যা দিয়ে খামেনেয়ী আরও বলেন, নির্বোধেরাই এ ধরনের অস্ত্রের বিস্তার ঘটায়। ওবামার ওই গোপন চিঠির খবর প্রকাশের সময়ই চীনের বার্তা সংস্থা শিনহুয়া জানিয়েছিল- তুরস্কের ইস্তাম্বুলে তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আবারো আলোচনায় বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাশিয়া, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানির সমন্বয়ে গঠিত ছয় জাতিগোষ্ঠী। ইরান-ছয় জাতিগোষ্ঠী বৈঠক: দীর্ঘ ১৫ মাস বিরতির পর গত ১৪ এপ্রিল আবারো ইস্তাম্বুলে ছয় জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের পরমাণু বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা পরিষদের সচিব সাঈদ জালিলি এবং ছয় বৃহৎ শক্তির পক্ষে নেতৃত্ব দেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান ক্যাথেরিন অ্যাশ্টোন। আলোচনা শেষে তাদের দু’জনের মুখেই ছিল প্রশান্তির স্মিত হাসি। আগামী ২৩ মে ইরাকের রাজধানী বাগদাদে পরবর্তী আলোচনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন। ইস্তাম্বুল আলোচনা শেষে ক্যাথেরিন অ্যাশ্টোন এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেছেন, “পরমাণু অস্ত্র বিস্তাররোধ চুক্তি বা এনপিটি’র ধারা অনুযায়ী শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তি অর্জনের অধিকার ইরানের রয়েছে।” সংবাদ সম্মেলনে সাঈদ জালিলি বলেছেন, “ছয় জাতি গোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনায় তেহরান পশ্চিমা দেশগুলোর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।” এ বৈঠক সম্পর্কে মার্কিন দৈনিক লস এঞ্জেলস টাইমস লিখেছে, "ইস্তাম্বুল বৈঠকে ছয় জাতিগোষ্ঠী ইরানের কাছে কোনো কিছু দাবি করতে পারেনি এবং কোনো বিশেষ ছাড় বা সুবিধাও আদায় করতে পারেনি। বাগদাদে যে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে তা তাতেও কোনো পূর্ব শর্ত থাকছে না।" ইস্তাম্বুল বৈঠকের মতো যদি বাগদাদ বৈঠকও ইতিবাচক ও ইরানের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয় তাহলে ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে সৃষ্ট সব ধরনের অস্পষ্টতা দূর করার পথ প্রশস্ত হবে বলে বিশ্লেষকরা আশা করছেন। সে ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা একটি বিরাট দ্বন্দ্বের অবসান হবে আর বিশ্ব অর্থনীতিও মুক্তি পাবে সম্ভাব্য মন্দার কবল থেকে। ইরান ইস্যুতে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠার যে আশঙ্কা বিশ্ববাসীকে চেপে ধরেছিল তারও অবসান হবে বলে আশা করা যায়।#

Sunday, January 22, 2012

ইরানে মার্কিন ড্রোন ও সিআইএ’র গুপ্তচর আটক : হোয়াইট হাউজের উদ্বেগ

ইরানের সেনাবাহিনীর হাতে অত্যাধুনিক মার্কিন পাইলটবিহীন বিমান বা আরকিউ-১৭০ ড্রোন আটকের ঘটনা এখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয়। মার্কিন ড্রোনটি ইরানের আকাশসীমা লঙ্ঘন করলে ইরানের সশস্ত্রবাহিনী সেটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মাটিতে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়। ইরানের এ সফলতাকে একদিকে সাইবার যুদ্ধে মার্কিনীদের জন্য বড় আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে অন্যদিকে সাইবার প্রযুক্তিতে ইরানের দক্ষতারও প্রমাণ পাওয়া গেছে। মার্কিন ড্রোন আটক নিয়ে আলোচনার রেশ কাটতে না কাটতেই ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রণালয় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র একজন গুপ্তচরকে আটকের খবর দিয়েছে। গুপ্তচর আটকের ঘটনা মার্কিন তথ্য ও গোয়েন্দা বিভাগের জন্য আরেকটি আঘাত বলে অনেকে মনে করছেন। আরকিউ-১৭০ ড্রোন : রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম! ৪ ডিসেম্বর, রোববার। আফগান সীমান্ত থেকে ইরানের প্রায় আড়াইশ' কিলোমিটার অভ্যন্তরে ঢুকে পড়ার পর ইরানি সেনাবাহিনীর ইলেক্ট্রনিক ওয়ারফেয়ার ইউনিট মার্কিন চালকবিহীন আরকিউ-১৭০ সেন্টিনাল স্টিলথ বিমানটি নিরাপদে মাটিতে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়। ‘বিস্ট অব কান্দাহার’ নামে পরিচিত ড্রোনটির সঙ্গে রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম মার্কিন অত্যাধুনিক বিমান বাহিনীর বোমারু বিমান বি-২ নকশার মিল রয়েছে। এছাড়া এফ-৩৫ জঙ্গী বিমান নির্মাণে যে ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার হয়েছে সেই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে আরকিউ-১৭০ ড্রোনে। ফলে এ ড্রোনের গুরুত্ব আরো কয়েকগুণ বেড়েছে। শুধু তাই নয়, আরকিউ-১৭০ ড্রোন দিনের পর দিন আকাশে ভেসে থাকতে পারে। ড্রোনটি তার উড্ডয়ন পথের বিশাল এলাকা জুড়ে সব ধরনের বেতার যোগাযোগের বিরুদ্ধে আড়ি পাততে পারে। এমনকি প্রয়োজনে ড্রোনটি তার উড্ডয়নে পথের বিশাল অঞ্চল জুড়ে সব ধরনের বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থা জ্যামও করে দিতে পারে। আরকিউ-১৭০ ড্রোনে যে রাডার বসানো আছে তাও অনন্য এবং অত্যাধুনিক । এ ড্রোনে বসানো আছে নানা ধরনের ক্যামেরা, লেন্স ও সেন্সর এবং এ সবের সাহায্যে অনন্য ছবি তুলতে পারে ড্রোনটি। কিন্ত এতো কিছুর পরও ইরান ড্রোনটিকে ভূপাতিত ধারণা করা হচ্ছে- ইরানিরা ড্রোনটির নেভিগেশন সিস্টেম হ্যাক করেছিল, আর তাতেই এটি নিরাপদে মাটিতে নেমে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধুনিক প্রযুক্তিসমৃদ্ধ ড্রোনের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে ইরানের মাটিতে নামিয়ে আনার ঘটনা তেহরানের জন্য বিশাল সাফল্য এবং ওয়াশিংটনের জন্য বড় ধরনের আঘাত বলে মনে করা হলেও মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানকে কোন কৃতিত্ব দিতে নারাজ। তারা দাবি করেছেন, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে তাদের ড্রোন ইরানে ভূপাতিত হয়েছে। এ দাবির মাধ্যমে তারা এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চান। একদিকে দেখাতে চান, তারা ইচ্ছে করে ইরানের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেননি এবং অন্যদিকে ইলেকট্রনিক যুদ্ধে ইরানের সক্ষমতাকে উপেক্ষা করতে চান তারা। ড্রোন ফেরত চেয়েছেন ওবামা, ইরানের ‘না’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অবশেষে স্বীকার করেছেন যে, ইরান তাঁর দেশের একটি চালকবিহীন বিমান আটক করেছে। ওয়াশিংটনে ইরাকের প্রধানমন্ত্রী নুরি আল মালিকিকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন চলাকালে ওবামা ওই ড্রোনটি ফেরত চান। তিনি বলেন, ‘এর পর ইরান কি আচরণ করবে সেটি যুক্তরাষ্ট্র পর্যবেক্ষণ করবে।’ তবে ইরানের সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কমিটির প্রধান আলাউদ্দিন বুরুজারদি বলেছেন, ভূপাতিত মার্কিন ড্রোন ফেরত দেয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তিনি আরো বলেছেন, ‘ইরানের আকাশসীমা লংঘনের জন্য বরং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।’ ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রমিন মেহমানপারাস্ত বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইরানে ভূপাতিত হওয়া ড্রোন ফেরত চেয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা নিতান্তই তাদের মুখ বাঁচানোর কৌশল। তিনি আরো বলেছেন, ইরানের আকাশসীমা লংঘন করার অপরাধে মার্কিন সরকার ক্ষমা না চেয়ে বরং তারা উল্টো অসৎ কৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। মেহমানপারাস্ত আরো বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট মনে হয় ভুলে গেছেন যে, তাদের গোয়েন্দা বিমান ইরানের আকাশসীমা লংঘন করে গুপ্তরচরবৃত্তির কাজ করছিল। এ ছাড়া, মার্কিন প্রশাসন ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে হস্তক্ষেপ করে আসছে। এ সবই আন্তর্জাতিক আইনের মারাত্মক লংঘন বলে মন্তব্য করেন রমিন মেহমানপারাস্ত। অন্যদিকে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ ওয়াহিদি বলেছেন, ভূপাতিত হওয়া মার্কিন ড্রোন এখন ইরানের সম্পদ। তিনি জানিয়েছেন, এ ড্রোন এখন নিজস্ব সম্পদ হিসেবেই ইরানে থাকবে এবং ইরানি জাতিই ভবিষ্যতে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। আরকিউ-১৭০ বিমানের উন্নত সংস্করণ তৈরি করবে ইরান যুক্তরাষ্ট্র যে ড্রোনটিকে রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম বলে দাবি করেছিল, সেটি ইরানের হস্তগত হওয়ায় মার্কিন সরকারের রাডার ফাঁকি দেয়ার সব কলাকৌশল এখন ইরানের আয়ত্বে চলে এসেছে। ইরান ঘোষণা করেছে, আরকিউ-১৭০ বিমানের উন্নত সংস্করণ তৈরি করবে তেহরান। আরকিউ-১৭০ খতিয়ে দেখে তারচেয়েও উন্নত মানের ড্রোন তৈরির ক্ষমতা যে ইরানের আছে, তা স্বীকার করেছেন মার্কিন দৈনিক 'ক্রিশ্চিয়ান সায়েন্স মনিটরের' সাংবাদিক পিটার গ্রিরিয়ার। তিনি এক নিবন্ধে লিখেছেন, ‘এর আগে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল এবং প্রযুক্তিগত দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে নিম্ন অবস্থানে রয়েছে এমন একটি দেশ মার্কিন অত্যাধুনিক প্রযুক্তির অনুকরণ করতে পেরেছিল। তিনি জানান, ১৯৪৭ সালের আগস্টে অধুনালুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন 'তু -৪ বুল'নামের বিমান প্রদর্শন করে। এ বিমানটি মার্কিন বোমারু বিমান বি-২৯-এর অনুকরণে তৈরি করা হয়েছিল। এর আগে অর্থাৎ ১৯৪৪ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি ঘাঁটিতে বি-২৯ বিমান জরুরী অবতরণে বাধ্য করেছিল তৎকালীন সোভিয়েত সরকার।‘ হোয়াইট হাউজের বিস্ময় ও শংকা ইরানের সেনাবাহিনীর ইলেক্ট্রনিক যুদ্ধ ইউনিট মার্কিন অত্যাধুনিক পাইলটবিহীন বিমান বা ড্রোন ইরানের মাটিতে নামিয়ে আনতে সক্ষম হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা হতভম্ভ ও বিস্মিত হয়েছেন। মার্কিন কর্মকর্তারা প্রথম দিকে মার্কিন ড্র্রোন ইরানের হস্তগত হওয়ার ব্যাপারে নানা সন্দেহ ও সম্ভাবনার কথা বললেও ইরান বিষয়টিকে গণমাধ্যমের কাছে তুলে ধরার পর মার্কিন কর্মকর্তাদের কথাবার্তায়ও পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে । মার্কিন দৈনিক ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল এর আগে খবর দিয়েছিল, আরকিউ-১৭০ ড্রোন ইরানীদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেয়ার অথবা তা ধ্বংস করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র প্রথমে সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু ইরানি সেনাবাহিনী পাল্টা আঘাত হানতে পারে এ আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র তাদের সে চিন্তা থেকে সরে আসে। ওয়াশিংটনের উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো- ড্রোনটি আটক হওয়ার পর রাশিয়া ও চীন তা পরিদর্শনের অনুমতি চেয়েছে ইরানের কাছে। রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞ এলিজাবেথ কুইন্টানা এ বিষয়ে বলেছেন, রাশিয়া ও চীনকে ইরান ড্রোনটি দেখতে দিলে তারা অত্যাধুনিক বিমানটি নকল করবে। তারা এ ড্রোনের রাডার ফাঁকি দেয়ার বিষয়টির ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীতে স্টিলথ প্রযুক্তির পঞ্চম প্রজন্মের জঙ্গী বিমান অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। চীন ও রাশিয়া এ প্রযুক্তি সংগ্রাহের জন্য মুখিয়ে রয়েছে। কুইন্টানা বলেন, মার্কিন প্রযুক্তি অনুকরণের জন্য চীন খুবই আগ্রহী। চীন ও রাশিয়া ড্রোনের সেন্সর পর্যবেক্ষণ করতেও খুব আগ্রহী। এ সেন্সরের মাধ্যমে ড্রোনটি বিশাল এলাকার ওপর নজর রাখতে সক্ষম। এছাড়া রাডার ফাঁকি দিতে ও মাটি থেকে ৫০ হাজার ফুট উঁচুতে উড়তে সক্ষম। মার্কিন নৌবাহিনীর পি-৩ ওরিয়ন ২০০১ সালে চীনের হস্তগত হয়। এর ফলে চীন গোয়েন্দা ব্যবস্থার পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণে সক্ষম হয়। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র তার পুরো নৌবহরকে আরও উন্নত করতে বাধ্য হয়। কুইন্টানা বলেন, এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরান মার্কিন ড্রোন নামিয়ে আনায় একদিকে যেমন ইলেক্ট্রনিক যুদ্ধে তাদের দক্ষতার প্রমাণ মিলেছে অন্যদিকে রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম বলে পরিচিত অত্যাধুনিক এ ড্রোন এখন ইরানী বিশেষজ্ঞদের নাগালে চলে এসেছে। এটি ইসরাইল ও মার্কিনীদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাকর একটি ঘটনা। ড্রোনের পর সিআইএ’র গুপ্তচর আটক ইরানে মার্কিন ড্রোন ভুপাতিত হওয়া নিয়ে মিডিয়ায় যখন তোলপাড় চলছে ঠিক তখন (১৭ ডিসেম্বর) ইরানের নিরাপত্তা বাহিনী সিআইএ’র একজন গুপ্তচরকে আটক করার দাবি করেছে। ১৮ ডিসেম্বর সিআইএ'র গুপ্তচর আমির মির্জা হেকমাতি ইরানের টেলিভিশনে প্রচারিত এক স্বীকারোক্তিতে আমির মির্জা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনায় তার বাড়ি এবং ২০০১ সালে তিনি মার্কিন সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এরপর এক দশক ধরে তিনি গুপ্তচরবৃত্তির প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় বাগরাম বিমান ঘাঁটিতেও তিনি কাজ করেছেন। এছাড়া তেহরানে আসার আগে তাকে মার্কিন গোয়েন্দারা বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেছেন। স্বীকারোক্তিতে আমির মির্জা জানিয়েছেন, প্রথমে তিনি কিছু তথ্য দিয়ে ইরানের গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের আস্থা অর্জন করতে চেয়েছিলেন। এ মিশন সফল হলে তাকে সিআইএ আরো বড় মিশনের পাঠানোর কথা বলেছিল। এ জন্য তাকে বিপুল অংকের অর্থও দিতে চেয়েছিল সিআইএ। আমির মির্জা ইরানে গুপ্তচরবৃত্তির বিষয়ে তার অপরাধ স্বীকার করেছে। তবে তার মিশন শুরু হওয়ার আগেই এই মার্কিন গুপ্তচর ইরানের গোয়েন্দা সেনাদের হাতে আটক হয়। সিআইএ'র ওই চর যুক্তরাষ্ট্র থেকে আফগানিস্তানের বাগরাম সেনাঘাঁটিতে পৌঁছার পর থেকেই তাকে অনুসরণ করছিল ইরানের গোয়েন্দা সেনারা। পরবর্তীতে ইরানের ভূমিতে প্রবেশ করার পর তাকে গ্রেফতার করা হয়। গুপ্তচরকে ফেরত চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আটক মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা-সিআইএ'র একজন গুপ্তচরকে অবিলম্বে ফেরত দেয়ার আহবান জানিয়েছে ওয়াশিংটন। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ড হেকমাতিকে মুক্তি দেয়ার আহবান জানিয়ে বলেছেন,যুক্তরাষ্ট্র তেহরানে নিযুক্ত সুইস দূতাবাসের মাধ্যমে হেকমাতির সঙ্গে সাক্ষাত করতে সুযোগ দেয়ার জন্য ইরানের কাছে আবেদন জানিয়েছে। নুল্যান্ড দাবি করেছেন, ইরানে আটক মার্কিন গুপ্তচর হেকমাতির পরিবার গত সেপ্টেম্বরে তার আটকের খবর মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে জানিয়েছে। তিনি আরো দাবি করেছেন, হেকমাতি যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিযোয়ানা অঙ্গরাজ্যে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর মার্কিন মেরিন বাহিনীতে যোগ দেন। ‘সিআইএ'র শ্রেষ্ঠত্বের দাবি ভেঙ্গে দিয়েছে ইরান' ইরানের সংসদের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক কমিটির সদস্য হাসান কামরান বলেছেন, মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা-সিআইএ'র গুপ্তচর আটকের মাধ্যমে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের গোয়েন্দা শক্তি প্রমাণিত হয়েছে। তিনি সিআইএ'র এ গুপ্তচরবৃত্তির ঘটনাকে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বলে উল্লেখ করেছেন। হাসান কামরান আরো বলেন, ‘এ ঘটনার আগে শত্রুরা কখনই চিন্তা করেনি যে, তাদের গুপ্তচরেরা ইরানের গোয়েন্দাদের হাত ধরা পড়তে পারে।’ ইরানে এর আগেও সিআইএ'র গুপ্তচর আটক করা হয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে সিআইএ'র গুপ্তচর ও সন্ত্রাসী চক্রের ৩০ সদস্যকে আটক করা হয়। গত ২৪ নভেম্বর আরো ১২ জন সিআইএ এজেন্টকে গ্রেফতার করা হয়। তারা ইরানের পরমাণু স্থাপনাসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নাশকতামূলক তৎপরতা চালানোর পরিকল্পনা করছিল। তবে ইরানের হাতে মার্কিন গোয়েন্দা বিমান আরকিউ-১৭০ ভূপাতিত হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ইহুদিবাদী ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং ব্রিটেনের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই -সিক্সকে একসঙ্গে ইরান বিরোধী তৎপরতার জন্য নতুন কর্মসূচি গ্রহণে মার্কিন কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন। এ জন্য তিনি আলাদা বাজেটও দিয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, একটি দেশের আকাশসীমা লংঘন করা এবং গুপ্তচর পাঠিয়ে তথ্য সংগ্রহ করা আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির আলোকে সমর্থনযোগ্য কিনা। এ বিষয়ে জাতিসংঘ সনদের চার নম্বর অনুচ্ছেদের দু'নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, "কোন দেশের স্বাধীনতা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে হুমকি সৃষ্টি বা বলপ্রয়োগ নিন্দনীয়। ১৯৭৪ সালে এ ধারায় আনা এক সংশোধনীতে বলা হয়েছে, কোন দেশের আকাশসীমা লঙ্ঘনকে ওই দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করা হবে। " রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরানের ওপর গুপ্তচরবৃত্তি চালানোর জন্যই সিআইএ ইচ্ছাকৃতভাবে ইরানে ড্রোন ও গুপ্তচর পাঠিয়েছিল। কাজেই আন্তর্জাতিক আইনে এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া উচিত। জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের স্থায়ী প্রতিনিধি মোহাম্মাদ খাযায়ি এ বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জাতিসংঘের পক্ষ থেকে মার্কিন ড্রোন কর্তৃক ইরানের আকাশসীমা লংঘনের ব্যাপারে নিন্দা প্রস্তাব পাশ করতে হবে। হুমকি পাল্টা হুমকি ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আনবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) একপেশে রিপোর্ট, ইরানে 'স্টুক্সনেট' ভাইরাসের মত সাইবার হামলা, ইরানের কয়েকজন বিজ্ঞানীকে হত্যা, ওয়াশিংটনে সৌদি রাষ্ট্রদূতকে হত্যার কথিত পরিকল্পনা, তেহরানস্থ ব্রিটিশ দূতাবাসে বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের হামলা, ব্রিটেন, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ এবং মার্কিন ড্রোন ও সিআইএ’র গুপ্তচর আটকের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হুমকি-পাল্টা হুমকি অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন 'দ্য আর্লি শো' নামের একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে বলেছেন, 'ইরানকে একঘরে করার জন্য বিশ্বকে একতাবদ্ধ করা জরুরি হয়ে উঠেছে এবং এ ভাবেই কেবল কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে।' ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগও ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেয়ার হুমকি দিয়েছেন। ব্রিটিশ দৈনিক ডেইলি টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, উইলিয়াম হেগ বলেছেন, ব্রিটিশ সরকার দীর্ঘমেয়াদে ইরানের ওপর সামরিক ব্যবস্থা নেয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না। অন্যদিকে ইসরাইলি প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেজ বলেছেন, ইরানের ওপর হামলার সম্ভাবনা দিন দিন বেড়েই চলেছে। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং যুদ্ধমন্ত্রী ইহুদ বারাকও একই রকমের হুমকি দিয়েছেন। তবে এসব হুমকির বিরুদ্ধে ইরানী কর্মকর্তারাও পাল্টা হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহমাদ ওয়াহিদি বলেছেন, ইরান আক্রান্ত হলে ইসরাইলকে ভালো মতো শিক্ষা দেয়া হবে। তিনি আরো বলেছেন, ইরানের ওপর সামরিক হামলা হলে ইসরাইলের টিকে থাকার সামান্যতম সম্ভাবনা নেই। ইসরাইলের সব জায়গায় ইরান হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র মারবে। ইরানের দেড় লাখ ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইলের জন্য অপেক্ষা করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেছেন। তবে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানে হামলা চালানোর যে হুমকি দিচ্ছে তা তেহরানের বিরুদ্ধে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ ছাড়া আর কিছু নয়। ইরানের শীর্ষস্থানীয় সেনা কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইয়াদুল্লাহ জাভানি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইহুদিবাদী ইসরাইল যদি ইরানের পরমাণু স্থাপনায় একটা ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ে তাহলে ইসরাইলের প্রতি ইঞ্চি ভূমি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। এ হামলা থেকে ইসরাইলের পরমাণু স্থাপনাও বাদ যাবে না। ইসরাইল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্যের জবাবে তিনি আরো বলেছেন, "ইরান শুধু শত্রুদের হামলা প্রতিহতই করবে না বরং শত্রুর ভূখণ্ডেও ধ্বংসাত্মক পাল্টা হামলা চালাবে।" ‘ইসরাইল-আমেরিকার পিছটান’ এতদিন ইরানের বিরুদ্ধে হামলার হুমকি দিলেও ইসরাইল, আমেরিকা ও তাদের মিত্ররা পিছু হঠেছে। ইসরাইলের সাবেক যুদ্ধমন্ত্রী শাঁওল মোফায বলেছেন, ইরানে হামলা করার সিদ্ধান্ত হবে মস্ত বড়ো ভুল। ইসরাইলী যুদ্ধমন্ত্রী ইহুদ বারাকও তাদের আগের অবস্থান থেকে সরে এসে বলেছেন, ইসরাইল ইরানে হামলা করবে না। এর আগে ইতালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী রোমানো প্রোদি বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন ও ইহুদবাদি ইসরাইলের হুমকি কোনো ফল বয়ে আনবে না। এদিকে চীনের প্রতিরক্ষা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেজর জেনারেল ঝাং ঝাওঝোং বলেছেন, ইরানের ওপর কোনো হামলা হলে চীন সহায়তার জন্য এগিয়ে আসতে দ্বিধা করবে না এবং এ জন্য যদি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বেঁধেও যায় তার পরোয়া করবে না বেইজিং। তিনি বলেন, ইরান রক্ষায় এগিয়ে আসতে চীন কোনো দ্বিধাই করবে না। তিনি বলেন, ইরান শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচির আড়ালে বোমা বানানোর চেষ্টা করতে পারে বলে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইহুদিবাদী ইসরাইল মাঝে মধ্যেই তেহরানের বিরুদ্ধে হামলার হুমকি দিচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইরানের বিরুদ্ধে পশ্চিমা বিশ্বের যে মিডিয়া যুদ্ধ চলছে, তাতে ঝাং ঝাওঝোং এই মন্তব্য নতুন মাত্রা যোগ করল । বিশ্লেষকদের মতে ঝাং ঝাওঝোং এই মন্তব্য পশ্চিমা বিশ্বের জন্য এক সতর্ক বার্তা। আর এজন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যুদ্ধংদেহী মনোভাব দেখানো থেকে বিরত রয়েছে। #

Sunday, July 24, 2011

চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রোযা

আত্মসংযম আর আত্মশুদ্ধির কষ্টিপাথরে নিজেকে যাচাই করার ও বিশুদ্ধ করার সুবর্ণ সব সুযোগে ভরা মাস রমজান ৷ বেহেশতি সৌরভ ও খোদা প্রেমের ফুলেল জলসার এই মাস মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্যে সবচেয়ে বড় রহমতের উৎসব ৷ মাওলানা জালালউদ্দিন রুমী (রহঃ) যেমনটি বলেছেন, সত্যের সুগন্ধি শীতল সমীর এ সময় নিয়ে আসে ঐশী পাঠ অপূর্ব এ উপহার থেকে সন্তর্পনে যতো পারো করে যাও লুটপাট। রহমতের সমীরণ এসে আবার চলে যায় যাকে ইচ্ছে তাকে সে প্রাণবায়ু দিয়ে যায় আবার এসেছে আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ প্রস্তুতি নাও হে গোলাম,করো অবগাহন। হিজরী পঞ্জিকার বারোটি মাসের মধ্যে নবম মাসের নাম রমযান। নবীজি বলেছেন,রজব মাস হচ্ছে আল্লাহর মাস, শাবান মাস হচ্ছে আমার মাস আর রমজান মাস হচ্ছে আমার উম্মতের মাস। এ মাসটিকে উম্মতের মাস হিসেবে ঘোষণা করলেও আল্লাহর কাছে এ মাসটির মর্যাদা অসামান্য । মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘আস সাওমু লি, অ-আনা আজযি বিহী' অর্থাৎ ‘রোযা আমারই জন্য এবং আমি নিজেই তার প্রতিদান দেবো।' পরকালে তিনি কী পুরস্কার দেবেন তার কিছুটা ইঙ্গিত নবী করিম (সাঃ) আমাদের দিয়েছেন। রাসূলে খোদা বলেছেন, "রমযান এমন একটি মাস যে মাসে আল্লাহ তোমাদের জন্যে রোযা রাখাকে ফরজ করে দিয়েছে। অতএব যে ব্যক্তি ঈমান সহকারে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় রোযা রাখবে, তার জন্যে রোযার সেই দিনটি হবে এমন যেন সবেমাত্র সে মায়ের গর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছে, অর্থাৎ রোযাদার তার সকল গুণাহ থেকে মুক্তি পেয়ে নিষ্পাপ শিশুটির মতো হয়ে যাবে।" রাসূল (সাঃ) আরও বলেছেন, "তুমি যদি চাও তোমার বুকের ভেতরের অশান্তি কমে যাক তাহলে রমযানের রোযা এবং প্রতিমাসে তিনটি করে রোযা রাখো।" অন্য এক হাদিসে আছে, রাসুলেখোদা বলেছেন, "রোযা রেখে অটুট স্বাস্থ্যের অধিকারী হও।" এর মানে হচ্ছে, রোযা রাখলে স্বাস্থ্য ভাল থাকে। কোন রোগ-ব্যাধিতে আক্রান্ত হয় না। ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রাঃ)ও বলেছেন, "প্রতিমাসে তিনটি রোযা এবং রমযান মাসের রোযা বুকের ভেতরকার জটিলতা এবং পেরেশানীগুলো দূর করে দেয়।" রোযা থাকা অবস্থায় কমপক্ষে ১৫ ঘন্টা যাবতীয় খানাপিনা বন্ধ থাকে। এ সময় পাকস্থলী, অন্ত্রনালী, যকৃত, হৃদপিন্ডসহ অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিশ্রাম পায়। তখন এসব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিজেদের পুনর্গঠনে নিয়োজিত হতে পারে। অন্যদিকে দেহে যেসব চর্বি জমে শরীরের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় সেগুলো রোযার সময় দেহের প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানোর জন্য ছুটে যায়। স্বাস্থ্যবিজ্ঞানী তার "সুপিরিয়র নিউট্রিশন" গ্রন্থে ডা. শেলটন বলেছেন, উপবাসকালে শরীরের মধ্যকার প্রোটিন, চর্বি, শর্করা জাতীয় পদার্থগুলো স্বয়ং পাচিত হয়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ কোষগুলোর পুষ্টি বিধান হয়। সত্যি বলতে কী, দেহ এবং আত্মার ওপরে প্রভাব সৃষ্টিকারী এই রোযার উপকারীতা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বহু আগেই প্রমাণ করেছে। আল্লাহ যেহেতু আমাদের জন্যে এই বিধানটি দিয়েছেন, ফলে এতে যে অবশ্যই কল্যাণ নিহিত থাকবে-তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশই নেই। রোযা বা উপবাসের মধ্যে শারীরিক কী কী কল্যাণ রয়েছে সে সম্পর্কে আরও কয়েকজন চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতামত জানা যাক : নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ঔষুধ ও শল্য চিকিৎসার প্রখ্যাত ডাঃ অ্যালেকসিস বলেছেন, উপবাসের মাধ্যমে লিভার রক্ত সঞ্চালন দ্রুত হয় ফলে ত্বকের নিচে সঞ্চিত চর্বি, পেশীর প্রোটিন, গ্রন্থিসমূহ এবং লিভারে কোষসমূহ আন্দোলিত হয়। আভ্যন্তরীণ দেহ যন্ত্রগুলোর সংরক্ষণ এবং হ্নদপিণ্ডের নিরাপত্তার জন্য অন্য দেহাংশগুলোর বিক্রিয়া বন্ধ রাখে। খাদ্যাভাব কিংবা আরাম-আয়েশের জন্য মানুষের শরীরের যে ক্ষতি হয়, রোজা তা পূরণ করে দেয়।" ডাঃ আইজাক জেনিংস বলেছেন, " যারা আলস্য ও গোড়ামীর কারণে এবং অতিভোজনের কারণে নিজেদের সংরক্ষিত জীবনী শক্তিকে ভারাক্রান্ত করে ধীরে ধীরে আত্মহত্যার দিকে এগিয়ে যায়, রোযা তাদেরকে এ বিপদ থেকে রক্ষা করে।" বিশ্বখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানী নাষ্টবারনার বলেন, "ফুসফুসের কাশি, কঠিন কাশি, সর্দি এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা কয়েকদিনের রোযার কারণেই নিরাময় হয়।" ডাক্তার দেওয়ান এ,কে,এম, আব্দুর রহীম বলেছেন, "রোযাব্রত পালনের কারণে মস্তিস্ক এবং স্নায়ুতন্ত্র সর্বাধিক উজ্জীবিত হয়। স্বাস্থ্যবিজ্ঞানী ডা. আব্রাহাম জে হেনরি রোযা সম্পর্কে বলেছেন, "রোযা হলো পরমহিতৈষী ওষুধ বিশেষ। কারণ রোযা পালনের ফলে বাতরোগ, বহুমূত্র, অজীর্ণ, হৃদরোগ ও রক্তচাপজনিত ব্যাধিতে মানুষ কম আক্রান্ত হয়।" পাকিস্তানের প্রখ্যাত প্রবীণ চিকিৎসক ডা. মুহাম্মদ হোসেনও একই ধরনের কথা বলেছেন। তারমতে, "যারা নিয়মিত রোজা পালনে অভ্যস্ত সাধারণত তারা বাতরোগ, বহুমূত্র, অজীর্ণ, হৃদরোগ ও রক্তচাপজনিত ব্যাধিতে আক্রান্ত কম হন।" চিকিৎসা বিজ্ঞানী ডা. ক্লাইভ বলেন, "রোযার বিধান স্বাস্থ্যসম্মত ও বিজ্ঞানসম্মত । সেহেতু ভারত, জাপান, ইংল্যান্ড, দক্ষিণ নাইজেরিয়াতে অন্যসব এলাকার তূলনায় মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় রোগ ব্যাধি অনেক কম দেখা যায়।" এভাবে বিশ্বের অনেক চিকিৎসা বিজ্ঞানী রোযার উপকারিতা বর্ণনা করেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, রোযাদার ব্যক্তি ধুমপান না করার কারণে ফুসফুস রোগমুক্ত থাকে। পেপটিক আলসারের রোগীরা রোযা রাখলে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও হাঁপানি রোগীদের জন্যও রোযা উপকারী। ডাক্তারদের মতে, রোযার ফলে মস্তিষ্কের সেরিবেলাম ও লিমরিক সিস্টেমের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ার কারণে মনের অশান্তি ও দুশ্চিন্তা দূর হয়-যা উচ্চ রক্তচাপের জন্য মঙ্গলজনক। বহুমূত্র রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে রোযা খুব উপকারী। ডাক্তারী পরীক্ষায় দেখা গেছে, একাধারে ১৫ দিন রোযা রাখলে বহুমূত্র রোগের অত্যন্ত উপকার হয়। রোযা চর্মরোগের জন্যও খুবই উপকারি। পুষ্টির সঙ্গে চর্মরোগের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। তাই চর্ম রোগের কিংবা ত্বকের উপর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় রোযা খুবই কার্যকর পদ্ধতি। কিডনী সমস্যায় আক্রান্ত রোগীরা রোযা রাখলে এ সমস্যা আরো বেড়ে যাবে ভেবে রোযা রাখতে চান না। অথচ আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা বলছেন, রোযা রাখলে কিডনীতে সঞ্চিত পাথর কণা ও চুন দূরীভূত হয়। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীদের মতে, সারা বছর অতিভোজ, অখাদ্য, কুখাদ্য, ভেজাল খাদ্য খাওয়ার ফলে আমাদের শরীরে যে জৈব বিষ জমা হয় তা দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এক মাস রোজা পালনের ফলে তা সহজেই দূরীভূত হয়ে যায়। কোরআন, হাদিস এবং আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে বলা যায়, রোযা হচ্ছে মুসলমানদের জন্য এক বিরাট রহমত এবং স্বাস্থ্যের জন্য অনন্য নেয়ামত স্বরূপ। রোযার গুরুত্ব সম্পর্কে হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী (রহঃ) বলেছেন, "রোযা শ্রেষ্ঠ পুণ্যের কাজ। কেননা রোযা সুপ্রবৃত্তিকে সবল এবং কুপ্রবৃত্তিকে দুর্বল করে দেয়। আত্মার পরিচ্ছন্নতা এবং প্রবৃত্তিকে দমন করে রাখার জন্য রোযার ন্যায় কার্যকর অস্ত্র আর কিছুই নেই।" পরিশেষে কবি ফজলে খোদার ভাষায় বলতে চাই- হে রমজান,হে রমজান! দাও স্বস্তি দাও শান্তি ধরণীকে করো মনোরম, তোমারে হেরিয়া বিশ্ব-বিবেক সংযম হোক দুর্দম ৷

Sunday, September 5, 2010

বাংলা কবিতা ও গানে ঈদ উৎসব

মুসলমানদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হচ্ছে ঈদ। প্রতি বছর ঈদকে সামনে রেখে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় দেখা যায় নানা আয়োজন। প্রবন্ধ, গান, ছড়া-কবিতা, গল্প, উপন্যাস, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান কোন কিছুই বাদ যায় না। ঈদকে কেন্দ্র করে কবি- সাহিত্যিক, লেখক, শিল্পী, অভিনেতাদের ব্যস্ত সময় কাটে। সত্যি বলতে কী, এমন কোন মুসলিম কবি-সাহিত্যিক কিংবা লেখককে হয়তো পাওয়া যাবে না যিনি ঈদ নিয়ে কোন লেখা লিখেননি। এক্ষেত্রে বাংলা ভাষাভাষী কবি-সাহিত্যিকরাও পিছিয়ে নেই। যতটুকু জানা যায়, বিশ শতকের গোড়ার দিকে বাংলা কবিতায় ঈদ নিয়ে লেখালেখি শুরু হয়। সৈয়দ এমদাদ আলীর ‘ঈদ’ কবিতাটিই সম্ভবত বাংলাভাষায় রচিত প্রথম ঈদ-বিষয়ক কবিতা। ১৯০৩ সালে তাঁরই সম্পাদনায় প্রকাশিত মাসিক নবনূর পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় কবিতাটি ছাপা হয়। তিনি লিখেছেন-
“ ধর্ম ও কর্মরে জীবনের মাঝে প্রতিষ্ঠিত করি আজ জীবনের আবহে হও অগ্রসর, নাহি তাতে কোন লাজ। যে চেতনা থাকে একদিন জাগি, দীর্ঘ নিদ্রা তার পরে, সে তো আনে শুধু ঘন অবসাদ জীবনে ঢালে অনন্ত বিষাদ দেও তারে দূর করে। ”
মানবজাতির তথা মুসলমানদের মহামিলনের উৎসব ঈদকে নিয়ে কবি কায়কোবাদ ‘ঈদ আবাহন’ নামে একটি কবিতা লিখেছেন। কবিতাটি এ রকম-
“ এই ঈদ বিধাতার কি যে শুভ উদ্দেশ্য মহান, হয় সিদ্ধ, বুঝে না তা স্বার্থপর মানব সন্তান। এ ত নহে শুধু ভবে আনন্দ উৎসব ধুলা খেলা। এ শুধু জাতীয় পুণ্যমিলনের এক মহামেলা। ”
কবি কায়কোবাদ ঈদকে পুণ্যমিলনের মহামেলা হিসেবে অভিহিত করলেও ইসলামের নির্দেশনা সঠিকভাবে অনুসরণ না করার কারণে ঈদের দিনেও গরিব-দুঃখী ও অসহায়দের কষ্টের যেন শেষ থাকে না। এ দিকটি ফুটে ওঠেছে শাহাদাত হোসেনের ‘বাংলার ঈদ’ কবিতায়। কবি লিখেছেন,
“ বাংলার মুসলমান শুধু চেয়ে রয়- মৌন ম্লান ক্লিষ্ট মুখ নির্বাক নিশ্চল। ফিত্রার খুশী কোথা তার? কি দান সে দিবে ক্ষুধিতেরে? নিজেই কাঙাল রিক্ত- ভিক্ষা মাগি ফিরে দ্বারে দ্বারে।”
এ কবিতায় কবি ফিতরা আদায়ের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। ঠিকমত ফিতরা ও যাকাত দেয়া গেলে অসহায়, দরিদ্ররাও ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে পারবে। সমাজে নেমে আসবে শান্তি-সুখের ফল্গুধারা। এ দিকটির প্রতি ইঙ্গিত করেই সম্ভবত কবি গোলাম মোস্তফা ঈদকে মানবতার বিরাট প্লাটফর্ম হিসেবে কল্পনা করেছেন। ঈদ উৎসব কবিতায় তিনি লিখেছেন-
“ কণ্ঠে মিলনের ধ্বনিছে প্রেম-বাণী, বক্ষে ভরা তার শান্তি, চক্ষে করুণার স্নিগ্ধ জ্যোতি ভার, বিশ্ব-বিমোহন কান্তি প্রীতি ও মিলনের মধুর দৃশ্যে এসেছে নামিয়া যে নিখিল বিশ্বে দরশে সবাকার মুছেছে হাহাকার বিয়োগ-বেদনার শ্রান্তি।”
ঈদ নিয়ে সবচেয়ে বেশি কবিতা ও গান লিখেছেন, কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তার লেখা -
‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ। তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানি তাকিদ।’
-এ গানটি ছাড়া ঈদের আনন্দ যেন পূর্ণতা পায় না। এছাড়া, ‘ঈদ মোবারক’ ও ‘কৃষকের ঈদ’ ও ‘ঈদের চাঁদ’ কবি নজরুলের বহুল আলোচিত কবিতা। ‘ঈদ মোবারক’ কবিতায় কবি লিখেছেন,
“শত যোজনের কত মরুভূমি পারায়ে গো, কত বালুচরে কত আঁখি-ধারা ঝরায়ে গো, বরষের পরে আনিলে ঈদ! ”
এ কবিতায় নজরুল দেখেছেন অসংখ্য মরুভূমি,বালুচর আর অনাবিল আঁখিজল পেরিয়ে এসেছে ঈদ। তিনি বলতে চেয়েছেন,মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে সুখ-দুঃখের সমভাগী হয়ে অধিকার ভোগ আর দায়িত্ব পালনের মধ্যে যে প্রকৃত আনন্দ,সে শিক্ষা যেন রয়েছে ঈদের মাহাত্ম্যে। ঈদের মহান শিক্ষাই হচ্ছে সব ভেদাভেদ-হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে এক আল্লাহর বান্দা হিসেবে ঈদের জামায়াতে দাঁড়িয়ে ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতার বাস্তব দৃষ্টান্ত স্থাপন করা । কিন্তু ধর্মীয় অনুশাসন না মানার কারণে সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের ঈদ সচরাচর দেখা যায় না। এ দিনও দেখা যায় গ্রামের দরিদ্র কৃষকরা শীর্ণ গরুর পাল নিয়ে মাঠে যায় জমিতে লাঙল দিতে। এদিকে ইঙ্গিত করে তিনি রচনা করেছেন তার কৃষকের ঈদ কবিতাটি। কবির ভাষায়-
“জীবনে যাদের হররোজ রোজা ক্ষুধায় আসেনা নিদ মুমূর্ষু সেই কৃষকের ঘরে এসেছে কি আজ ঈদ? একটি বিন্দু দুধ নাহি পেয়ে যে খোকা মরিল তার উঠেছে ঈদের চাঁদ হয়ে কি সে শিশু-পুঁজরের হাড়?”
কবি নজরুলের কবিতা ও গানে ঈদের তাৎপর্য্য, এ দিনের করণীয় ও সমাজে এর প্রভাব সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। অন্যদিকে মুসলিম রেনেসাঁর কবি ফররুখ আহমদ পুরো দুনিয়াকে ঈদগাহ্‌র সাথে তুলনা করেছেন । ‘ঈদগাহ হবে দুনিয়াটাই’ কবিতায় তিনি লিখেছেন-
আজকে এল খুশীর দিন দেখ না চেয়ে খুশীর চিন দেখ না চেয়ে আজ রঙিন খুশীর ঝলক ঈদগাহে। ................................ জামাত ছেড়ে থাকবে যে ঘরের কোণে রইবে সে রইবে হয়ে একপেশে একলা থাকায় দুঃখ তাই। সবাই মিলে একদলে এক আশাতে যাই চলে এক আশাতে যাই বলে ঈদগাহ হবে দুনিয়াটাই।
শাওয়ালের রূপোলী চাঁদ পশ্চিমাকাশে মুচকি হেঁসে জানিয়ে দেয় যে, ঈদ এসেছে। দীর্ঘ প্রতিক্ষিত এ দিন নিয়ে কবি বেগম সুফিয়া কামাল তাঁর ‘ঈদের চাঁদ’ কবিতায় লিখেছেন-
“চাঁদ উঠিয়াছে, ঈদের চাঁদ কি উঠেছে? শুধায় সবে। লাখো জনতার আঁখি থির আজি সুদূর সুনীল নভে। এই ওঠে,ওই উদিল গগনে সুন্দর শিশু চাঁদ— আমিন। আমিন। রাব্বুল আলামিন করে সবে মোনাজাত।”
আগেই বলেছি, ঈদের নতুন চাঁদ সবার জন্য আনন্দ বয়ে আনে না। এদিন গরীব-দুঃখী ও অসহায়দের মনের আকুতি প্রকাশিত হয়েছে কবি তালিম হোসেনের ‘ঈদের ফরিয়াদ’ কবিতায়। কবির ভাষায়-
‘ঈদ মোবারক, সালাম বন্ধু, আজি এই খোশরোজে দাওয়াত কবুল কর মানুষের বেদনার মহাভোজে। কহিব কি আর, চির-মানুষের ওগো বেদনার সাথী, ঈদের এ দিন শেষ হয়ে আসে, সমুখে ঘনায় রাতি।’
কবি সিকান্দার আবু জাফর প্রায় একই বিষয়ে একটি কবিতা লিখেছেন। ঈদ উপলক্ষে দোয়া চেয়ে পিতার কাছে লেখা ‘ঈদের চিঠি’-তে তিনি লিখেছেন-
“ঈদের সালাম নিও,দোয়া করো আগামী বছর কাটিয়ে উঠতে পারি যেন এই তিক্ত বছরের সমস্ত ব্যর্থতা। অন্ততঃ ঈদের দিন সাদাসিধে লুঙ্গি একখানি, একটি পাঞ্জাবী আর সাদা গোলটুপি তোমাকে পাঠাতে যেন পারি; আর দিতে পারি পাঁচটি নগদ টাকা।”
অন্যদিকে সৈয়দ আলী আহসান ঈদের চাঁদের হাসিতে দেখতে পেয়েছেন নতুন দিনের বারতা। লিখেছেন-
“এসেছে নূতন দিন আলো শতদল পাপড়ি মেলেছে, কুয়াশা হয়েছে ক্ষীণ। জরির জোব্বা, শেরোয়ানী আর আমামার সজ্জায় আতরের পানি, মেশেকর রেণু খোশবু বিলায়ে যায়— বাতাসে বাতাসে কলরোল আজি, ভেঙেছে তন্দ্রা ঘোর সাহেবজাদীর নেকাব টুটেছে, রাত্রি হয়েছে ভোর।” (এসেছে নূতন দিন)
সমাজে ঈদের খুশীর প্রভাব সম্পর্কে কবি আ.ন.ম বজলুর রশিদ তার 'ঈদ আসে' কবিতায় লিখেছেন-
ঈদ আসে হাসি-খুশী তোমাদের আমাদের সকলের ঘরে অনেক আনন্দ নিয়ে কিছুক্ষণ ভুলে যাই দুঃখ জ্বালা যত আজ শুধু মেলামেশা অন্তরঙ্গ হয়ে থাকা অবিরত আল্লাহর প্রশংসায় গান, তাঁর দয়া দাক্ষিণ্যের অমৃত ঝরে।
কবি তফাজ্জল হোসেন খান ঈদ নিয়ে চমৎকার একটি গান লিখেছেন । প্রতি বছর ঈদ এলেই শিশুরা সমবেত কণ্ঠে গেয়ে ওঠে এ গানটি।
“আজ আনন্দ প্রতি প্রাণে প্রাণে দুলছে খুশীর নদী প্লাবনে ঘরে ঘরে জনে জনে আজি মুখর হব মোরা গানে গানে ঈদ মোবারক, ঈদ মোবারক আজ বল ঈদ মোবারক আজ।”
অধিকাংশ কবি-সাহিত্যিক ঈদের দিনকে খুশীর দিন হিসেবে চিত্রিত করলেও কবি মতিউর রহমান মল্লিক তার গানে লিখেছেন,
“ঈদের খুশী অপূর্ণ রয়ে যাবে ততদিন খোদার হুকুমাত হবে না কায়েম কায়েম হবে না যতদিন।”
কবির এ গানের কথাগুলো যৌক্তিক। কারণ দুনিয়ায় খোদার হুকুমাত কায়েমের মাধ্যমেই ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য দূর করা সম্ভব। আর এ বৈষম্য দূর হলেই ঈদ হবে সত্যিকার আনন্দের দিন; তা সবার হৃদয়ে বুলিয়ে দেবে প্রেম প্রীতি আর শান্তির পরশ। এছাড়া ঈদ থেকে শিক্ষা নিয়ে সারাবছর নিজের জীবনকে পরিচালিত করতে পারলেই ঈদ উৎসব সার্থক হবে। ঈদের দিন যেভাবে ধনী-গরিব ভেদাভেদ ভুলে যায়,সারাবছর ধরে সেই বিভেদের দেয়ালকে তুলে ফেলতে হবে। কবি গোলাম মোস্তফার কথায়-
“আজি সকল ধরা মাঝে বিরাট মানবতা মূর্তি লভিয়াছে হর্ষে, আজিকে প্রাণে প্রাণে যে ভাব জাগিয়েছে রাখিতে হবে সারা বর্ষে, এই ঈদ হোক আজি সফল ধন্য নিখিল-মানবের মিলন জন্য, শুভ যা জেগে থাক,অশুভ দূরে যাক খোদার শুভাশীষ স্পর্শে।”

Wednesday, March 10, 2010

দুবাইয়ে হামাস কমাণ্ডার হত্যা : ইহুদিবাদী ইসরাইলের আরেকটি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস

‘টার্গেট করো এবং মেরে ফেলো’ এটা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ক্যান্সার হিসেবে পরিচিত ইহুদীবাদী ইসরাইলের গোয়েন্দা নীতি। সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার সম্ভবত এ কারণেই একবার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছিলেন,‘ইসরাইলের প্রধান ভ্রান্তি হলো তার কোন বিদেশ নীতি নেই, আছে কেবল প্রতিরক্ষা নীতি।’ ইসরাইলের প্রতিরক্ষা নীতি মানেই শক্তিপ্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে দমন করা ৷ প্রকাশ্য হত্যা, গুপ্ত হত্যা, লাশ গুম করা, অপহরণসহ এমন কোন মানবতা বিরোধী কর্মকাণ্ড নেই যা প্রতিপক্ষকে দমনের জন্য তারা প্রয়োগ করে না। এ সব কাজের জন্য তেলআবিব সরকার মোসাদ, সিনবেথ ও আমানের মত কুখ্যাত গোয়েন্দা বাহিনী গড়ে তুলেছে। মোসাদ-এর কাজ হলো বিদেশে গোয়েন্দা তৎপরতা চালানো। গোয়েন্দা তৎপরতার আড়ালে এ সংস্থাটি হামাস, হিজবুল্লাহর মত ইসরাইল বিরোধী সংগঠনগুলোর নেতৃবৃন্দকে হত্যা ও অপহরণের মত জঘন্য কাজ করে থাকে। ইসরাইলের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের কিছু দৃষ্টান্ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফিলিস্তিনী ভূখণ্ড জবরদখল করার পর থেকেই ইসরাইল নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে দেশে-বিদেশে গুপ্তহত্যার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। হাজার হাজার ফিলিস্তিনী নাগরিককে হত্যার পাশাপাশি তারা ফিলিস্তিনী নেতৃবৃন্দকেও হত্যা করতে থাকে। ১৯৯৫ সালে ইসলামিক জিহাদ আন্দোলনের নেতা ফাতহে সাকাকীকে হত্যা করে ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা শিনবেথ৷ ২০০১ সালের ৩০ আগস্ট ক্ষেপনাস্ত্র হামলা চালিয়ে পশ্চিমতীরে নিজ অফিসে হত্যা করা হয় পপুলার ফ্রন্ট ফর দ্য লিবারেশন অব প্যালেস্টাইন-এর নেতা আবু আলী মুস্তাফা জাবরীকে ৷ ২০০৪ সালের ২২ মার্চ হামাসের আধ্যাত্মিক নেতা শেখ আহমদ ইয়াসিনকে হত্যা করা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের মাত্র ২৫ দিন পর অর্থাৎ ১৭ এপ্রিল ইসরাইলী রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার হন হামাসের প্রভাবশালী নেতা আব্দুল আজিজ রানতিসি। ১৯৯৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর হামাস নেতা খালেদ মাশআলকে আম্মানে বিষ-প্রয়োগে হত্যার তথ্য জনসম্মুখে ফাঁস হয়ে পড়ায় তাকে হত্যা করা সম্ভব হয়নি। ফিলিস্তিনে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ইসমাইল হানিয়াকেও ইসরাইল হত্যার হুমকি দিয়েছে। হামাসের পাশাপাশি ইসরাইলী বাহিনী লেবাননের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহ নেতৃবৃন্দকেও হত্যার মিশন শুরু করে। ১৯৯২ সালে বিমান থেকে হামলা চালিয়ে হত্যা করে হিজবুল্লাহ নেতা শেখ আব্বাস আল-মুশাওয়ীকে ৷ হিজবুল্লাহর অন্য দুই নেতা শেখ আবদুল করিম ওবেইদ ও মুস্তাফা আল দিরানীকে যথাক্রমে ১৯৮৯ ও ১৯৯৪ সালে অপহরণ করা হয় ৷ ২০০৮ সালে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে ইহুদীবাদী গুপ্ত ঘাতকরা সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে লেবাননের হিযবুল্লাহর সামরিক শাখার প্রধান ইমাদ মুগনিয়াকে তার গাড়িতে বোমা পেতে রেখে হত্যা করে। এভাবে ইহুদীবাদী ইসরাইল সুপরিকল্পিতভাবে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। আর এ সন্ত্রাসের সর্ব-সাম্প্রতিক সংযোজন হচ্ছে, দুবাইয়ে ফিলিস্তিনের ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের শীর্ষস্থানীয় কমাণ্ডার মাহমুদ আল মাবহুর হত্যাকাণ্ড। সেদিন যা ঘটেছিল গত ২০শে জানুয়ারি দুবাইয়ের একটি বিলাশবহুল হোটেলে হামাসের শীর্ষ সামরিক কমাণ্ডার মাহমুদ আল মাবহুকে ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের ঘাতকরা হত্যা করে। টাইমস অব লন্ডন জানিয়েছে, ইসরাইলের ঘাতক দল হামাস নেতার দেহে ইনজেকশন দেয়ার কারণে তার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যায়। শ্বাসরোধ করে এবং ইলেকট্রিক শক দিয়ে হত্যা করা হয় হামাসের এরপর ঘাতক দল হামাস নেতার ব্রিফকেসে যে সব কাগজপত্র ছিলো তার ছবি তুলে এবং হোটেল কক্ষের বাইরে 'বিরক্ত করো না' এই নোটিশ ঝুলিয়ে দিয়ে চুপিসারে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ঘাতক দল তার মৃতদেহ আবিষ্কার হওয়ার আগেই দুবাই ত্যাগ করতে সক্ষম হয় বলে অন্য এক খবরে বলা হয়েছে। মাবহু ছিলেন হামাসের সামরিক শাখা ইযাদ্দিন কাসসাম ব্রিগেডের প্রতিষ্ঠাতা। ৫০ বছর বয়সী মাবহু ১৯৮৯ সাল থেকেই সিরিয়ায় বসবাস করছিলেন। কিন্তু দুবাইয়ে আসার একদিন পরেই তাকে হত্যা করা হয়। ঘাতকদের পরিচয় হামাস নেতাকে হত্যার পর দুবাই পুলিশ সন্দেহভাজন ১১ জনের ছবি ও ফুটেজ প্রকাশ করে জানায়, ঘাতক ইসরাইলী গুপ্তচরদের মধ্যে ছয়জন ব্রিটিশ, তিনজন আইরিশ ও একজন করে জার্মান এবং ফরাসি পাসপোর্ট ব্যবহার করেছে। দুবাই পুলিশ প্রাথমিক তদন্তের পর ১১ জন সন্দেহভাজনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে বলেছে, তাদের সবাই ইউরোপীয় বিভিন্ন দেশের পাসপোর্টে দুবাই এসেছিলো। দুবাই পুলিশ প্রধান দাহি খালফান তামিম বলেছেন, যে ১১ ব্যক্তিকে তারা হত্যাকাণ্ডের দায়ে সন্দেহ করছেন তাদের পাসপোর্টের নামের সাথে তারা বিমানের টিকেট কেনার সময় যে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেছেন, তার হুবহু মিল রয়েছে। এরপর গত ২৪ ফেব্রুয়ারি দুবাই পুলিশ হামাস নেতা হত্যাকাণ্ডে জড়িত নতুন ১৫ জন সন্দেহভাজনের নামের তালিকা ছবিসহ প্রকাশ করে। ঐ ১৫ জনের মধ্যে ৫ জন ব্রিটেনের,৩ জন করে ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার পাসপোর্ট ব্যবহার করেছিল। এ নিয়ে ঘাতক দলের মোট ২৬ জনের পরিচয় প্রকাশ করা হয়। ই.ইউ. ও চার ইউরোপীয় দেশের প্রতিক্রিয়া হামাসের শীর্ষ নেতা মাহমুদ আল-মাবহু হত্যা ইস্যুতে ইউরোপের চার দেশ ব্রিটেন, ফ্রান্স, আয়ারল্যান্ড এবং জার্মানির সাথে ইসরাইলের কূটনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। ঘাতকরা ইউরোপীয় পাসপোর্ট ব্যবহার করায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ২২ ফেব্রুয়ারি ব্রাসেলসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক শেষে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, "আমরা ইউরোপীয় নাগরিকদের পরিচয়পত্র চুরি করে তাদের নামে পাসপোর্ট ব্যবহারের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।" এদিকে অস্ট্রেলিয়ার জাল পাসপোর্ট ব্যবহারের ব্যাপারে ব্যাখ্যা চাওয়ার জন্য অস্ট্রেলিয়ায় নিযুক্ত ইসরাইলী রাষ্ট্রদূতকে তলব করা হয়। অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ইসরাইলের রাষ্ট্রদূতকে তলব করার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী কেভিন রুড বলেছেন, তার সরকার এ ব্যাপারে নীরব থাকবে না। তিনি আরো বলেছেন, দুবাই হত্যাকাণ্ডে ব্যবহারের লক্ষ্যে অস্ট্রেলিয়ার পাসপোর্ট জাল করা হয়ে থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। ব্রিটেন ও আয়ারল্যান্ডও তাদের দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে ইসরাইলী রাষ্ট্রদূতকে তলব করে । ব্রিটেন ঐ হত্যাকাণ্ডের জন্য ইসরাইলকে অভিযুক্ত না করলেও ঘাতকদের মাধ্যমে ছয় বৃটিশ নাগরিকের জাল পাসপোর্ট ব্যবহারের অভিযোগ সম্পর্কে ইসরাইলী রাষ্ট্রদূতের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে। আয়ারল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল মার্টিন ইসরাইলি দূতকে তলব করে জাল আইরিশ পাসপোর্ট ব্যবহারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। হত্যার নির্দেশদাতা খোদ ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দুবাইয়ে হামাস নেতা মাহমুদ আল মাবহু'কে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে খবর পাওয়া গেছে। টাইমস অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানুয়ারি মাসের গোড়ার দিকে নেতানিয়াহু তেলআবিবে ইসরাইলী গুপ্তচর সংস্থা মোসাদের সদর দপ্তরে যান। সেখানে তিনি মোসাদ প্রধান মির দেগানের সাথে বৈঠক করেন এবং সে সময় মোসাদের ঘাতক বাহিনীর কয়েক সদস্য উপস্থিত ছিলো। মোসাদ সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বৈঠকে নেতানিয়াহু হামাস নেতাকে হত্যার প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেন। মাহমুদ আল মাবহু দুবাই সফরে আসবেন বলে খবর পাওয়ার পর মোসাদের মূল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়। এর আগেই ঘাতক বাহিনী তেলআবিবের একটি হোটেলে হত্যাকাণ্ডের রিহার্সেল দেয়। এরপর ২০শে জানুয়ারি হামাস নেতা দুবাইয়ের একটি বিলাসবহুল হোটেলে গুপ্তহত্যার শিকার হন। হামাস নেতা খুন নিয়ে যখন দুবাই, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের মধ্যে টান টান উত্তেজনা চলছিল তখনই ওই হত্যাকাণ্ড নিয়ে মুখ খুলেছেন ইসরাইলের বিরোধী দলীয় নেত্রী, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিপি লিভনি। লিভনি হামাস নেতা হত্যার ঘটনার প্রশংসা করে বলছেন, সন্ত্রাসবাদ দমনের জন্যই এই হত্যাকান্ডকে সমর্থন করা উচিত৷ এর আগে হামাসের শীর্ষ নেতা শেখ ইয়াসিন ও আবদুল আজিজ রানতিসিকে হত্যার পর ইসরাইলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারন সাংবাদিকদের ডেকে বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে ঔদ্ধত্যের সঙ্গে বলেছিলেন, 'আমি রাষ্ট্রীয়ভাবে এসব হামলা পরিচালনা করেছি৷ এধরনের হামলা অব্যাহত থাকবে ৷ আমাদের অভিযান বন্ধ হবে না।' হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে ব্রিটেন অবহিত ছিল হামাস নেতা মাহমুদ আল মাবহুকে হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে ব্রিটেন অবহিত ছিল বলে বৃটিশ দৈনিক ডেইলি মেইল খবর দিয়েছে। দৈনিকটির ১৯ ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় লেখা হয়েছে, ইসরাইলী গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ বৃটিশ পাসপোর্ট ব্যবহার করে দুবাইতে হত্যাকাণ্ড ঘটাবে এই তথ্য বৃটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এম আই-সিক্সকে আগেই অবহিত করা হয়েছিল। মোসাদের একজন এজেন্টের বরাত দিয়ে পত্রিকাটি এ খবর প্রকাশ করেছে। তবে বৃটেনের একটি নিরাপত্তা সূত্র বলেছে, মোসাদ বৃটিশ পাসপোর্ট ব্যবহার করে তাদের অভিযান চালানোর কথা জানালেও কাকে হত্যা করা হবে,তা উল্লেখ করেনি। এর দুদিন আগে অর্থাৎ ১৭ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ সরকারের কয়েকটি সূত্রে বরাত দিয়ে টেলিগ্রাফ জানিয়েছে, ইসরাইলী গুপ্তচর সংস্থা মোসাদ দুবাইয়ে হামাস নেতা মাবহুকে হত্যা করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মোসাদ এজেন্টরা যেহেতু ব্রিটিশ পাসপোর্টও ব্যবহার করেছেন, তাই লন্ডন কর্তৃপক্ষ ইসরাইলী রাষ্ট্রদূতকে তলব করে ব্যাখ্যা চেয়েছে। অথচ সবাই জানে যে, ইসরাইলের প্রতিষ্ঠা ও তাদের সন্ত্রাসী তৎপরতার পেছনে ব্রিটেনের অবদান সবচেয়ে বেশী। গ্রেফতার হতে পারেন নেতানিয়াহু হামাস নেতা হত্যায় ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও মোসাদ প্রধান জড়িত থাকার বিষয়ে দুবাই পুলিশ নিশ্চিত হবার পর পুলিশ প্রধান দাহি খালফান তামিম তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আবেদন জানিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করে বলেছেন, দুবাই পুলিশ হামাস নেতা হত্যাকাণ্ডের দায়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু ও গুপ্তচর সংস্থা মোসাদের প্রধানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির যে আবেদন জানিয়েছে, তেলআবিব সে ব্যাপারে নীরবতা পালন করছে। খালফান বলেছেন, মাবহুকে হত্যার পর তার দুই ঘাতক যুক্তরাষ্ট্রে এবং বাকিরা ইসরাইলে আশ্রয় নিয়েছে। যেসব ঘাতক ইসরাইলে আশ্রয় নিয়েছে তারা অন্য দেশে যাওয়া মাত্রই তাদের গ্রেফতার করা হবে বলে তিনি জানান। ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল দুই দফায় ২৭ ঘাতকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির লক্ষ্যে বিশ্বের ১৮৮টি দেশে নোটিশ পাঠিয়েছে। ইসরাইল ও তার মিত্রদের করণীয় দুবাইয়ে হামাস নেতা হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী ঘাতকরা ইউরোপের কয়েকটি দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করায় ফ্রান্স, ব্রিটেন, আয়ারল্যাণ্ড ও জার্মানী ক্ষোভ প্রকাশ করলেও ইউরোপ ও আমেরিকার প্রভাবশালী দেশগুলোর সমর্থন, সাহায্য ও পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই ইসরাইল অব্যাহতভাবে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের কারণেই গাজায় নৃশংস হত্যাযজ্ঞের পরও ইসরাইলের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ কিছুই করতে পারছে না। ইউরোপের দেশগুলো যদি সত্যিই ইসরাইলের ওপর নাখোশ হয়ে থাকে তাহলে তাদের উচিত তেলআবিবকে সবধরনের সমর্থন ও সহযোগিতা দেয়া বন্ধ করা। যুদ্ধাপরাধ ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের দায়ে ইসরাইলী কর্মকর্তাদের বিচারের সম্মুখীন করার উদ্যোগ নেয়া উচিত। আর ইসরাইলী নেতাদেরও মনে রাখা উচিত, ফিলিস্তিনী নেতাদের হত্যা করে ইসরাইল বিরোধী গণ-আন্দোলন বন্ধ করা যাবে না।

Tuesday, January 19, 2010

ইন্টারনেট প্রযুক্তিতে বাংলার ব্যবহার ও জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে 'বাংলা'র অন্তর্ভূক্তি দাবী

বর্তমান বিশ্বের সাড়ে ৬০০ কোটি মানুষ প্রায় ৬ হাজার ভাষায় কথা বলে। তবে ভাষাতত্ত্ববিদরা মনে করছেন, আগামী একশ বছরের মধ্যে প্রায় তিন হাজার ভাষা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কারণ অতীতেও অনেক ভাষা পৃথিবী থেকে হারিয়ে গেছে। একসময় পাশ্চাত্যের একটি বিখ্যাত ভাষা ছিল ‘ল্যাটিন’ । কিন্তু এ ভাষায় এখন আর কেউ কথা বলে না। ভারতীয় উপমহাদেশের এমন একটি ভাষার নাম ‘সংস্কৃত’ । ধর্মীয় কাজের বাইরে এর কোন ব্যবহার নেই। মধ্যযুগে ব্রিটেনের একটি ভাষা ছিল ‘কর্নিশ’। ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত একজন মহিলা জীবিত ছিলেন যিনি ঐ ভাষায় কথা বলতেন। তার মৃত্যুর পর ঐ ভাষাটিও বিলুপ্ত হয়ে যায় । ‘The languages of the world’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের জরিপ অনুযায়ী, পৃথিবীতে প্রায় ৬ হাজারের মতো ভাষা আছে। এগুলোর মধ্যে মাত্র ৪ শতাংশ অর্থাৎ শ'তিনেক ভাষায় পৃথিবীর ৯৬ ভাগ মানুষ কথা বলে। বাকী সাড়ে পাঁচ হাজার ভাষার মধ্যে যেসব ভাষায় কথা বলার লোক এক লাখের বেশী নেই, সেগুলোর মধ্যে বেশকিছু ভাষা এখন বিলুপ্তির পথে। এক হিসেবে দেখা গেছে, আজকের পৃথিবীতে প্রতি দুই সপ্তাহে একটি করে ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, পৃথিবীতে এমন ৫১টি ভাষা আছে যেগুলোর প্রতিটিতে মাত্র একজন করে ব্যবহারকারী রয়েছে! এ চিত্র থেকে একটা বিষয় পরিস্কার যে, বিশ্বের জীবন্ত ভাষাগুলো দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। এই বিলুপ্তির হার বন্যপ্রাণী কিংবা গাছপালা বিলুপ্তির হারের চেয়েও বেশী। কিন্তু বাংলাভাষার ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত দেখা যায়। বিশ্বে বাংলা ভাষার অবস্থান বর্তমান বিশ্বে প্রায় ২৬ কোটি মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। ব্যবহারকারীর সংখ্যার দিক থেকে বাংলা ভাষার স্থান ষষ্ঠ। শুধু বাংলাদেশের মানুষই যে এ ভাষায় কথা বলে তা নয় বরং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মণিপুর, বিহার ও উড়িষ্যা এবং মিয়ানমারের আরাকান অঞ্চলের রোহিঙ্গারাও বাংলা ভাষায় কথা বলে। আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিয়নে বাংলাকে ২য় সরকারী ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যদিয়ে সেদেশের জনগণ বাংলাভাষা শিক্ষা করছে। বাংলা ভাষার আন্দোলন বিশ্বে বাংলাই সম্ভবতা একমাত্র ভাষা-যার মর্যাদা রক্ষার জন্য ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারী ঢাকায় পুলিশের গুলিতে আব্দুস, সালাম,রফিক, বরকত, জব্বার সহ আরো অনেকে প্রাণ দিয়েছেন। এই ঘটনার প্রতিবাদে সারা পূর্ব পাকিস্তানে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে ও তীব্র আকার ধারণ করে। অবশেষে পাকিস্তান সরকার বাংলাকে উর্দুর সম-মর্যাদা দিতে বাধ্য হয়। এছাড়া ’৫২-এর চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়ে ১৯৬১ সালের মে মাসে বাংলা ভাষার ব্যবহার বন্ধ করার প্রতিবাদে ভারতের আসামের শিলচর শহরে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছেন ১১ জন। ১৯৬১ সালে আসাম প্রাদেশিক সরকার শুধু অহমীয়া ভাষাকে রাজ্যের একমাত্র সরকারী ভাষা ঘোষণা দিলে বাঙালীদের ভেতর ক্ষোভ দানা বাঁধে । ক্রমশঃ তা আন্দোলনে রূপ নেয় । ১৯ মে শিলচরে সকাল ৬টা-সন্ধ্যা ৬টা ধর্মঘট পালন করে। বেলা সাড়ে তিনটায় ভাষাবিপ্লবীরা যখন স্থানীয় রেলওয়ে ষ্টেশনে রেলপথ অবরোধ পালন করছিল তখন আসাম রাইফেলসের একটি ব্যাটালিয়ান তাদের বাধা দিলে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে আসাম রাইফেলস গুলবর্ষণ করলে ঘটনাস্থনে প্রাণ হারান ১১জন ভাষাবিপ্লবী। রাজ্য সরকার শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বাতিল করতে বাধ্য হয়। এরপর আসামে বাংলাকে ২য় রাজ্যভাষা হিসাবে ঘোষণা করা হয়। বাংলা ভাষার প্রতি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাংলা ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায় করতে গিয়ে বাঙালীরা যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন তা ইউনেস্কোর নজরে আনার জন্য কানাডা প্রবাসী বাংলাদেশীদের সংগঠন ‘মাদার ল্যাংগুয়েজ অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড’ প্রচেষ্টা শুরু করে। ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর তাদের প্রচেষ্টা সফল হয়। ওই দিন ইউনেস্কোর ৩০তম অধিবেশনে বাংলাদেশ ও সৌদি আরব ২১শে ফেব্রুয়ারীকে ‘আন্তজার্তিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসাবে স্বীকৃতি জানানোর প্রস্তাব উত্থাপন করে এবং অপর ২৫টি দেশের সদস্যরা সেটিকে অনুমোদন করে। এরপর থেকে সারা বিশ্বে প্রতি বছর পালিত হয়ে আসছে 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।' ইউনেস্কোর পর জাতিসংঘও একুশে ফেব্রুয়ারিকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০০৮ সালের গত ৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্র দফতর ‘শান্তির জন্য সংস্কৃতি’ শীর্ষক একটি রেজুলেশন জাতিসংঘ সাধারণ অধিবেশনে তুলে ধরে। ভারত, জাপান, সৌদি আরব, কাতারসহ বিশ্বের ১২৪টি দেশ এই রেজুলেশনটি সমর্থন করে। এই রেজুলেশনে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে এবং শান্তির জন্য সংস্কৃতি ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংস্কৃতির সংলাপকে উৎসাহিত করতে মাতৃভাষাগুলোর অবদানের স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাকে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা করার দাবি ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে জাতিসংঘ ভাষা শহীদদের প্রতি নিঃসন্দেহে ব্যাপক সম্মান দেখিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ এতেই কি সন্তুষ্ট ? মোটেই না। আর এ জন্যই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৬৪তম অধিবেশনে বাংলাভাষাকে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে গ্রহণ করার জন্য সদস্য দেশগুলোর সমর্থন চেয়েছেন । ভাষা আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা বাংলার জন্য বাংলাদেশের ভাষা শহীদরা জীবন দিয়েছিলেন। সেদিনের স্বীকৃতি স্বরূপ প্রতি বছর এই দিন ইউনেস্কো বিশ্বের সকল ভাষার প্রতি সম্মান দেখিয়ে দিবসটি পালন করে।’ শেখ হাসিনা বলেন, ‘সম্প্রতি আমাদের পার্লামেন্ট জাতিসংঘকে অনুরোধ করেছে বাংলাকে এর অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার জন্য। ভাষার শক্তির প্রতি জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে বাংলাকে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে গ্রহণ করতে আমি সকল সম্মানিত সদস্যের সমর্থন কামনা করছি।’ বাংলাকে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়ার ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দাবির সাথে একমত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। গত ২১শে ডিসেম্বর ২০০৯ জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলাকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবিসংবলিত একটি সর্বদলীয় প্রস্তাব পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় গৃহীত হয়েছে। প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার স্পিকার হাসিম আবদুল হালিম। জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে এখন ছয়টি ভাষা স্বীকৃত। এসব ভাষা হলো- ইংরেজি, চাইনিজ, আরবি, ফরাসি, রাশিয়ান ও স্প্যানিস। এর মধ্যে রাশিয়ান ভাষায় কথা বলে বিশ্বের প্রায় ১৭ কোটি মানুষ এবং বিশ্বের প্রায় ২২ কোটি মানুষ আরবিতে কথা বলে । কিন্তু বাংলায় কথা বলে প্রায় ২৬ কোটি মানুষ। ফলে রুশ ও আরবি যদি জাতিসংঘের অফিশিয়াল ভাষা হওয়ার যোগ্যতা রাখে তাহলে বাংলা কেন পারবে না? সরকার যদি কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করে তাহলে একদিন না একদিন বাংলাভাষা অবশ্যই জাতিসংঘের অফিশিয়াল ভাষার স্বীকৃতি পাবে। আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বাংলা ভাষা বর্তমানে বিভিন্ন সংবাদ সংস্থা, রেডিও, টেলিভিশন, ও ইন্টারনেটে ব্যাপকভাবে বাংলা ব্যবহৃত হচ্ছে। বাংলাদেশ,ভারত ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, জার্মানী, চীন, ইরান, সৌদি আরব, পাকিস্তান, ফিলিপাইন,জাপান প্রভৃতি দেশ থেকে প্রতিদিনই বাংলা ভাষায় রেডিও অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়ে থাকে। এছাড়া ব্রিটেন, কানাডার প্রবাসী বাংলাদেশীদের উদ্যোগে টিভি অনুষ্ঠানও প্রচার করা হচ্ছে। এসব রেডিও, টিভির অনুষ্ঠান থেকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালীদের পাশাপাশি বাংলাদেশ ও ভারতের বাংলাভাষীরা উপকৃত হচ্ছেন। ইন্টারনেট প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার ছাড়া বর্তমান যুগে কোন দেশই অগ্রসর হতে পারবে না। আর একারণেই ভাষাপ্রেমী প্রযুক্তিবিদরা তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার ব্যবহার নিয়ে অনেকদিন ধরেই কাজ করে যাচ্ছেন। বাঙালী প্রযুক্তিবিদদের প্রচেষ্টায় বর্তমানে ফায়ারফক্স ব্রাউজার,ওপেন অফিস, জুমলা,গুগল, লিনাক্স, উবুন্টু এসব বাংলা ভাষায় রূপান্তর করা হয়েছে। ওয়েব ব্রাউজার মজিলা সম্প্রতি আটটি ভাষাতে বেটা সংস্করণ অবমুক্ত করেছে। এই আটটি ভাষার মধ্যে আমাদের মাতৃভাষা বাংলাও আছে। এর ফলে এখন থেকে আমরা বাংলা ভাষার ইন্টারফেসের ফায়ারফক্স ব্যবহার করতে পারবো। ফায়ারফক্সে এখন বাংলা অভিধানও যুক্ত আছে। সেটি সক্রিয় করে বাংলা লিখলে লেখার সময় বানানে ভুল হলে সতর্ক করা হয়। গুগলের দারুণ দারুণ সব সার্ভিস সম্পর্কে আমরা কে না জানি! গুগল সার্চ ইঞ্জিনে বাংলা অনেক আগে থেকে যুক্ত হলেও সার্চের সময় বাংলা অটো-কমপ্লীট যুক্ত হয়েছে কিছুদিন আগে। গুগলের আর একটি ভাল সার্ভিস হচ্ছে google transliteration, যে সব সাইটে বাংলা লেখার ব্যবস্থা নেই, সে সব ওয়েব ব্রাউজারে খুব সহজেই বাংলা লেখা সম্ভব। গুগল ট্রান্সলেটরে বাংলা ভাষা না থাকলেও গুগল অভিধানে সম্প্রতি বাংলা ভাষা যুক্ত হয়েছে। বহুল পরিচিত ও জনপ্রিয় সোসাল সাইট ফেসবুকেরও বাংলা রূপান্তর করা হয়েছে। ব্লগার ডট কম আংশিক বাংলা ভার্সন তৈরি হয়েছে প্রায় বছর খানেক আগেই। সম্প্রতি এ কার্যক্রম তাদের জনপ্রিয় মেইল সার্ভিসেও প্রয়োগ করেছে। বলতে গেলে পুরো বাংলাতেই এখন কম্পিউটারের অনেক কিছু ব্যবহার করা সম্ভব। উইকিপিডিয়া ও বাংলাপিডিয়ায় বাংলা ইন্টারনেটে বাংলা ভাষার সবচেয়ে বড় তথ্যভাণ্ডার হচ্ছে বাংলা উইকিপিডিয়া। ইন্টারনেটে মুক্ত বাংলা বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ার নিবন্ধের সংখ্যা ২০ হাজার অতিক্রম করেছে। প্রসঙ্গত ২০০৪ সালে বাংলা উইকিপিডিয়ার কাজ শুরু হলেও শুরুতে এর অগ্রগতি ছিল ধীরগতির। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের বাংলা উইকি দল গঠনের পর থেকে দ্রুত এটি বিস্তৃত হতে থাকে। এখানে বাংলা ভাষার ইতিহাস,বাংলা বর্ণের উৎপত্তির বর্ণনা পাওয়া যায়। এছাড়া ভাষা আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের দিনপঞ্জিও রয়েছে। এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত একটি বিশ্বকোষ হলো বাংলাপিডিয়া। ২০০৩ সালে ১০ খন্ডে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই এটি ছাপা হয়। এছাড়া এর ইলেকট্রনিক সংস্করণও প্রকাশিত হয়। এখানে প্রায় ১২০০ লেখকের লেখা স্থান পেয়েছে। ওয়েবসাইটেও এসব তথ্য বিদ্যমান। বাংলা ভাষা, ভাষা আন্দোলন, একুশে ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সম্পর্কে বাংলায় প্রচুর তথ্য রয়েছে। প্রয়োজন সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার অমর একুশকে জাতিসংঘের স্বীকৃতি, সিয়েরা লিয়নে বাংলাকে দ্বিতীয় ভাষার মর্যাদাদান এবং ইন্টারনেট প্রযুক্তিতে বাংলা ভাষার বহুল ব্যবহারের পরও বাংলা ভাষার ব্যবহার ও চর্চার ব্যাপক ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামের মানুষজন আঞ্চলিক বাংলায় কথা বললেও শহরাঞ্চল বিশেষকরে রাজধানী কোলকাতার অধিকাংশ বাঙালী ইংরেজি ও হিন্দির চর্চা করে। ফলে বাংলা ভাষা সেখানে আত্মাহুতি দেয়ার মুখে। এ দিকটি লক্ষ্যে করেই ভারতের বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কয়েক বছর আগে বলেছিলেন, “আগামী পঞ্চাশ বছর পরে বাংলা ভাষার চর্চা হবে কেবলমাত্র ঢাকা কেন্দ্রিক।” সুনীল বাবুর বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ নিয়ে যে মন্তব্য করেছেন, তা যথার্থ কিনা তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ আছে। কারণ খোদ বাংলাদেশের উচ্চ আদালতে ভাষার ব্যবহার এখনও চালু হয়নি । উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষা এখনও উপেক্ষিত। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও বাংলা ভাষার চর্চা নেই। অনার্স, মাস্টার্স কিংবা পিএইচডি কোর্স কোথাও বাংলা সাহিত্যের জায়গা নেই। অথচ মহান ভাষা আন্দোলনের মূল দাবি ছিলো- ‘অফিস আদালতে সর্বত্র বাংলাভাষা ব্যবহার করতে হবে । আমাদের সংবিধানের প্রথমেই শেখা আছে,‘প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা’। কিন্তু তারপরও সর্বস্তরে বাংলাভাষা চালু এবং ‘শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বাংলাভাষা’ চালু কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের কোন উদ্যোগ এখনো নেই। নিজ দেশের সর্বত্র যদি আমরা বাংলা ভাষার ব্যবহার না করতে পারি তাহলে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে বাংলাকে অন্তর্ভূক্তির চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে।

Wednesday, August 19, 2009

পাশ্চাত্যের মানুষ পুনরায় চারিত্রিক পবিত্রতার দিকে ঝুঁকছে

এক. মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই সততা ও চারিত্রিক পবিত্রতাকে পছন্দ করে। অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, মানুষ যতই নৈতিক মূল্যবোধগুলোর প্রতি আগ্রহী হয়, ততই তাদের নিরাপত্তা বৃদ্ধি পায়। পাশ্চাত্যে দীর্ঘকাল ধরে নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় সেখানকার নারী, পুরুষ, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। এ অবস্থায় সেখানকার নতুন প্রজন্মের কন্যা ও মেয়েরা পুনরায় চারিত্রিক পবিত্রতার দিকে ঝুঁকছে। তারা এখন অশ্লীলতা, ব্যাভিচার ও বিভিন্ন যৌন অনাচারের অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবার জন্য আকুল হয়ে উঠেছে। পাশ্চাত্যের নতুন প্রজন্ম, বিশেষ নারী সমাজের একটা অংশসহ তরুণী ও যুবতীদের একটা বড় অংশ স্বাধীনতার নামে যৌন অনাচার ও অশ্লীলতা প্রসারের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির কঠোর বিরোধিতা করছে। যদিও পাশ্চাত্যের প্রচারমাধ্যমগুলো এ ধরনের তথ্য প্রচার করছে না, বরং বিপরীত তথ্যই প্রচার করছে। আই জি নামের নিউইয়র্ক-ভিত্তিক একটি জরীপ ও গবেষণা-প্রতিষ্ঠানের রিপোর্টে বলা হয়েছে, নিউইয়র্কের নতুন প্রজন্মের মেয়েরা তাদের আগের প্রজন্মগুলোর পছন্দের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন। অর্থাৎ সেখানকার এই প্রজন্মের মেয়েরা নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াতে এবং শরীরকে ফুটিয়ে তোলার জন্য ব্যবহৃত পোশাক-পরিচ্ছদ পরতে মোটেই আগ্রহী নয়। পাশ্চাত্যের নতুন প্রজন্ম, বিশেষ নারী সমাজের একটা অংশসহ তরুণী ও যুবতীদের একটা বড় অংশ স্বাধীনতার নামে যৌন অনাচার ও অশ্লীলতা প্রসারের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির কঠোর বিরোধিতা করছে। বরং তারা আধ্যাত্মিক ও আত্মিক চাহিদাগুলোর প্রতি বেশী গুরুত্ব দেয়ার দাবী জানাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে মার্কিন লেখিকা ওয়েন্ডি শালিত বলেছেন, আমরা সাংস্কৃতিক দিক থেকে এক স্পর্শকাতর সময়ের সম্মুখীন। পাশ্চাত্যে এখন ক্ষতিকারক সংগীত, বিভিন্ন ধরনের উস্কানীমূলক তৎপরতা, পরিবার ব্যবস্থায় ধ্বস, বিবাহ-বিচ্ছেদ, মাদকাসক্তি ও আদর্শিক অচলাবস্থা নারী ও কন্যাদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। বর্তমান প্রজন্মের যুবতী ও কন্যারা অতীতের প্রজন্মের চেয়ে ভিন্ন ধরনের। তারা অবাধ বা লাগামহীন স্বাধীনতায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে, বরং তারা পুনরায় মানুষের প্রকৃতিগত সৎ-স্বভাব বা সতীত্বের মাধুর্য আস্বাদন করতে চাইছে। মার্কিন লেখিকা ওয়েন্ডি শালিত আরো বলেছেন, পাশ্চাত্যের বর্তমান প্রজন্মের যুবতী ও কন্যারা তাদের বাবা মায়েদের মত হাল্কা জীবন-যাপনে অভ্যস্ত হতে চাইছে না। তারা তাদের পোশাকেও পরিবর্তন আনতে চাইছে। বরং তারা সংযম ও বিচক্ষণতা অবলম্বন করে সতীত্বকে যথাসম্ভব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। মিসেস রাচেল এ প্রসঙ্গে বলেছেন, প্রথম দিকে আমি সতীত্বের গুরুত্বের ব্যাপারে সন্দিহান ছিলাম। কিন্তু সতীত্ব সম্পর্কে মার্কিন লেখিকা ওয়েন্ডি শালিতের বই পড়ে এখন আমার চোখ খুলে গেছে। আমি এখন বুঝতে পেরেছি যে সঠিক পথ কোনটি। মহান প্রভুকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি যে আমি সময়মত এ বই পেয়েছি। আমি এখন সতীত্ব বজায় রাখার জন্য নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করছি এবং আমার মধ্যে জন্ম নিয়েছে আত্ম-বিশ্বাস। পাশ্চাত্যের অনেক মানুষ এখন যৌন অনাচার ও ব্যাভিচারের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়ার জোর চেষ্টা চালাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৪ সালে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সেখানকার যুব প্রজন্মের যেসব সদস্য অবৈধ যৌন সম্পর্কে জড়িত হয়েছে তাদের দুই তৃতীয়াংশই এখন অনুতপ্ত। ২০০৫ সালে পরিচালিত অন্য এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিয়ের আগে যারা যৌন সম্পর্কে জড়িত হয়েছে এবং যারা মদ ও মাদক সেবনে অভ্যস্ত হয়েছে তারা যৌবনের এই সোনালী বয়সেই বিষন্নতা ও হতাশা বা নৈরাশ্যের শিকার। বিষন্নতার কারণে অনেক যুবতী শারীরীকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। এ ধরনের যুবতী ও তরুনীরা এখন সতীত্ব বজায় রাখতে না পারার জন্য অনুশোচনা করছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানাপলিস অঙ্গরাজ্যের ১৬ বছরের যুবতী লরেন অত্যন্ত কৃতী ছাত্রী হিসেবে পরিচিত। সে এখন নাইট-ক্লাবের বিভিন্ন পার্টির প্রতি বিতৃষ্ণ। তার মতে চিত্ত-বিনোদনের নামে সমবয়সী ছেলে বন্ধুদের সাথে রাত না কাটিয়ে মেয়েদের উচিত সমবয়সী মেয়েদের সাথেই অবসর-বিনোদনকে গুরুত্ব দেয়া । ২০০৬ সালে জগবি নামের খ্যাতনামা জরীপ সংস্থার এক জরীপে বলা হয়েছে, মার্কিন হাইস্কুলগুলোর দুই তৃতীয়াংশ ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের আচরণের ওপর বাবা-মায়ের নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারী রাখাকে জরুরী বলে মনে করছে। তারা চায় বাবা-মায়েরা তাদেরকে খারাপ স্থানে বা ক্ষতিকারক আড্ডায় যেতে নিরুৎসাহিত করুক। পাশ্চাত্যের কোনো কোনো স্থানের যুবক-যুবতীরা এখন ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে সংযমী হবার প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছে। এ ধরনের প্রশিক্ষণ ক্লাসে তারা তাদের সম্ভাব্য সমস্যা ও সেগুলোর সমাধান নিয়ে আলোচনা বা পরামর্শ করার সুযোগ পাচ্ছে। পাশ্চাত্যের অনেক যুবক-যুবতী এখন যৌন অনাচার ও ব্যাভিচারের বিস্তারের অন্যতম প্রভাবক বা চালিকা-শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত অশ্লীল ছায়াছবি, নাটক ও ম্যাগাজিনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। তাদের অনেকেই এখন লেখক লেখিকাদেরকে তাদের গল্প বা চিত্র-নাট্য থেকে যৌন-সম্পর্ক বিষয়ক বক্তব্য বা দৃশ্যগুলো বাদ দেয়ার অনুরোধ করছে। তাদের অনেকেই এখন এসব অশ্লীল বিষয়কে বস্তাপচা বিষয় বলে মনে করছে এবং তারা বলছে, আমরা নতুন অথচ ভালো কিছু চাই। আজকের এই আলোচনা শেষ করবো টেইলর ম্যুর নামের ১৮ বছর বয়স্ক এক মার্কিন যুবতীর বক্তব্য উদ্ধৃত কোরে। সংযম বিষয়ক প্রশিক্ষণ ক্লাসে অংশ গ্রহণকারী এই যুবতী তার সমবয়সী নতুন প্রজন্মের মেয়েদের উদ্দেশ্যে বলছেন, বন্ধুরা, সংযম খুবই ভালো কাজ। আমি অত্যন্ত গর্বের সাথে বলতে চাই যে আমি চারিত্রিক পবিত্রতা বা সতীত্ব বজায় রেখেছি। আসুন আমরা সবাই মূল্যবোধের প্রতি অবিচল থাকি। যৌন প্রবৃত্তিকে কেবল পরিবার গঠন ও মানুষের বংশ বিস্তার অব্যাহত রাখার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে। সতীত্ব বা চারিত্রিক পবিত্রতা বজায় রাখা হলে মানুষের সত্তার সম্মান সব সময় বজায় থাকবে। দুই. মানুষ প্রকৃতিগতভাবেই সততা ও চারিত্রিক পবিত্রতাকে পছন্দ করে। মানুষ যতই নৈতিক মূল্যবোধগুলোর মেনে চলে, ততই তাদের নিরাপত্তা বাড়ে। পাশ্চাত্যে দীর্ঘকাল ধরে নৈতিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয় সেখানকার নারী, পুরুষ, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অপূরণীয় ক্ষতি করেছে। এ অবস্থায় কন্যা ও মেয়েরাসহ সেখানকার নতুন প্রজন্মের অনেকেই পুনরায় চারিত্রিক পবিত্রতা এবং আধ্যাত্মিকতার দিকে ঝুঁকছে। পাশ্চাত্যের নতুন প্রজন্ম, বিশেষ নারী সমাজের একটা অংশসহ তরুণী ও যুবতীদের একটা বড় অংশ স্বাধীনতার নামে যৌন অনাচার ও অশ্লীলতা প্রসারের প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গির কঠোর বিরোধিতা করছে। যদিও পাশ্চাত্যের প্রচারমাধ্যমগুলো এ ধরনের তথ্য গোপন রেখে বিপরীত তথ্যই প্রচার করছে। আই জি নামের নিউইয়র্ক-ভিত্তিক একটি জরীপ ও গবেষণা-প্রতিষ্ঠানের রিপোর্টে বলা হয়েছে, নিউইয়র্কের নতুন প্রজন্মের মেয়েরা নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াতে এবং শরীরকে ফুটিয়ে তোলার জন্য ব্যবহৃত টাইট পোশাক-পরিচ্ছদ পরতে মোটেই আগ্রহী নয়। আই জি প্রতিষ্ঠানের গবেষক মিলিসা লাভিজেন তার প্রতিষ্ঠানের পরিসংখ্যান ভিত্তিক এই রিপোর্ট বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছেন, নিউইয়র্কের নতুন প্রজন্মের মেয়েরা নিজেদের শরীর আগের চেয়েও বিস্তৃতভাবে ঢেকে রাখতে বা পোশাকে আবৃত করতে পছন্দ করছে। লাভিজেন আরো বলেছেন, আমাদের বিশ্বাস নিউইয়র্কের নতুন প্রজন্মের মেয়েদের এই পরিবর্তিত আচরণের মূল কারণ হল, লাগামহীন জীবন-যাত্রার প্রতি স্বাভাবিক দৃষ্টিভঙ্গি। উল্লেখ্য, "সব কিছুই অস্থায়ী"-এই শ্লোগানের ভিত্তিতে শুরু হয়েছিল লাগামহীন জীবন-যাত্রা। বর্তমানে এরই প্রতিক্রিয়া হিসেবে তরুণী ও যুবতীরা নিজেদের দেহ অতীত প্রজন্মের চেয়ে অনেক বেশী ঢেকে রাখছে বা পোশাকে আবৃত করছে। মিসেস লাভিজেনের মতে, পাশ্চাত্যে কয়েক দশক ধরে অশালীন বা অর্ধনগ্ন পোশাকের সংস্কৃতির আধিপত্যের পর এখন সেখানকার মানুষ আরো ভালো ও উন্নত পোশাক অনুসন্ধান করছেন। আই জি প্রতিষ্ঠানের গবেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রজন্মের মেয়েরা অন্য যে কারনে তাদের আগের প্রজন্মগুলোর পছন্দের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছেন তা হল, বর্তমান পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানোর আকাঙ্ক্ষা এবং আরো বেশী নিরাপত্তার প্রত্যাশা। এই গবেষকরা বলছেন, ধর্মের প্রতি আগ্রহ, গীর্যায় যাওয়া, লাগামহীন জীবন-যাত্রার গণ-সংস্কৃতির মোকাবেলা- এসব থেকে বোঝা যায় যুব-প্রজন্ম বর্তমান পরিস্থিতি বা পরিবেশের ওপর আরো ভালো নিয়ন্ত্রণ রাখতে চান। পাশ্চাত্যের অনেক যুবতী বা তরুণীর মধ্যে এই শুভ বুদ্ধির উদয় হয়েছে যে, শালীন পোশাক ব্যক্তি ও সমাজের পবিত্রতা এবং সুস্থতার জন্য অপরিহার্য্য। যে পরিবেশে নারী ও কণ্যারা শালীনতার সীমা লংঘনে অভ্যস্ত নয়, সেখানে সহজেই সামাজিক ও অর্থনৈতিক তৎপরতা চালানো যায় বলে তারা বুঝতে পেরেছে। প্যানসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কল্ওয়ি হার্লি ২০০৬ সালের শরৎকালে আনুষ্ঠানিক পোশাকের পরিবর্তে যেমন-খুশি-তেমন পোশাক পরে ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীদের উপস্থিত হবার প্রতিবাদ জানান। তিনি কর্মস্থলে ও ক্লাসে আনুষ্ঠানিক শালীন পোশাক পরার প্রথা পুনরায় চালু করার আহ্বান জানিয়ে এক খোলা চিঠিতে বলেন, "শিক্ষার্থীদের পোশাক কি এমন হওয়া উচিত নয় যে তা থেকে পড়াশুনার প্রতি তাদের আন্তরিকতা বা আগ্রহ ফুটে উঠবে? আমার মতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক পোশাক শিক্ষক, সহপাঠি এবং সর্বোপরি নিজের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নিদর্শন। শিক্ষার্থী যখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক ও শালীন পোশাক পরে ক্লাসে উপস্থিত হয়, তখন তা এ অর্থ বহন করে যে সে এই শিক্ষা-বৈঠকের অন্য সদস্যদের সম্মান জানাচ্ছে এবং এ ধরনের বৈঠকে সে সবচেয়ে ভালো পন্থায় উপস্থিত থাকার অঙ্গীকার করছে।" পাশ্চাত্যের কোনো কোনো তরুণী ও যুবতী অশালীন পোশাকের ব্যাপারে পোশাক-ব্যবসায়ী বা পোশাক মার্কেটের কর্মকর্তা, গণমাধ্যম ও পত্র-পত্রিকায় প্রতিবাদ-লিপি পাঠাচ্ছেন। এই তরুণী ও যুবতীরা শরীর-প্রদর্শনীমূলক বা অশালীন পোশাক পরতে রাজী নন। এল্লা গান্ডারসন ওয়াশিংটনের সিয়াটল শহরের বাসিন্দা। ১৭ বছর বয়স্ক এই তরুণী সম্পতি আরো সংযত বা শালীন পোশাক সরবরাহ করতে নর্ডস্টর্ম নামের একটি পোশাক বিক্রয় কেন্দ্রে চিঠি লিখেছেন। তার ঐ চিঠি মার্কিন গণমাধ্যমগুলোতে গুরুত্বের সাথে প্রকাশিত হয়েছে এবং এর ফলে পোশাকের মডেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আবারও বিতর্ক জোরদার হয়ে উঠেছে। ঐ চিঠির একাংশে এল্লা গান্ডারসন বলেছেন, "নর্ডস্টর্মের সম্মানিত পরিচালক, আমি আপনার বিক্রয়-কেন্দ্রে এসেছিলাম পোশাক কিনতে। কিন্তু এখানে সব পোশাকই ছিল সংকীর্ণ ও শরীরকে দৃষ্টিকটুভাবে ফুটিয়ে তোলার পোশাক। আপনার বিক্রেতারা জানালেন, আমাদের কাছে কেবল এই এক ডিজাইনের পোশাক রয়েছে। যদি এ কথা সত্য হয়, তাহলে তো আমি বা অন্য যে কোনো মেয়েকে অর্ধনগ্ন পোশাক পরেই সড়গুলোতে চলা-ফেরা করতে হবে। আমার মতে, এ ধরনের প্রবণতা বা দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। " কয়েকমাস পর নর্ডস্টর্মের একজন প্রতিনিধি এই সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে বলে এল্লাকে নিশ্চয়তা দেন। অশালীন পোশাকের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের নতুন প্রজন্মের প্রতিবাদের মুখে কোনো কোনো পশ্চিমা বিক্রেতা কাঙ্ক্ষিত শালীন পোশাকের প্রদর্শনীর আয়োজন করেছেন। এ ধরনের শালীন পোশাক প্রদর্শনীর ধারণা চালু হয় ১৯৯৯ সালে। সে সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একদল মা তাদের মেয়েদের দিয়ে এ ধরনের প্রদর্শনীর আয়োজন করেন। এই মেয়েরা ছিল একটি ধর্মীয় গ্রুপের সদস্য। ২০০৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মেয়েদের অংশগ্রহণে দেশটির ১৭ টি শহরে এ ধরনের শালীন পোশাকের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। সিয়াটলের ১৮ বছর বয়স্ক যুবতী রবিন মনে করেন, অশালীন পোশাক অন্যদেরকে এই পোশাকধারী সম্পর্কে বাস্তব ও মানবীয় মূল্যবোধের পরিবর্তে তার বাহ্যিক দিকের আলোকে বিচারের আহ্বান জানায়; আর এ বিষয়টি সমাজে নারীর মূল্যকে কমিয়ে দেয়। এভাবে দেখা যাচ্ছ পাশ্চাত্যের নারী সমাজের নতুন প্রজন্ম ধীরে ধীর শালীন পোশাক সম্পর্কে পশ্চিমা সমাজে একটা শক্ত অবস্থানের ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। তাই দেখা যাচ্ছে ম্যাগীর মত ৩৩ বছর বয়স্ক মার্কিন মহিলা সতীত্বের বা চারিত্রিক পবিত্রতার শিল্প শীর্ষক বই লিখে নারীর সম্মান বৃদ্ধির জন্য তাদেরকে শালীন ও সম্মানজনক পোশাক পরার এবং পরপুরুষদের আকৃষ্ট করার জন্য সাজ-সজ্জা না করতে নারীদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন, যাতে পুরুষরা মানুষ হিসেবে নারীকে সম্মান জানায়। পাশ্চাত্যের অনেক যুবক-যুবতী এখন যৌন অনাচার ও ব্যাভিচারের বিস্তারের অন্যতম প্রভাবক বা চালিকা-শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত অশ্লীল ছায়াছবি, কুরুচিপূর্ণ সঙ্গীত, নাটক ও ম্যাগাজিনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। ২০০৫ সালের জুলাই মাসে লন্ডনে কয়েকজন তরুণী অশ্লীল ছবি প্রকাশের জন্য কয়েকটি ম্যাগাজিনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে ধর্মঘট পালন করে। পাশ্চাত্যের অনেক যুবক-যুবতী এখন নৈতিক সংযমের প্রশিক্ষণ-ক্লাসে অংশ নিচ্ছেন। এটা খুবই উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি যে, যেসব সমাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ ও বাবা-মায়েরা নিজ সন্তানদেরকে চারিত্রিক পবিত্রতার পথ থেকে দূরে থাকতে উৎসাহ দিয়েছেন সেসব সমাজেরই যুব প্রজন্মের একাংশ উন্নত আদর্শের পথ খুঁজে নেয়ার চেষ্টা করছেন। সাহসী এই যুব প্রজন্ম অন্যদের গভীরভাবে প্রভাবিত করছেন। নৈতিক সংযমের প্রশিক্ষণ-ক্লাসে অংশগ্রহণকারী রশীদা জলি'র মত ২৯ বছর বয়স্ক মার্কিন যুবতীর ভাষায় এই নতুন ধারা থেকে বোঝা যায়, সাহসী যুব-প্রজন্ম ইচ্ছে করলে প্রচলিত বা প্রতিষ্ঠিত নেতিবাচক ধারার বিপরীত স্রোতে এগিয়ে যেতে পারে এবং এভাবে তারা এক ইতিবাচক উত্তরাধিকার রেখে যেতে পারে। এটা স্পষ্ট পাশ্চাত্যের অনেক মানুষ ও বিশেষ করে যুব প্রজন্মের একাংশ পুনরায় চারিত্রিক পবিত্রতার দিকে ঝুঁকছে, যদিও এ ধারার প্রতি সমর্থন এখনও ব্যাপক বা নিরংকুশ নয়, কিন্তু পশ্চিমা সমাজের নৈতিক সংকটসহ নানা সামাজিক সংকটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে সফল হয়েছেন। *

Wednesday, July 15, 2009

মারওয়া শেরবিনি হত্যাকান্ড : পাশ্চাত্যে ইসলাম আতঙ্কের ফসল

পশ্চিমা দেশগুলোতে মুসলমানদের প্রতি অন্যায়-অবিচার ও বৈষম্য নতুন কোন বিষয় নয়। যুগ যুগ ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোতে বসবাসরত মুসলমানদের মৌলিক অধিকার পদদলিত হয়ে আসছে। তবে সম্প্রতি জার্মানীর একটি আদালতে বিচারের শুনানী চলার সময়ে যে লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছে, তাকে পাশ্চাত্যে ইসলাম আতঙ্কের অন্যতম ফসল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ঐ আদালতে এক বর্ণবিদ্বেষী তরুণ হিজাব পরিহিতা মিশরীয় গর্ভবতী নারী মারওয়া শেরবিনিকে উপর্যপুরি ছুরিকাঘাতে হত্যা করে এবং তার স্বামী তাকে বাঁচাতে আসলে পুলিশ তার ওপর গুলি চালায়। মিশরীয় নাগরিক মারওয়া শেরবিনি ২০০৫ সালে উচ্চশিক্ষার্থে স্বামীসহ জার্মানীতে পা রাখেন। সেখানে গিয়েই তিনি মুসলমানদের প্রতি জার্মান সমাজের বর্ণবৈষম্যমূলক আচরণের শিকার হন। ফার্মেসিতে উচ্চতর ডিগ্রিধারী শেরবিনি নিজ জীবদ্দশায় জার্মান সমাজে ইসলাম বিদ্বেষ ও বর্ণবাদ কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন। সম্প্রতি জার্মানীর একটি পার্কে ঘুরতে গেলে তিনি বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার হন। একজন বর্ণবিদ্বেষী জার্মান তরুণ শেরবিনি'র হিজাবকে সন্ত্রাসের প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করে এবং তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। শেরবিনি ঐ যুবকের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ করেন এবং সেখানে ঐ যুবকের অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়। আপীল আদালতে মারওয়া শেরবিনি যখন বিচারকের সামনে তাকে অপমান করার ঘটনা বর্ণনা করছিলেন, তখন অভিযুক্ত যুবক তার ওপর হামলা চালায়। 'তোর বেঁচে থাকার অধিকার নেই'- একথা বলে গর্ভবতী শেরবিনির ওপর সে উপর্যপুরি ১৮ বার ছুরিকাঘাত করে তাকে হত্যা করে। এ সময় শেরবিনির স্বামী তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসতে চাইলে জার্মান পুলিশ তার ওপর গুলি চালায়। এসময় শেরবিনির ৩ বছরের শিশু আদালতে উপস্থিত ছিলো এবং ঐ অবুঝ শিশুর চোখের সামনে তার মা শহীদ এবং বাবা মারাত্মকভাবে আহত হয়। সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, যে জার্মান পত্রপত্রিকা অতি তুচ্ছ কোন ঘটনাকেও বড় করে তুলে ধরে, সেই গণমাধ্যম শেরবিনির হত্যাকান্ডের ব্যাপারে কয়েকদিন ধরে রহস্যজনক নিরবতা পালন করে। নিরপেক্ষ ও স্বাধীন বলে দাবিকৃত এসব গণমাধ্যম কেবল তখনই শেরবিনির লোমহর্ষক হত্যাকান্ডের খবর প্রচার করে যখন অন্যান্য সূত্রের মাধ্যমে ঘটনাটি প্রকাশ হয়ে পড়ে। হিজাব পরিহিতা মুসলিম নারী শেরবিনির হত্যাকান্ডের খবর জার্মানীর গণমাধ্যমে প্রকাশ না হওয়ার ঘটনা মুসলমানদের প্রতি জার্মানীসহ পশ্চিমা সমাজের বর্ণবাদী আচরণের বিষয়টি আরো একবার বিশ্ববাসীর সামনে ফুটিয়ে তুলেছে। এমনকি যখন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে হিজাব পরিহিতা মুসলিম নারীর হত্যাকান্ডের খবরটি প্রচারিত হয়েছে, তখনও জার্মান গণমাধ্যম এটিকে গুরুত্বহীন এবং একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। জার্মানীর এটর্নি জেনারেল মারওয়া শেরবিনির হত্যাকান্ড সংক্রান্ত যে কোন তথ্য প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, শেরবিনির জায়গায় যদি একজন অমুসলিম নিহত হতো, তবে পশ্চিমা গণমাধ্যম সে খবরকে ব্যাপক গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করতো এবং দীর্ঘদিন ধরে মাঠ গরম করে রাখতো। আলজেরিয়ার আশশুরুক পত্রিকার সম্পাদক যেমনটি বলেছেন,"মুসলিম নারীর পরিবর্তে জার্মানীতে যদি কোন ইহুদী এরকম নির্মম হত্যাকান্ডের স্বীকার হতো, তবে জার্মান পত্রিপত্রিকাগুলো এ ব্যাপারে হৈ চৈ ফেলে দিতো।" জার্মানীর আদালতের বিচারক ও পুলিশের চোখের সামনে নির্মম হত্যাকান্ডের শিকার মুসলিম নারী মারওয়া শেরবিনির ভাই তারেক শেরবিনি এ সম্পর্কে আল আলম নিউজ চ্যানেলকে বলেছেন, "যদি ঐ হত্যাকান্ড কোন ইউরোপীয় বা পশ্চিমা নাগরিকের ওপর পরিচালিত হতো, তবে তা নিয়ে বিশ্বব্যাপী এলাহী কান্ড ঘটে যেতো। কিন্তু আমার বোনের হত্যাকান্ডের ব্যাপারে তারা আশ্চর্যজনক নীরবতা পালন করেছে। এটি সকল আরব ও মুসলমানকে অবমাননার শামিল।" প্রকৃতপক্ষে ইসলাম ও মুসলমানদের ব্যাপারে পশ্চিমা দেশগুলোর সরকার যে নীতি গ্রহণ করেছে, দেশগুলোর গণমাধ্যম হুবহু সে নীতি অনুসরণ করছে। এসব সরকার মুসলমানদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক নীতি গ্রহণ করেছে এবং বহু পশ্চিমা রাষ্ট্রনায়ক তাদের কথাবার্তায় ইসলাম বিদ্বেষের বিষয়টি চেপে রাখতে পারেন নি। পাশ্চাত্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মুসলিম ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতীক, বিশেষ করে হিজাবের বিরুদ্ধে এক ধরনের চরম বর্ণবাদী আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, এমনকি হিজাব পরার কারণে মিশরীয় মুসলিম নারী মারওয়া শেরবিনিকে হত্যা করেছে। বর্তমানে জার্মানীর বেশ কয়েকটি প্রদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারী অফিস আদালতে হিজাব পরিহিতা মুসলিম নারীর প্রবেশ নিষিদ্ধ রয়েছে। ফ্রান্সেও মুসলমানদের তীব্র প্রতিবাদ সত্ত্বেও স্কুল-কলেজ ইউনিভার্সিটিতে মুসলিম ছাত্রীদের হিজাব পরিধানের ওপর কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করে রাখা হয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলোতে ইসলাম বিদ্বেষ এমনভাবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, সেখানে বসবাসরত মুসলমানদের সারাক্ষণ আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের নাগরিক অধিকার বিষয়ক সংস্থা এফ.আর.এ সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে বলেছে, ইউরোপীয় দেশগুলোতে গত এক বছরে বণবদী আচরণের পরিমাণ শতকরা ৮০ ভাগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব দেশের শীর্ষে রয়েছে বৃটেন। ২০০৭ সালে বৃটেনে ৬১টি বর্ণবাদী হামলা হয়েছিলো। এ দৃষ্টিকোন থেকে জার্মানীর আদালতে একজন মুসলিম নারীর হত্যাকান্ড অপ্রত্যাশিত কোন ঘটনা নয়। কারণ, জার্মানীসহ পশ্চিমা দেশগুলোর গণমাধ্যম সেসব দেশে মুসলিম বিদ্বেষী পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে। জার্মানীর একটি প্রাদেশিক পার্লামেন্টের সাবেক সদস্য জামাল কারযুলি এ সম্পর্কে বলেছেন, "জার্মানীর রাজনীতিবিদ ও গণমাধ্যমগুলো বহু বছর আগে থেকে দেশটিতে একটি ইসলাম বিদ্বেষী পরিবেশ তৈরির জন্য কাজ করে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জার্মানীর আদালতে প্রকাশ্য দিবালোকে একজন হিজাব পরিহিতা মুসলিম মহিলার হত্যাকান্ডের ঘটনায় দেশটির সরকার নিজেকে নির্দোশ ভাবতে পারে না। বিশেষ করে মারওয়া শেরবিনির হত্যাকান্ডের ব্যাপারে বহু প্রশ্ন এখন সামনে আসছে। প্রকাশ্য আদালতে এ ধরনের ঘটনা ব্যাপক সংশয়েরও জন্ম দিয়েছে। কারণ, জার্মানীর আইন অনুযায়ী আদালতে জননিরাপত্তাকে হুমকিগ্রস্ত করা যায় এমন কোন ধরনের অস্ত্র বা গোলাবারুদ নিয়ে প্রবেশ করা যায় না। আদালতে প্রবেশের সময় প্রতিটি ব্যক্তির দেহ তল্লাশি করে তার নিরস্ত্র হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হয় কর্তৃপক্ষ। এ অবস্থায় শেরবিনির ঘাতক কীভাবে ছোরা নিয়ে আদালতে প্রবেশ করলো- এটি হচ্ছে প্রথম প্রশ্ন। দ্বিতীয় প্রশ্ন হচ্ছে, পুলিশের চোখের সামনে এতবড় একটি হত্যাকান্ড ঘটার সময় পুলিশ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলো কেনো? পুলিশ শেরবিনিকে রক্ষা করতে এগিয়ে না এসে বরং তার স্বামীর গায়ে গুলি করে। তারা ঐ ঘাতক যুবককে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়তে পারতো। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, বর্ণবিদ্বেষী জার্মান সমাজে আর কোন মুসলিম নারী যাতে হিজাব পরার সাহস না দেখায় সেজন্য পূর্ব পরিকল্পিতভাবে শেরবিনি'র হত্যাকান্ডের নাটক আদালতে মঞ্চস্থ করা হয়েছে। বর্ণবাদী হামলার শিকার মারওয়া শেরবিনি আসলে ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে হিজাব পরতেন। এ কারণে মিশরের ঐ নারীকে 'শহীদে হিজাব' বা হিজাবের শহীদ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। হিজাব হচ্ছে এমন এক ঢাল যা নারীকে লম্পট পুরুষের লোলুপ দৃষ্টি থেকে রক্ষা করে। হিজাব পরিধান করে একজন নারী নিরাপত্তা সহকারে সমাজের গঠনমূলক কাজে অংশ নিতে পারে। মারওয়া শেরবিনি ইসলামের এই গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ পালন করতে গিয়ে শহীদ হওয়ার কারণে বিশ্বের মুসলমানরা তার প্রতি সহমর্মীতা প্রকাশ এবং পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতি ধিক্কার জানিয়েছে। মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় শেরবিনির জন্মস্থানে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে অত্যন্ত আড়ম্বরের সাথে তার জানাযা ও দাফন সম্পন্ন হয়েছে। ইরানেও তার প্রতীকি দাফন সম্পন্ন হওয়ার পাশাপাশি জার্মানী এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বর্তমান সভাপতি ইতালির রাষ্ট্রদূতকে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে তলব করা হয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে শেরবিনির নিজ দেশ মিশর সরকারের অদ্ভুত নীরবতা দেশটির জনগণকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। মিশরের অনেক আলেম ও রাজনৈতিক নেতা দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমাদ আবুল গেইতের পদত্যাগ দাবি করেছেন। সার্বিকভাবে বলা যায়, পশ্চিমা দেশগুলোতে ইসলাম বিদ্বেষী যে পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে, তার ফলে মুসলমানরা নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পশ্চিমা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও গণমাধ্যম এসব দেশে ইসলাম গ্রহণের ক্রমবর্ধমান হার রোধ করার লক্ষ্যে ইসলাম বিদ্বেষী প্রচারণা চালাচ্ছে। ইসলাম মানুষের প্রকৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান হওয়ার কারণে বহু মানুষ এ ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছেন। হিজাব বা ইসলামী শালীন পোশাক হচ্ছে এ ধর্মের অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয়। কিন্তু সুস্থ সমাজের জন্য অপরিহার্য এই হিজাবকে পশ্চিমা দেশগুলো মেনে নিতে রাজী নয়। পশ্চিমা দেশগুলো মানবাধিকার রক্ষার দাবি করলেও বাক স্বাধীনতার অপব্যবহার করে নানাভাবে ইসলামের অবমাননা করছে। এসব দেশ তাদের মতাদর্শ বিরোধী কোন দেশের সামান্য ঘটনা নিয়ে বিশ্বব্যাপী হৈ চৈ ফেলে দিতে সিদ্ধহস্ত হলেও প্রকাশ্য আদালতে একজন মুসলিম নারীর হত্যাকান্ডে কোনরকম বিচলিত হয় নি। মানবাধিকারের পৃষ্ঠপোষক এসব দেশের দৃষ্টিতে সন্ত্রাসী হামলায় একজন গর্ভবতী নারীর করুণ মৃত্যুতে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয় নি।#